মানবিক সমাজ গঠন প্রসঙ্গে

সুপ্রিয়া বড়ুয়া | মঙ্গলবার , ২ জুন, ২০২৬ at ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ

শহরের প্রাণকেন্দ্রে এক টুকরো সবুজ সিআরবি। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথেই পড়ে। দুপাশের বিশাল গাছগুলো রূপকথার ভালো দৈত্যের মতো কেমন চারপাশ ছায়া আর মায়া দিয়ে আগলে রাখে। ছায়া আর মায়া কী মিষ্টি দুটি শব্দ! মায়া আছে বলেই তো প্রিয়জনের পাশে আমরা ছায়া হয়ে থাকি। দুএকবছর আগেও বেসরকারি একটি হাসপাতাল তৈরির জন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। গণআন্দোলনের মুখে সেটি ব্যর্থ হয়। আবারও নতুন করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। তেমন কিছু ঘটলে কি হবে ভাবতেই দমবন্ধ লাগে।

যাওয়ার পথে প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ে স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের। ইউনিফর্ম পরা। ব্যাগ কাঁধে। দুজন কিংবা দল বেঁধে চলছে ঘুরাঘুরি, আড্ডা আর মোবাইলে ছবি তোলা। কয়েকটি ভাসমান ফুলের দোকান ও দাঁড়িয়ে গেছে দেখলাম। প্রেমিক জুটিদের চাহিদা মাথায় রেখেই হয়তো। দোকান মানে ফুটপাত ঘেঁষে দুটো টেবিল জোড়া লাগানো। দিনের এ সময়ে যারা এখানে সময় কাটাচ্ছে নিশ্চয় ক্লাস ফাঁকি দিয়েই এসেছে। পড়ার সময় পড়া আর খেলার সময় খেলা এ ধারণা অনেক আগেই পাল্টে গেছে। খুব বড় একটা চিড় ধরেছে পুরো সমাজ ব্যবস্থায়। গাড়ি এগিয়ে চলে স্কুলের দিকে। যেতে যেতেই চোখে পড়ে দেয়ালে দেয়ালে চমৎকার সব গ্রাফিতি। দারুণ সব কথামালায় সাজানো। আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রতিভায় মুগ্ধ হই। আবার এদেরই একাংশ যখন শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলে, জুতোর মালা পরায় তখন হিসেব মেলাতে পারি না। কথা আর কাজে কি বিস্তর ফারাক! পরমুহূর্তেই মনে হয় এটাই স্বাভাবিক। ছাত্ররা সমাজে যা দেখছে, শিখছে তাই করছে। সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের কথা আর কাজে মিলের বড় অভাব। বিগত সময়ে স্কুলগুলোতে একটা নির্দেশনা এসেছিলপ্রতিদিন এসেম্বলিতে নৈতিকতাবিষয়ে যেন চার পাঁচ মিনিট কিছু বলা হয়। আমরা ভুলে যাই নীতি নৈতিকতা কখনো বক্তৃতা দিয়ে শেখানো যায় না। নিজে অসাধু হয়ে অন্যকে সাধুতা শেখানো গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি দেয়ার মতোই। আর সেটাই আমরা করে যাচ্ছি। তাই আমাদের সন্তানদের সামনে আজ কোন আদর্শ নেই। আলোকবর্তিকা নেই। চরম অসহিষ্ণু একটা প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। যে প্রজন্ম বই পড়ে না, খেলাধুলা করে না। সুস্থ সংস্কৃতির কোন চর্চা নেই। আছে শুধু মারামারি, খুনোখুনি! ভীষণ রকম কঠিন একটা সময় অতিক্রম করছি আমরা। বিগত বছরগুলোতে দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এর পাশাপাশি মানুষের মনোজগতের উন্নয়নও যে প্রয়োজন তা লক্ষ্যণীয় ভাবেই উপেক্ষিত। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যেখানে ভোটের রাজনীতি উন্নয়নকে নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে এটাই স্বাভাবিক। কেননা এসব অগ্রগতি মানুষের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে অন্যদিকে মনের জানালা সবার অলক্ষ্যেই খোলে। আমরা ভুলে যাই সফটওয়্যার ঠিক না থাকলে হার্ডওয়্যার কখনো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। আর আমাদের দেশের নেতারা ঠিক এ কাজটাই করেছেন বছরের পর বছর। আজ তাই সবার আগে এদেশে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা সত্যিকার অর্থেই একটি মানবিক সমাজ এবং আধুনিক রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। যারা তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় হবে। সুড়ঙ্গপথ পার হতে গিয়ে সামনে আলোকবর্তিকা না থাকলে উল্টো পথে হাঁটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। আর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের দিকে তাকালে সে আতঙ্কটাই প্রতিনিয়ত তাড়া করে!

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ তার মাতৃগর্ভে
পরবর্তী নিবন্ধতাত্ত্বিক গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক স্মরণে