মাকামে ইব্রাহিম ও হাজরে আসওয়াদ এক ঐতিহাসিক ও বরকতময় নিদর্শন

ফখরুল ইসলাম নোমানী | শুক্রবার , ৮ মে, ২০২৬ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ

নবী করিম (সা.) বলেছেন রোকনে আসওয়াদ অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম বেহেশতের দুটো ইয়াকুত পাথর। আল্লাহ এই দুটি পাথরে নূর মিশিয়ে দিয়েছেন। এগুলোর আলোতে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমস্ত ভূখণ্ড আলোকোজ্জ্বল হয়ে যেত। অনেক হজযাত্রী মক্কায় এসে মসজিদুল হারামে (কাবা শরিফ) নামাজ আদায়ের পাশাপাশি হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম দেখছেন। মসজিদুল হারামের অনেক প্রবেশপথ। কাবাঘরের চারদিকে তাওয়াফের স্থানকে মাতাফ বলে। কাবা শরিফের পাশেই চারদিকে লোহার বেষ্টনীর ভেতর একটি ক্রিস্টালের বাঙে আছে বর্গাকৃতির একটি পাথর। পাথরটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান প্রায় এক হাত। এটিই মাকামে ইব্রাহিম। মাকামে ইবরাহিম পবিত্র কাবা নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত জান্নাতি পাথর। এখানে দোয়া করলে আল্লাহতাআলা কবুল করেন তাই এই স্থানকে দোয়া কবুলের স্থান বলা হয়। আল্লাহতাআলা ইরশাদ করেন আর স্মরণ করুন যখন ইব্ররাহিম ও ইসমাইল কাবার ভিতগুলো উঠাচ্ছিল (এবং দোয়া করছিল) হে আমাদের রব আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞানী। (সুরা বাকারা : ১২৭)

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে হজরত ইবরাহিম (.)এর শেষ জীবনের ইবাদতের স্থান মাকামে ইবরাহিম। এর প্রতিটি অনুকণা খলিলুল্লাহর অশ্রু ধারায় সিক্ত বা সিঞ্চিত। তার কর্মের অঙ্গন বিশ্ব মুসলিমের ইবাদতের স্থান। দিনরাত এ স্থান জনাকীর্ণ। হজ ও উমরা পালনকারীরা তাওয়াফ শেষে এখানে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহতায়ালার দরবারে পাপমুক্তি ও স্বীয় মনোবাসনা কামনা করে মোনাজাত করেন। সাধারণ মূল্যহীন পাথরটি হযরত ইব্রাহিম (.)এর সংস্পর্শে এসে অনন্য মর্যাদার অধিকারী হয়েছে। একথাও প্রতিয়মান হয় যে নামায সম্পন্ন করার সময় আল্লাহ ব্যতিত অন্য কিছুর প্রতি সম্মান প্রদর্শনও জায়েজ আছে। কেননা মাক্বামে ইব্রাহিমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নামাজের মধ্যে হচ্ছে। পবিত্র কাবাঘরের চারটি কোণের আলাদা নাম আছে। যেমন হাজরে আসওয়াদ, রকনে ইরাকি, রকনে শামি ও রকনে ইয়েমেনি। হাজরে আসওয়াদ বরাবর কোণ থেকে শুরু হয়ে কাবাঘরের পরবর্তী কোণ রকনে ইরাকি, তারপর মিজাবে রহমত, এরপর হাতিম। হাতিম হলো কাবাঘরের উত্তর দিকে মানুষ সমান অর্ধবৃত্তাকার উঁচু প্রাচীরে ঘেরা একটি স্থান। তারপর যথাক্রমে রকনে শামি ও রকনে ইয়েমেনি। এটা ঘুরে আবার হাজরে আসওয়াদ বরাবর এলে তাওয়াফের এক পাক পূর্ণ হয়। এভাবে সাত পাক দিতে হয়। প্রতিবার পাক দেওয়ার সময় হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করতে হয়। হাজরে আসওয়াদ কাবা শরিফের দক্ষিণপূর্ব কোণে মাতাফ থেকে দেড় মিটার উঁচুতে রাখা। প্রতিবার চক্করের সময় এতে চুম্বন করতে হয়।

হাজরে আসওয়াদের আভিধানিক অর্থ কালো পাথর। মুসলমানদের কাছে এটি অতি মূল্যবান ও পবিত্র। আগে এটি ছিল আস্ত একটা পাথর। হজরত আবদুল্লাহ বিন জোবায়েরের শাসনামলে কাবা শরিফে আগুন লাগলে হাজরে আসওয়াদ কয়েক টুকরা হয়ে যায়। আবদুল্লাহ বিন জোবায়ের পরে ভাঙা টুকরাগুলো রুপার ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেন। ফ্রেম সংস্করণের সময় চুনার ভেতর কয়েকটি টুকরা ঢুকে যায়। বর্তমানে হাজরে আসওয়াদের আটটি টুকরা দেখা যায়। এগুলোর আকৃতি বিভিন্ন রকম। হাজরে আসওয়াদ নিয়ে একটি ঘটনা সবার কমবেশি জানা। তা হলো পবিত্র কাবাঘর পুনর্নির্মাণের পর হাজরে আসওয়াদকে আগের জায়গায় কে বসাবেনএ নিয়ে কুরাইশদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেঁধেছিল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)নিজের গায়ের চাদর খুলে তাতে হাজরে আসওয়াদ রেখে সব গোত্রপ্রধানকে চাদর ধরতে বলেন এবং দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটান।

কালো পাথর চুম্বনের তাৎপর্য : আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার নিদর্শন। পাথর চুম্বনের দ্বিতীয় তাৎপর্য হচ্ছেএকই পাথরে একই স্থানে লাখ লাখ হাজীর চুম্বনে ভেঙে যায়া রাজাপ্রজার, মালিকশ্রমিকের, শিক্ষিতঅশিক্ষিতের, আরবঅনারবের, কালোসাদার, ধনীনির্ধনের, ছুতঅছুতের বিভেদের জঘন্য প্রাচীর। এই শুভ লগ্নে বিশ্বের হাজীরা বিশ্বভ্রাতৃত্বে একত্রিত হয়। মালেকী, হাম্বলী, হানাফী, শাফেয়ী, শিয়াসুন্নী বিভিন্ন মাজহাবের প্রাচীর খান খান হয়ে ভেঙে সবার মুখ, হাতএক মুখ, হাত হয়ে যায়া। কেউ কাউকে ঘৃণা করে না। একজনের চুম্বনের জায়গায় অন্যজন চুম্বন দিতে অস্বীকার করে না। নবীর পায়ের ছাপ সংরক্ষণ করতে পাথরটি স্বর্ণ, রূপা ও গাসের ফ্রেমে আবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। হাজরে আসওয়াদ থেকে মাকামে ইব্রাহিমের দূরত ১৪ দশমিক পাঁচ মিটার। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দু’রাকাত সালাত আদায় করতে হয়। জায়গা না পেলে অন্য কোথাও আদায় করলে সালাত হয়ে যায়।

হাজরে আসওয়াদের মর্যাদা : ইসলামে হাজরে আসওয়াদ একটি ঐতিহাসিক পাথর। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন জান্নাত থেকে আনার পর হাজরে আসওয়াদ ধবধবে সাদা ছিল। অত:পর আদম সন্তানের গুনাহে তা কালো বর্ণ ধারণ করে। হাদিসে এসেছে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন আল্লাহর শপথ আল্লাহ তা’আলা কেয়ামতের দিন পাথরটি পুনরুত্থান করবেন। সে দুই চোখ দিয়ে দেখবে। নিজের জিহ্‌বা দিয়ে কথা বলবে। তখন যারা তাকে চুমু দিয়েছিল তাঁদের জন্য দোয়া করবে। জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন রাসুল (সা.) মক্কায় এসে হাজরে আসওয়াদের কাছে আসেন। অতঃপর তা স্পর্শ করে এর ডান দিকে হাঁটা শুরু করেন। তিন বার হালকা দৌঁড়ান ও চার বার হাঁটেন। ফ্রেমে মুখ ঢুকিয়ে হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করতে হয়। এর পাশে ২৪ ঘণ্টা উপস্থিত থাকে সৌদি পুলিশ। তারা খেয়াল রাখে ফ্রেমে মাথা ঢোকাতে বা চুম্বন করতে কারও যেন কষ্ট না হয়। কাবা শরিফে বিভিন্ন ওয়াক্তের নামাজ আদায় করতে গিয়ে দেখা গেল, ফরজ নামাজ চলাকালে হাজরে আসওয়াদে কেউ চুম্বন করতে পারেন না। হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মানুষের গোনাহ যদি হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিমের পাথরকে স্পর্শ না করতো তাহলে যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তি তা স্পর্শ করলে (আল্লাহর পক্ষ হতে) তাকে সুস্থতা দান করা হতো।

নবীজি চুম্বন করার কারণে হাজরে আসওয়াদের মর্যাদা : আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদা ও সম্মানের কারণে হাজরে আসওয়াদ ও মাক্বামে ইবরাহীম আল্লাহর নির্দেশের কারণে বান্দার জন্য উপকারী। সুতরাং এতে চুম্বন করাও সওয়াবের কাজ। এটি দুআ কবুলের বরকতময় স্থান। হে আল্লাহ আমাদের সকলকে আপনার মকবুল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর হিদায়ত সকলকে নসীব করুন। পাপমুক্ত জীবন নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে পারাই হবে এ পাথর স্পর্শ ও চুম্বনের উত্তম প্রতিদান। হজের সফর দোয়া কবুলের অপূর্ব সুযোগ। হজ বা ওমরাহর জন্য ইহরামের নিয়ত করা থেকে দোয়া কবুল হওয়া শুরু হয়। হজের সফরে এমন কিছু সময় ও স্থান রয়েছে যে সময় ও স্থানে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল যে স্থানগুলোতে নবীরাসুলদের দোয়া কবুল হয়েছিল বলে বর্ণিত আছে। সেসব জায়গায় দোয়া করা বাঞ্ছনীয়। মক্কা শরিফের সব স্থানে দোয়া কবুল হয়।

পরিশেষে : আল্লাহতাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি হে দয়াময় সৃষ্টিকর্তা! তুমি আমাদেরকে শ্রেষ্ঠনবীর উম্মত হবার কল্যাণে আমাদের দোষত্রুটি ক্ষমা করে তোমার রহমতের বারিধারায় আমাদেরকে সিক্ত করুন। তিনি যেন স্মৃতিবিজড়িতবেহেশতের দুটো ইয়াকুত পাথর হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম কে চুম্বন করার ও মাকামে ইবরাহিমের পাশে দুরাকাআত নামাজ পড়ার তাওফিক দান করেন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরবীন্দ্রনাথ
পরবর্তী নিবন্ধআমার দেখা সুবর্ণভূমি