বোরোতে রেকর্ড চাল পাওয়ার আশা

ভারী বর্ষণে কিছুটা ক্ষতি, শ্রমিক সংকট ও মজুরি চড়া

হাসান আকবর | রবিবার , ১০ মে, ২০২৬ at ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ

এপ্রিলের শেষ ভাগে ভারী বর্ষণ এবং কোনো কোনো এলাকায় পাহাড়ি ঢলে ফসলের কিছুটা ক্ষতি হলেও এবার চট্টগ্রামে ১৩ লাখ টনের বেশি বোরো ধানের চাল পাওয়া যাবে। উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষ এবং বাম্পার ফলন হওয়ায় রেকর্ড পরিমাণ চাল পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে শ্রমিক সংকটসহ নানা কারণে ফসল তোলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। ইতোমধ্যে ২৫ শতাংশের মতো ধান কাটা শেষ হয়েছে। বাকি ধানগুলো ভালোয় ভালোয় ক্ষেত থেকে গোলায় তুলতে পারলে কৃষকেরা স্বস্তি পাবেন বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৬৯ হাজার ৩৪৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের চাষাবাদের ফলে এ অঞ্চলে বোরো ধানের উৎপাদন বাড়ছে। বাম্পার ফলন হওয়ায় চলতি বছর ১৩ লাখ টনের বেশি বোরো ধানের চাল পাওয়া যাবে। এপ্রিলের শেষের দিকে এসে ভারী বৃষ্টিপাতে বেশ ফসলহানি হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, ব্যাপক হারে ফসল নষ্ট হওয়ার কোনো সংবাদ আসেনি। ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার তিনটি স্থানে পাহাড়ি ঢলে পাকা বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য উপজেলায়ও টুকটাক কিছু ক্ষতি হয়েছে। বড় ধরনের পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা না হওয়ায় ফসল রক্ষা পেয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, ভাগ্যক্রমে ফসল রক্ষা হয়েছে। বহু কৃষক ক্ষতির আশঙ্কায় আগাম ফসল কেটে ফেলেছেন বলেও তারা জানান।

চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় ইতোমধ্যে গড়ে ২৫ শতাংশের মতো ফসল কাটা হয়েছে। বাকি ফসলগুলো চলতি মাসের মধ্যে কেটে ফেলা হবে।

সীতাকুণ্ডের একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, এপ্রিলের শেষ নাগাদ ভারী বৃষ্টিতে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এপ্রিলের শেষ দিকে এমন ভারী বৃষ্টিপাতের রেকর্ড নেই। এবার বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকদের মাঝে উদ্বেগ দেখা দেয়। অনেকে আগাম ফসল কেটে ফেলেছেন। আগাম ফসল কাটায় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মতামত দেন তারা।

বোরো ধান উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় উপজেলা বাঁশখালীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাঁশখালীতে পাকা বোরো কাটা শুরু হয়েছে। মাঝখানে ভারী বৃষ্টিপাতসহ ঝড়বজ্রপাত হলেও কোথাও ফসলহানির তেমন ঘটনা ঘটেনি। টার্গেট ছিল এ বছর বাঁশখালীতে ১১ হাজার ৯৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ করার, কিন্তু চাষের জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১০ হেক্টর।

ফটিকছড়ির বোরো উৎপাদন প্রসঙ্গে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এপ্রিল শেষের ভারী বর্ষণে বোরো ফসলের সামান্য ক্ষতি হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে সব ফসল কাটা শেষ হবে। ইতোমধ্যে ফটিকছড়ির অন্তত ২৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। ফটিকছড়িতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমি, কিন্তু তা বেড়ে আবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমিতে।

চট্টগ্রামের শস্যভান্ডার খ্যাত রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিলসহ তিনটি স্থানে এপ্রিলের ভারী বর্ষণ এবং ঢলে বোরো ফসলের বেশ ক্ষতি হয়েছে। ভারী বর্ষণে গুমাইবিলের ব্রহ্মোত্তর এলাকা, পদুয়া ইউনিয়ন এবং কোদালা ইউনিয়নের বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষকেরা আগাম ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন। ইতোমধ্যে গুমাইবিলের ২৫ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। গুমাইবিলে আনুষ্ঠানিক ধান কাটা শুরু হয়েছে ২১ এপ্রিল। রাঙ্গুনিয়ায় এ বছর ৯ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে বলেও কৃষি বিভাগ জানায়।

একাধিক উপজেলার কৃষক এবং কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে বোরো ধান কাটায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে শ্রমিক। শ্রমিক জুটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এক হাজার থেকে বারোশ টাকা পর্যন্ত শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে। সাথে থাকাখাওয়াও দেওয়া হচ্ছে কোনো কোনো এলাকায়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমের কারণে শ্রমিকেরা কাজ করতে পারছেন না। বেলা বাড়ার সাথে সাথে কাজ বন্ধ করে দিয়ে মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় সকালে ঘণ্টাচারেক কাজ করে পুরো দিনের বেতন দিতে হচ্ছে। শ্রমিকদের বাড়তি মজুরি এবং কাজ করতে না পারার পরিস্থিতিতে ঠিকভাবে ধান কাটা কঠিন হয়ে উঠছে। আবহাওয়া খারাপ হয়ে গেলে ফসল তোলার ক্ষেত্রেও সংকট দেখা দেবে।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সংকট থাকলেও বোরোর বাম্পার ফলনে তারা আশাবাদী। চলতি মৌসুমে ১৩ লাখ টনের বেশি বোরো চাল পাওয়া যাবে উল্লেখ করে কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এই বিপুল উৎপাদন দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইউপিডিএফ কর্মীকে গুলি করে হত্যা
পরবর্তী নিবন্ধমারা গেছে আরো ৯ শিশু, মৃত্যু ৩৫০ ছাড়াল