মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলেমানুষী ও আমার চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতা

সাকী ফারজানা | শুক্রবার , ২০ মে, ২০২২ at ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ

মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ছেলেমানুষী গল্পটি ঠিক কত সালে লেখা হয় তা জানা যায় নি। তবে উত্তরকালের গল্প সংগ্রহ এর ভূমিকা থেকে জানা যায়, মানিক বাবুর বাম রাজনীতিতে সক্রিয় হবার পরের সময়ে লেখা এটি। কাজেই ১৯৪৪ থেকে ১৯৫৬ সালের এই সময়টাতেই গল্পটি লেখা হয়েছে ধরে নেয়া যায়। বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে।
ছেলেমানুষী গল্পের প্রেক্ষাপট হলো সাতচল্লিশের দেশভাগের ঠিক আগে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা পরিস্থিতিতে পশ্চিম বাংলার একটি ছোট্ট শহরতলীর মানুষের সম্পর্ক, আস্থা এবং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অসহায় নিরুপায় বলি হওয়া মানসপট।
চারপাশের সব এলাকায় চলছে মারো-কাটো। এই পরিস্থিতিতে দুটি পরিবারের লাগোয়া বাড়ি নাসিরুদ্দিন আর তারাপদ’র। মিলেমিশেই ছিল তারা, নানান আচার ব্যবহারের পার্থক্য নিয়েও। দু’পক্ষেরই ক্ষোভ-মনোকষ্ট সাথে নিয়েই একসাথে চলা। দুটি পরিবারের বাড়ির দেয়ালটাও অদৃশ্য হয়ে যায় বাড়ির দু’জন ক্ষুদে সদস্য গীতা এবং হাবিবের কারণে। আর সবার দেশের ঘটে যাওয়া দাঙ্গা-ফ্যাসাদে আতঙ্ক-অবিশ্বাস বুকে দানা বাঁধলেও ওদের কাছে দাঙ্গাও একটা খেলা, বর-বউ খেলার মতো। ওদের এই না বুঝা সরলতা বড়দের কারও বোধগম্য হয় না। তারা শুধুই লড়ার ছুতো খোঁজে।
দাঙ্গা ঠেকাতে এই মিশেল পাড়ায় গড়ে উঠে পিস কমিটি। কিন্তু পুরো পাড়ার হিন্দু-মুসলিম সব ঘরেই ঘর পুড়ে নিশ্চিহ্ন হওয়া মানুষেরা এসে আশ্রয় নিলে ভেতরে-ভেতরে অবিশ্বাস জোট বাঁধতে থাকে, আস্থার সম্পর্কের জায়গায় চলে আসে অবিশ্বাস। হালিমা-ইন্দিরার একই অবস্থান পরিবারে মা-স্ত্রী-দাসী, পরিস্থিতির বদলে তারা তখন শুধুই একজন হিন্দু আর একজন মুসলিম পরিচয় বড় হয়ে ওঠে।
মানিক বাবুর কোনও রচনাতেই উপরতলার মানুষের গল্প পাওয়া যাবে না। তাদের পাওয়া যায় শোষকের ভূমিকায়। তাঁর সকল রচনাতেই প্রচণ্ড প্রকট হয়ে ওঠে দারিদ্র আর মধ্যবিত্ত মানসিকতার অন্তর্দ্বন্দ্ব। তাঁর জীবনী থেকে জানা যায় তিনি নিজেও ব্যক্তিগত জীবনে প্রচণ্ড আর্থিক অনটনে কাটিয়েছেন, অর্থনৈতিক অনটন মানুষের স্বভাবকেও করে তোলে প্রশ্নবিদ্ধ তাঁর রচনায়।
ছেলেমানুষীতে মিশেল পাড়ার মানুষরা অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে যখন তাদের মনে উঁকি দেয় ভিটে ছাড়তে হবে কি? পাখির মতো উড়ে বেড়াতে হবে কি? অনিরাপত্তা মানুষগুলোকে হিংস্র ক্রুদ্ধ করে। দু’পক্ষকে উসকে দিয়ে তামাশা দেখে নিরাপত্তার কারণে নিয়োজিত মিলিটারি বেশে পুঁজিবাদ। আর মানুষগুলো শুধু লড়ে যায়, নিজের জন্য নয় অন্যের স্বার্থের সিদ্ধি হবে তাই।
ছেলেমানুষী গল্পের যে-দিক আমাকে সবচেয়ে কুঁরে কুঁরে খেয়েছে, তা হলো- মানুষগুলো লড়ে কেন? ধর্মের কারণে সম্পর্কগুলো বদলে যায়সকেন? ধর্ম বড় নাকি মানুষ? মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ছেলেমানুষী প্রথম পড়েছিলাম বোধ হয় ২০১১/২০১২ সালে। তখন একটি এফএম রেডিওতে চাকরি করি ট্রেইনি আরজে হিসেবে। কখনো সিনেমা বানাবো তখনও ভাবি নি। গল্পটা পড়ে প্রথমেই যে-কথা বলে ফেলি আমার পার্টনারকে এই গল্পে সিনেমা বানালে বেশ হতো। ব্যাস, তখনকার মতো ওই পর্যন্তই। গল্প পড়তে পড়তে আমি যেন দেখছিলাম- ইন্দিরা, হালিমা, পিসি, গীতা আর হাবিবকে। এটা সত্যি, আমার ভাবনায় গীতা আর হাবিবের বাইরে নারী চরিত্রগুলোই অনেক স্পষ্ট ছিলো। অনেক পরে এর কারণ উদঘাটন করতে পেরেছি, কেন ছেলেমানুষী নামক গল্প থেকে সিনেমা মাথায় এলো, কেনইবা নারী চরিত্রগুলোই ভাবনায় প্রথম থেকেই স্পষ্ট হলো। আর কেনইবা গীতা চরিত্রটি এত প্রকট।
২০০৯-২০১০ সালে আমার কর্মসূত্রে বেশ কয়েকবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যেতে হয়েছে। সেই সূত্রে বেশ কিছু কাছের মানুষ হলো- বিশ্বজিত দা- দোলন দা’র পরিবার, পাগলা দাড়ি (রবিন দা), পার্থ সিংহ’র পরিবারের সাথে। আরও কিছু নাম না জানা মানুষের সাথেও আলাপ হয়েছিল চব্বিশ পরগনায় নাটকের শো করতে গিয়ে। এই মানুষগুলোর একটা জায়গায় খুব মিল, তা হলো সবারই আদি বাড়ি এই বাংলায় অর্থাৎ বাংলাদেশ। যাদের কথা বলছি এরা বেশিরভাগই সাতচল্লিশের দেশভাগের সময়ে ওপার যান নি, গেছেন দেশভাগের পর। একটু ভুল বললাম- আরও একটা বিষয়ে খুব মিল আছে- দেশ নিয়ে এক বুক হাহাকার। কারও কারও আবার বুকের ভেতর পুতে রাখা অভিমান। পাগলা দাড়ি কখনো বাংলাদেশ আসতে চান না, পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা করিয়ে নিজের বাড়ি দেখতে আসতে হবে এটা উনি মানতেই পারেন না, তার থেকে মনের চোখে এখনো যেমন দেখেন সেই ভালো। বিশ্বজিত দা-দোলনদা’র মা (আমাদের মাসিমা) আমাদের ডেকে নিয়ে অনেক গল্প করলেন জন্ম, বড় হওয়া, বিয়ে এসব নিয়ে। জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি কখনো বরিশাল গেছি কিনা। কখনো যদি যাই, তাহলে আমি যেন ওখানকার মাটি একটু নিয়ে যাই তার জন্য পরেরবার যখন যাব।
আরও কত গল্প- কীভাবে দেশ ছাড়লো, কেমন করে গেলো ওপার, কোথায় গিয়ে উঠেছিলো, তারপর কীভাবে টিকে গেলো ওখানেই এসব। এসব কথা-গল্প আমায় তাঁরা বলেছিলেন কেন জানি না, আমার নামও মুসলমানের, আমি তাদের জন্মভূমির মানুষ বলে কি!
এরও বছরখানেক পরে দোলনদা এলো বাংলাদেশে ঘুরতে, আমার জন্য উপহার এনেছিলো সুনন্দা সিকদারের লেখা ‘দয়াময়ীর কথা’ বইটি। লেখিকা বইটিতে তাঁর ছোটবেলায় এই বাংলায় দেখা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অম্ল-মধুর বিষয়গুলো বলেছেন গল্পোচ্ছলে। তাঁর মা-বাবা কলকাতায় থাকলেও তিনি শৈশব কাটিয়েছেন এই বাংলায় তাঁর পিসির কাছে।
২০১৭ সালে মানিক বাবুর ছেলেমানুষী গল্পটা নিয়ে ছোট সিনেমা বানাতে গিয়ে দেখলাম, আমার দেখা আর জানার সাথে মানিক বাবুর দেখা এক জায়গায় প্রচণ্ড অমিল, আমি দাঙ্গা দেখি নি, এই ভূ-খণ্ডে কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়ই-নি, যা হয়েছে তা আগ্রাসন। এক পক্ষ মার খেয়ে গেছে শুধু, আরেক পক্ষ শুধুই মেরেছে। এই মার খাওয়া আর মারমুখী লোকজনকে নিয়ে রাজনীতি। মানিক বাবুর ছেলেমানুষীর রাজনীতি এক হবে না কখনো। আর মিলটা যেখানে, তা হলো- আস্থাহীনতা, অবিশ্বাস আর ক্ষমতার লড়াই।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এই দেশের মুসলিম-হিন্দু রেশিওটা ছিলো ৬৮.৩% : ৩০%, ২০১৭ সালে সেই রেশিও এসে দাঁড়ায় ৮৯% : ৬%। সত্তর বছরে ২৪% হিন্দু জনগোষ্ঠী গায়েব হয়ে গেছে এখান থেকে। এই গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনার দায় কি শুধুই রাজনৈতিক?
গল্প থেকে সিনেমা বানাতে গিয়ে আরও একটা সংকট হয়ে দাঁড়ালো। আমি মানিক বাবুর মতো কমিউনিজমে আস্থাশীল নই। আমার দেখা কমিউনিজম সকল সমস্যার সমাধান হয়ে আমার সামনে এসে স্বপ্ন দেখায় নি। আমি বরং অনেক দেখেছি কমিউনিজম আর পুঁজিবাদের মাঝে দোলাচলে থাকা কিছু লক্ষ্যহীন মানুষ, যারা স্বপ্ন দেখে না, ধার করে।
আমার কাছে বরং অনেক স্পষ্ট হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের বাঁকগুলো। আমার বাবার কাছের বন্ধু ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বাবাকে না বলেই সপরিবারে ভারত চলে গিয়েছিলেন রাতের অন্ধকারে। অথচ যাবার আগের দিনই এক সাথে বসে আড্ডা দিয়েছেন তাঁরা। এত বছর পরেও আমার বাবা আক্ষেপ করে বলেন- ওদের বিশ্বাস নেই, ওরা সম্পর্ক বোঝে না, আমাকেও বিশ্বাস করলো না!
ছাত্র ইউনিয়ন করা আমার বাবা যখন এলাকার কারা যুদ্ধে গেল, কোথায় কোন পাড়ায় পাক আর্মি হানা দিল তার খবর নিয়ে মানুষকে সহায়তা করছে, তখন কাছের বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া আস্থাহীনতা বন্ধুত্বে একটা সীমানা তৈরি করে দিয়েছে।
আমার চেনা-জানা-শোনা মানুষগুলোরও তো এদেশে প্রতিবেশী ছিলো, বন্ধু ছিলো যারা মুসলিম, আস্থা কেন পেল না?
ছেলেমানুষী গল্প থেকে সিনেমার আরও একটা অমিল আছে, ছেলেমানুষী গল্পে ধর্মের অসারতা খুব একটা প্রকট হয় না, প্রকট হয় ধর্মীয় রাজনীতির কারণে সম্পর্কের অসারতা। ছেলেমানুষী সিনেমাতে আমি চেয়েছি, মানুষের চেয়ে ধর্ম বড় নয় এই তত্ত্বটি সামনে আসুক। ধর্মীয় রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রে বিরাজ করে না, ধর্মীয় রাজনীতি গেঁড়ে থাকে মানুষের মনে। সত্যি বলতে কি, প্রথম সিনেমায় মানুষের মনে থাকা রাজনীতির সাথে সমাজ-রাষ্ট্রে থাকা রাজনীতির কথা আমার বলার সাহস হয় নি। যদি সামলাতে না পারি!
ছেলেমানুষী সিনেমা কাজেই মানিকবাবুর ছেলেমানুষী গল্পের সরাসরি সিনেমাটিক রূপ নয়। মানিকবাবুর ছেলেমানুষী থেকে আমি টেক্সট নিয়েছি ছেলেমানুষী সিনেমায়, সাবটেক্সটগুলোর বেলায় স্বাধীনতা নিয়েছি নিজের ভাবনার।
এবার বলি, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে কাজ করতে আমার কেমন লেগেছে। আমি কাজে নেমে যাবার পর মনে হয়েছে এত ব্যাপকতা আমার সিনেমায় আনা সম্ভব নয়- আমার পক্ষে। ছোট গল্পের ঘটনার ডাইমেনশন চরিত্রের বহুমাত্রিকতা আমি ১৮ মিনিটের সিনেমায় কীভাবে আনবো!
একসময় হার মেনেছি, এ-গল্পের দৃশ্যায়ন হবে না আমাকে দিয়ে। তাহলে ছেলেমানুষী সিনেমা হলো কীভাবে তবে। ছেলেমানুষী গল্পের প্রথম লাইন- ব্যবধান টেকে নি।
গল্পের শেষটা এমন- জনতা সাফ হয়ে যাবার অনেক পরে আবার লরি বোঝাই মিলিটারি এলো। বহুক্ষণ ‘সার্চ’ চলে নাসিরুদ্দিন আর তারাপদ’র বাড়িতে, গুম করা ছেলেমেয়ে দুটির সন্ধানে। হালিমা আর ইন্দিরার গা ঠেসে দাঁড়িয়ে ভীত চোখে তাই দেখতে থাকে গীতা আর হাবিব।
গীতা আর হাবিবের মাঝে ব্যবধান টেকে নি, টেকে না। হয়তো এটা ছেলেমানুষী, কিন্তু সম্পর্কে রাজনীতির বদলে ছেলেমানুষীই বেশি আরামের, স্বস্তির।