মনির যেভাবে গোল্ডেন মনির

রাজধানীর বাড্ডায় গ্রেপ্তার, ৬শ ভরি স্বর্ণ ও কোটি টাকা জব্দ ৩০ স্থানে বাড়ি-জমি, দুইশর বেশি প্লট

আজাদী ডেস্ক | রবিবার , ২২ নভেম্বর, ২০২০ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ

ঢাকার মেরুল বাড্ডায় ‘গোল্ডেন মনির’ নামে পরিচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনির হোসেনের বাড়িতে ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, মাদক ও নগদ কোটি টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব। শুক্রবার মধ্যরাতে শুরু হয়ে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত চলা এই অভিযানে মনিরকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তিনি সোনা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত থাকলেও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি বলছে, তিনি স্বর্ণ ব্যবসায়ী নন। মনিরের ছয়তলা বাড়িতে র‌্যাব-৩ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসুর নেতৃত্বে এ অভিযান চলে।
অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে অভিযান চালানোর পর মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান র‌্যাব-৩ এর অপস অফিসার সহকারী পুলিশ সুপার ফারজানা হক। তিনি বলেন, মনিরের বাড়ি থেকে নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা, চার লিটার মদ, ৮ কেজি স্বর্ণ, একটি বিদেশি পিস্তল, কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।
র‌্যাব অস্ত্র ও মদের পাশাপাশি ৯ লাখ টাকা মূল্যের ১০টি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা জব্দ করেছে। অস্ত্র, মাদক ও বিদেশি মুদ্রা রাখায় মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় অস্ত্র, মাদক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করবে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।
মনিরের বাড়িতে ৫টি গাড়ি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে তিনটি গাড়ির বৈধ কাগজপত্র নেই বলে সেগুলো জব্দ করা হয়েছে। মনিরের ১ হাজার ৫০ কোটি টাকার উপর সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে র‌্যাব। বাড্ডা, নিকেতন, কেরানীগঞ্জ, উত্তরা, নিকুঞ্জে দুইশর বেশি প্লট রয়েছে তার।
র‌্যাব জানিয়েছে, মনিরের বিরুদ্ধে রাজউকের সিল নকল করে ভূমিদস্যুতার একটি এবং দুদকের একটা মামলা রয়েছে। নাম উল্লেখ না করে র‌্যাব জানিয়েছে, মনির একটি রাজনৈতিক দলে ‘অর্থ জোগানদাতা’।
মনির যেভাবে ‘গোল্ডেন মনির’ : ৯০ দশকের দিকে রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকানের কর্মচারী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন মনিরুল ইসলাম ওরফে মনির। পরে নিজেই ক্রোকারিজ পণ্যের দোকান দিয়ে বসেন। ওই ব্যবসায় বেশি লাভ করতে না পেরে স্বর্ণের দোকান দেন তিনি।
লোভে পড়ে যুক্ত হন লাগেজ ব্যবসায় (চোরাচালানি)। বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের চোরাচালানীর এক পর্যায়ে স্বর্ণ চোরাচালানি কারবারে যুক্ত হন। রাতারাতি বনে যান কোটিপতি। মানুষ জেনে যায় তার ব্যবসার রহস্য। স্বর্ণ চোরাকারবারি হিসেবেই মানুষ তাকে চিনতে থাকে। মানুষের মুখে মুখেই তার নাম মনির থেকে হয়ে ওঠে ‘গোল্ডেন মনির’।
চোরাকারবারি বাধামুক্ত করতে তিনি আশ্রয় নেন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায়। বনে যান হাজার কোটি টাকার মালিক। জমি-প্লট দখলে মগ্ন হয়ে অবৈধ অর্থে রাজধানীর মেরুল বাড্ডা, (ডিআইটি প্রজেক্ট) নিকুঞ্জ, পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জে দুই শতাধিক প্লট ও বাড়ি নিজের করে নেন। শুধু বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টে তার ৩০টিরও বেশি প্লট রয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব সূত্র।
নিজের বসবাসের জন্য ডিআইটি প্রজেক্টে নির্মাণ করেছেন ৬ তলার একটি আলিশান বাড়ি। বাড়ির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা ডুপ্লেক্স এবং উপরের বাকি ফ্লোরগুলো তিনি ভাড়া দেন। যদিও করোনাকালে ভাড়াটিয়া সব চলে গেছেন। র‌্যাব সূত্র জানায়, গতকাল ১১টার এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে তার দুবাই যাওয়ার কথা ছিল।
র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোল্ডেন মনির হুন্ডি ব্যবসা, স্বর্ণ চোরাচালানের অবৈধ টাকা ঢাকতে আয়ের উৎস হিসেবে রাজধানীর বারিধারায় ‘অটো কার সিলেকশন’ নামে একটি গাড়ির শো-রুম চালু করেন। সেখানেও তিনি অবৈধ পথে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করতেন।
র‌্যাব সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দল ও সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজস করে ৯০ দশক থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার কোটি টাকার সম্পদ করেছেন। তিনি বিএনপির একজন ডোনার ছিলেন। দলকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন বলেও তথ্য রয়েছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কার্যালয়ে গোল্ডেন মনিরের ছিল প্রভাব। সেখানে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে রাজধানী ও তার আশেপাশের এলাকার বিভিন্ন জমি দখল করেছেন। রাজউকের একজন সাবেক চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার তথ্যও রয়েছে। তার সহযোগিতায় মনির রাজউক কার্যালয়ে নিজের অফিস হিসেবে একটি রুম ভাড়া নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি ওই রুম অফিস হিসেবে ব্যবহারও করেছেন। এছাড়া রাজউকের সিল জালিয়াতি করে একটি জমির দলিল নিজের নামে করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে রাজউক তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের করেছিল।
র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, স্বর্ণ চোরাচালানের কারণে ধীরে ধীরে তার নাম হয়ে ওঠে গোল্ডেন মনির। এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। একটি দুদকে এবং অপরটি রাজউকের সিল জালিয়াতি দায়ে। আমরা তার সম্পদের সঠিক তথ্য জানতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও এনবিআরের কাছে তথ্য চেয়ে আবেদন করব। সেই সঙ্গে অবৈধ গাড়ির বিষয়ে বিআরটিএর তথ্য চেয়ে আবেদন করব।