মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন করে চাপে পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা থেকে আভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া, জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং টাকার অবমূল্যায়নের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংসের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই বহুমুখী ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে ইতোপূর্বে সংস্থাটি বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলেও সরকার সফলভাবে তা সামলে ওঠেছে।
সংস্থাটির মতে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রবাসী শ্রমবাজারের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাতের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়েও সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করে।
ফিচের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বার্ষিক তেল আমদানি ব্যয় প্রায় ১২০ কোটি ডলার বা ১.২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যেতে পারে। জিডিপির হিসাবে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ০.২ শতাংশ। বিশ্ববাজারে তেলের দামের সামান্য বৃদ্ধি হলেও বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে তার বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বিবেচনায় এই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ফিচের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক এসেছে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান, আয় ও দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সংঘাতের কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়া, নতুন শ্রমিক নিয়োগ কমে যাওয়া কিংবা নিরাপত্তার কারণে তাদের দেশে ফিরে আসার পরিস্থিতি তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ কমে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হবে। ফিচ সতর্ক করেছে, রেমিট্যান্স কমে গেলে দেশের বৈদেশিক তারল্য পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বড় রকমের ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে ফিচ বলেছে, দেশের মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পকারখানা ও পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি থেকে। আমদানিনির্ভর এই জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে। এতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নয়, সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ফিচ বলেছে, জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য আরও খারাপ হবে এবং টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হবে। এর প্রভাবে খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফিচের রিপোর্টে বলা হয়, এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মন্থর প্রবৃদ্ধির চাপ সামলাচ্ছে। ফিচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ২ দশমিক ২ শতাংশে। পরবর্তী প্রান্তিকে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ালেও অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে। এর প্রভাব পড়বে শিল্প, কৃষি, ব্যবসা–বাণিজ্য ও ভোক্তা পর্যায়ে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স কমে গেলে ডলারের যোগান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিনিময় হারের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও কঠিন করে তুলবে।
জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকলে সরকারকে বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে ভর্তুকি বাড়াতে বা বিদ্যমান ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হতে পারে। এতে বাজেটের ব্যয় বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও সংকট তৈরি হবে। একদিকে জ্বালানি আমদানির জন্য বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকারি ভর্তুকি দিতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে। এ পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ব্যয় সংকোচন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও সংকট দেখা দিতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব নিয়ে ফিচ রেটিংসের উদ্বেগ এবারই প্রথম নয়। এর আগে মে মাসে সংস্থাটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক ক্রেডিট রেটিংসের পূর্বাভাসে ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ হবে বলে উল্লেখ করে। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রেডিট রেটিংস ‘বি প্লাস’ অপরিবর্তিত রাখে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ভর্তুকি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ সব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স এবং জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় একই সময়ে দুটি খাতে ধাক্কা লাগলে পরিস্থিতি সামলে নেওয়া কঠিন হতে পারে।











