মেঘবালিকার বর্ষাকথন

নাহিদ সুলতানা | বুধবার , ১৭ জুন, ২০২৬ at ৮:২২ পূর্বাহ্ণ

ঋতুর পরিক্রমায় বাংলার বুকে এসেছে প্রেমময় কবিতাময় উচ্ছল বর্ষা। আকাশে ঘন ঘন মেঘের ভেলা, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে দিন থেকে রাত কেটে যায় বেলাঅবেলায়। বর্ষা মানেই কদম ফুল। বর্ষার শুরুতেই মিলবে কদমের সৌরভ। গাছে গাছে ফুটে থাকা কদম ফুল প্রকৃতিতে এনে দেয় নজরকাড়া সৌন্দর্য।

বর্ষার কদমফুল নিয়ে লেখা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের গানটি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল

করেছ দানআমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।’

বাংলার প্রকৃতিতে বর্ষা যেন এক অনন্ত কাব্যের নাম। গ্রীষ্মের দহন শেষে যখন আকাশের বুকজুড়ে জমে ওঠে কালো মেঘের মায়া, তখন প্রকৃতি ফিরে পায় তার নতুনজীবন। ধুলোমাখা পথঘাট ধুয়ে যায় বৃষ্টির জলে, মাঠে মাঠে নেমে আসে সবুজের ঢেউ, নদী ফিরে পায় তার উচ্ছল প্রাণ। আষাঢ়শ্রাবণের এই স্নিগ্ধ ঋতু বাংলার মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে প্রেম, স্মৃতি, বিষাদ ও অপার্থিব সৌন্দর্যের অনুভব।

বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামলেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে কদমফুলের মাতাল করা গন্ধ। গ্রামের মেঠোপথ, বাঁশবাগান, নদীর ঘাট কিংবা টিনের চালসবখানে তখন বৃষ্টির সুর বাজতে থাকে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিধারা যেন প্রকৃতির গোপন কোনো সংগীত। মানুষও তখন অকারণে উদাস হয়ে পড়ে। জানালার ধারে বসে দূরের মেঘ দেখা কিংবা ভেজা বাতাসে হারিয়ে যাওয়া এসবই বর্ষার এক নীরব রোমান্টিকতা।

বর্ষা মানুষের হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে। কখনো সে প্রেমের দূত হয়ে আসে, কখনো বিরহের দীর্ঘশ্বাস হয়ে নামে। মেঘলা আকাশের নিচে বৃষ্টিভেজা বিকেল যেন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনে। দূরের কারো জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে, হৃদয়জুড়ে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীল বিষাদ।

বাংলার কবিরা বর্ষাকে নানা রূপে দেখেছেন। কাজী নজরুল ইসলামএর কবিতায় বর্ষা কখনো ব্যাকুল প্রেমের প্রতীক, কখনো উদ্দাম আবেগের রূপ। তাঁর কবিতা ও গানে প্রেম, বিরহ এবং প্রকৃতির অপূর্ব মিলন ঘটেছে। তাঁর কবিতার সুরে মেঘ, বৃষ্টি আর হৃদয়ের আর্তি একাকার হয়ে যায়

আষাঢ়ে গগন ঘোর ঘনঘটা, নিশীথ যামিনী রে’ আবার জীবনানন্দ দাশএর কবিতায় বর্ষা হয়ে ওঠে নীরব, স্বপ্নময় সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। বৃষ্টিভেজা বাংলার মাঠ, নদী আর বনপথ তাঁর কবিতায় যেন কুয়াশামাখা কোনো ছবির মতো ভেসে ওঠে। বর্ষা বাংলাদেশের কৃষিজীবনের জন্য এক আশীর্বাদ। এই বৃষ্টির জলেই কৃষকের মাঠে জন্ম নেয় সোনালি ধান, পুকুরনদী ভরে ওঠে প্রাণে। প্রকৃতি ফিরে পায় তার সতেজতা। যদিও অতিবৃষ্টি কখনো কখনো বন্যা ও দুর্ভোগ ডেকে আনে, তবুও মানুষ বর্ষাকে ভালোবাসে। কারণ বর্ষা মানেই নতুন জীবনের আহ্বান, ক্লান্ত পৃথিবীর পুনর্জন্ম। বর্ষার সবচেয়ে মোহনীয় দিক হলো এর সংগীতময়তা। টিনের চালে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, দূরের মেঘের গর্জন, কদমফুলের সুবাস আর নদীর ঢেউ সব মিলিয়ে বর্ষা যেন জীবন্ত এক কবিতা। তাই বর্ষা এলেই মানুষের কণ্ঠে ভেসে ওঠে গান, হৃদয়ে জন্ম নেয় কাব্য। বাঙালির অনেক রোমান্টিক মুহূর্তের সাক্ষী বর্ষা। বিশেষ করে বৃষ্টির সঙ্গে গানের সম্পর্কটা নিবিড়। ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন ….’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এই গান আজও শ্রোতাদের মাঝে সমান জনপ্রিয়।

আষাঢ়শ্রাবণের বর্ষা বাংলার প্রকৃতির সবচেয়ে রোমান্টিক ও কাব্যময় অধ্যায়। এটি কেবল একটি ঋতু নয়; এটি বাংলার মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি ও ভালোবাসার গভীরে মিশে থাকা এক চিরন্তন সুর।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়ো
পরবর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে