সরাসরি নাগরিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ জানতে এক মাস আগে ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ নামে একটি অ্যাপস চালু করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। গতকাল পর্যন্ত ওই অ্যাপস–এ ৫৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে মশা সংক্রান্ত। অর্থাৎ দৈনিক ২ জন ব্যক্তি মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছেন মশক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান চসিকের কাছে। অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালেও মশার উপদ্রব বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ আছে নগরবাসীর।
সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নগরে গত মাসে (জুলাই) ২২৩ জন ডেঙ্গু রোগী শানাক্ত হয়। বিপরীতে চলতি আগস্ট মাসে এ পর্যন্ত ( গতকাল ১৯ আগস্ট পর্যন্ত) শনাক্ত হয় ৩০০ জন। যা চলতি বছরে মাস ভিত্তিক পরিসংখ্যানে সর্বোচ্চ। এছাড়া গতকাল চট্টগ্রামে নতুন করে শনাক্ত হওয়া ৪২ জন ডেঙ্গু রোগীর ১৮ জনই হচ্ছেন নগরের বাসিন্দা। সিভিল সার্জন অফিসের এ তথ্য থেকে স্পষ্ট নগরে বেড়েছে এডিস মশার উপদ্রব। এর আগে গত জুন মাসে স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপে নগরের ৮টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া ১৫টি ওয়ার্ডে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়। সর্বশেষ চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ নগরে ৯২টি মশার সম্ভাব্য ব্রিডিং জোন বা প্রজনক্ষেত্র চিহ্নিত।
চসিকের অ্যাপস, সিভিল সার্জন অফিসের ডেঙ্গু প্রতিবেদন ও স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপ থেকে স্পষ্ট, নগরে মশার পাশাপাশি বেড়েছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। এতে উদ্বিগ্ন নগরবাসী মশক নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামসহ সারা দেশে পালিত হবে বিশ্ব মশা দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে চসিক। এর মধ্যে আজ কোতোয়ালী মোড় ও বায়েজিদ এলাকায় মশক নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম ও পাথরঘাটায় একটি স্কুলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এছাড়া চলবে সপ্তাহব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালত। উল্লেখ্য, ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট ম্যালেরিয়ার সঙ্গে মশার সম্পর্ক আবিষ্কার হয়। এর আবিষ্কারক রোনাল্ড রস। দ্য লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের উদ্যোগে ১৯৩০ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনে বিশ্ব দিবস পালন করে আসছে। মশাবাহিত রোগের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য দিবসটি পালন করা হয়।
সর্বশেষ জরিপে এডিস লার্ভার উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিকের বেশি : নগরের ১৮টি ওয়ার্ডে গত ৮ থেকে ১৭ জুন সর্বশেষ মশা জরিপ করে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর। ওয়ার্ডগুলোর ৩৭০টি বাড়ির মধ্যে ৯৯টি বাড়ি ও ৩৪৫টি কনটেইনার বা পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ২৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িতে ও ৩৩ শতাংশ কনটেইনারে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অথচ হাউজ ইনডেক্স ৫ শতাংশের নিচে এবং কনটেইনার ইনডেক্স ২০ শতাংশের মধ্যে থাকলে তাকে স্বাভাবিক বলা হয়। ওই হিসেবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয় গেছে জরিপে।
জরিপে যত লার্ভা পাওয়া যায় তার ৮০ শতাংশ ‘এডিস ইজিপটাই’ এবং বাকি ২০ শতাংশ ছিল ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’ ধরনের। এডিস ইজিপটাই হল ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক মশা। এডিস অ্যালবোপিকটাস ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসের দ্বিতীয় প্রধান বাহক। জরিপের ভিত্তিতে নগরের ৮ ওয়ার্ডকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা করা হয়। ওয়ার্ডগুলো হচ্ছে– ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ, ২ নম্বর জালালাবাদ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ও ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড।
৯১ মশা প্রজন ক্ষেত্র : নগরে ৯২টি মশার সম্ভাব্য ব্রিডিং জোন বা প্রজননক্ষেত্রে চিহ্নিত করে চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ। এর মধ্যে ৭১টি স্পটে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা।
চসিক যে ৯২টি ব্রিডিং জোন চিহ্নিত করে পাঁচলাইশ ওয়ার্ডে ১৫টি, জালালাবাদ ওয়ার্ডে ২২ টি, চকবাজার ও পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডে ১০টি করে ২০টি, উত্তর কাট্টলি ওয়ার্ডে ৩১টি ও পাথরঘাটা ওয়ার্ডে রয়েছে ৪টি ব্রিডিং জোন। ব্রিডিং জোনগুলো হচ্ছে– পাঁচলাইশ ওয়ার্ডে নয়ার হাট বাজার, কুয়াইশ রোড, বকশি নগর, চালিতাতলী (নির্মাণাধীন ভবন) চালিতাতলী বাজার, চালিতাতলী শীলবাড়ি মন্দির, পাঁচলাইশ উচ্চ বিদ্যালয়, রূপনগর আবাসিক, গুলবাগ আবাসিক, আহমেদিয়া হাউসিং সোসাইটি, পশ্চিম শহীদ নগর, মধ্যম শহীদ নগর, আব্দুস ছত্তার টাওয়ার (নির্মাণাধীন বিল্ডিং), অক্সিজেন আবাসিক এলাকা, পাঠানপাড়া ও আতুরার ডিপো (জাহানপুর, হাসেমপাড়া বাজার)।
জালালাবাদ ওয়ার্ডের জামশেদ শাহ রোডের আশেপাশের মসজিদ মাদ্রাসা ও পরিত্যক্ত জায়গাসমূহ, অন্ধ হুজুরের মাজার ও আশ পাশের খালি ডোবা, খন্দকিয়া হাট, কে বি গ্রামার স্কুল, তুফানি রোডের বালুছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আগুন ফকিরের মাজার, বালুছড়া আবাসিকের শুরুর দিকের নির্মানাধীন ভবন, বালুছড়া আবাসিকের সাইনিং জুয়েল স্কুল, শীতল ঝর্না আবাসিক, জেলা পরিষদ আবাসিক, ওয়াবদা গলি কলোনি, আলপনা কম্পিউটারের উত্তরপাশ, খাজা টাওয়ার এরিয়া, অক্সিজেন মোড়ের পাশের আবাসিক এরিয়া, ক্যান্টনমেন্ট গেইটের বিপরীতের দোকানসমূহ, সেনা কল্যাণ মিলের সামনের রাস্তার ফুলের টব, শেরশাহ সংলগ্ন বাজার, কলোনি ও হাউজিং, কুঞ্জছায়া আবাসিক, ডেবারপার এলাকা, চন্দননগর বাজার ও আবাসিক, শ্যামল ছায়া আবাসিক, বিহারি কলোনি ও সড়ক ও জনপদ কোয়াটার।
চকবাজার ওয়ার্ডের কাতালগঞ্জ–পরিত্যক্ত ভবন, কাপাসগোলা কলেজ, এগারো ভাইয়ের বিল্ডিং, টুপি ওয়ালা পাড়া, চট্টগ্রাম কলেজ, মহসিন কলেজ, মীর নাসির গলি, মুন্সিপুকুর পাড় ও চকবাজার কাঁচাবাজার। পশ্চিম বালিয়া ওয়ার্ডের মৌসুমী আবাসিক এলাকা, বিএড কলেজ, বাকলিয়া স্কুল (প্রাইমারি ও মাধ্যমিক), কালাম কলোনি (আব্দুল লতিফ রোড), চান মিয়া মুন্সির লেইন, তাহের কলোনি, শান্তি নগর এলাকা, মিয়া বাপের মসজিদ সংলগ্ন এলাকা ও মদিনা মসজিদ লেইন (নির্মাণাধীন ভবন)। পাথরঘাটা ওয়ার্ডের তিলোত্তমা, এসপি সাহেবের ড্রেন, ইসলাম কলোনি ও মনোহালী।
উত্তর কাট্টলি ওয়ার্ডের বড় কালি বাড়ি (ঈশান মহাজন রোড) গোলার বাড়ি (সিটি গেইট সংলগ্ন), মনসুরাবাদ, সাগরিকা শিল্প এলাকা, কাস্টমস একাডেমি ল্যাবরেটরি স্কুল, খেজুরতলা জেলেপাড়া, বিশ্বাস পাড়া, আমানত উল্লাহ শাহ পাড়া, নাজির বাড়ি, মুন্সি বাড়ি, মুকিম তালুকদার বাড়ি (স্টেডিয়াম সংলগ্ন), সিডিএ ও প্রশান্তি আবাসিকের নালা, আগ্রাপাড়া (ভিক্টোরিয়া জুট মিল), কুতুব বাড়ি, জাকের উল্লাহ সওদাগরের বাড়ি, বশির মোহাম্মদ বাড়ি, মোস্তফা হাকিম কলেজ রোড, আচার্য্য পাড়া, তমিজুর রহমানের বাড়ি (্উত্তর কাট্টলি ওয়ার্ড অফিস সংলগ্ন), পন্ডিত বাড়ি, ছোট কালি বাড়ি, কাট্টলী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাট্টলী নুরুল হক চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁন মিয়া ডাক্তারের বাড়ি, উত্তর সরাইপাড়া (অলংকার) আশরাফ আলী চৌধুরী বাড়ি (কর্নেল হাট), সিরাজ উদ্দিনের বাড়ি (কর্নেল হাট), নূর মোহাম্মদ বাড়ি (কর্নেল হাট), পেয়ারি মোহন সেনের বাড়ি ও সাহের পাড়া।
কী বলছে চসিক : চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহী আজাদীকে বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপে যে ৮টি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড চিহ্নিত করেছে সেখানে মশক নিধন কার্যক্রমে আমরা জোর দিয়েছি। এছাড়া আমরা মশার সম্ভাব্য ৯২টি ব্রিডিং জোন চোন চিহ্নি করেছি। যার মধ্যে ৭১টিই ধ্বংস করেছি। বাকি ২১টিতেও কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, কিছু ছোট ছোট ব্রিডিং জোন আছে। সেখানে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি, আবার বৃষ্টিও চলমান। ফলে একেবারে ব্রিডিং জোন ধ্বংস হয়েছে বলা যাবে না। সেখানে আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। মশার কীটনাশক ও স্প্রে ম্যান বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, পর্যাপ্ত কীটনাশক আছে। আমরা লার্ভিসাইড, এডাল্টিসাইডের পাশাপাশি বিটিআইও ব্যবহার করছি।











