যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় চলছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞের। এবারই প্রথমবার ৪৮ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ। এই আসরেই অভিষেক হয়েছে একাধিক দলের, যারা এবারই প্রথমবার লড়বে বিশ্বমঞ্চে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে এসেছে উজবেকিস্তান, জর্ডান, কেপ ভার্দে ও কুরাসাও। শেষ দুটি দেশের নাম প্রায় মানুষের কাছে অপরিচিত।
কুরাসাও
জ্যামাইকার বিপক্ষে ড্র করে প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে ২০১০ সালে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র কুরাসাও। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইতিহাসের অন্যতম ক্ষুদ্র দেশ কুরাসাও। আয়তনও খুব ছোট– মাত্র ১৭১ বর্গমাইল। তবুও সীমিত সম্পদ আর ছোট পরিসরের দেশ হয়েও বিশ্বকাপের মঞ্চে ওঠার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করেছে তারা। দলটির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন অভিজ্ঞ ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। ৭৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সবচেয়ে প্রবীণ কোচ হিসেবেও ইতিহাস গড়েছেন তিনি। ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে মাত্র ৩৭ মাইল দূরে অবস্থিত কুরাসাও নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস ভেঙে যাওয়ার পর নেদারল্যান্ডসের অন্তর্ভুক্ত স্বশাসিত দেশ হিসেবে নতুন পরিচয় পায়। এরপর ধীরে ধীরে ফুটবল অঙ্গনেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে তারা। একসময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০–এর নিচের সারিতে থাকা কুরাসাও এখন উঠে এসেছে ৮০–এর ঘরে।
অনেকেই হয়তো দেশটির নামের সাথে মিল খুঁজে পাবেন জাপানের চলচ্চিত্র নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়ার। তাঁর সিনেমার মতোই দেশটির ইতিহাসও বেশ গতিশীল এবং ঘাত–প্রতিঘাতে গড়া। অর্জনের বিশালতায় ক্ষুদ্র দ্বীপদেশটি যে ছাপিয়ে গেছে বিশ্বের অনেক দেশকেও। কুরাসাও নামটির উৎপত্তি সম্ভবত দ্বীপের আদিবাসীদের আত্মপরিচয়মূলক নাম থেকে এসেছে। এই ধারণার সমর্থনে প্রাথমিক স্পেনীয় বিবরণে দ্বীপের অধিবাসীদের ‘ইন্দিওস কুরাসাওস’ নামে উল্লেখ করা হয়। কুরাসাওয়ের ইতিহাস শুরু হয় আরাওয়াক ও কাকেতিও আদিবাসীদের মাধ্যমে। ১৬৩৪ সালে ডাচরা দ্বীপটি দখল করার পর এর অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে বাণিজ্য ও নৌপরিবহন। পরবর্তীকালে কুরাসাও আটলান্টিক দাসব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৯১৪ সালে মারাকাইবোতে তেলের আবিষ্কার কুরাসাওয়ের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে। পরবর্তীকালে নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অন্তর্গত একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ হওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং অবশেষে ২০১০ সালে কুরাসাও স্বায়ত্তশাসিত দেশের মর্যাদা লাভ করে। কুরাসাওর বর্তমান শাসনকর্তা বা গভর্নর মরিস ডি কর্ট, তিনি রাজা উইলেম–আলেকজান্ডারের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজধানী ভিলেমস্টাড।
২০২৩ সালের গণনা অনুযায়ী, দেশটিতে বসবাস করে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮২৬ জন মানুষ। কুরাসাও–এর আগে ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সবচেয়ে ছোট দেশ ছিল আইসল্যান্ড, যাদের জনসংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজার। ক্যারিবীয় সাগরের বুকে একটি দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও। কুরাসাও যদিও প্রথম ম্যাচে খেলতে নেমে ৭–১ গোলে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানির কাছে ধরাশায়ী হলেও দ্বিতীয় ম্যাচে ইকুয়েডরের সাথে গোলশূন্য ড্র করে।
কেপ ভার্দে
আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র কেপ ভার্দে এবার প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে ফিফা বিশ্বকাপের মূল আসরে। মাত্র প্রায় ছয় লাখ জনসংখ্যার দেশটি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে উঠে এসে তৈরি করেছে নতুন ইতিহাস। কেপ ভার্দে উপদ্বীপ হলো পশ্চিম–মধ্য সেনেগালের একটি উপদ্বীপ, যা আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিমতম বিন্দু। উপকূলীয় স্রোতের ফলে সৃষ্ট একটি স্থলসেতু এবং আগ্নেয়গিরি দ্বারা গঠিত কয়েকটি অফশোর দ্বীপপুঞ্জের সমন্বয়ে এটি আটলান্টিক মহাসাগরে প্রসারিত হয়েছে। এর অগ্রভাগ দক্ষিণ–পূর্ব দিকে বেঁকে গেছে। দক্ষিণ–পশ্চিমী বাতাসের প্রভাবে কেপ ভার্দে ঋতুভেদে সবুজ হয়ে ওঠে, যা এর উত্তরের ঢেউখেলানো হলুদ বালিয়াড়ির থেকে ভিন্ন। এই অন্তরীপেই সেনেগালের রাজধানী ডাকার এবং এর নিকটবর্তী উপশহরগুলো অবস্থিত।
উপদ্বীপটি একটি ত্রিভুজের মতো আকৃতির (প্রতিটি বাহু প্রায় ৯ মাইল), যার ভূমি মোটামুটিভাবে উত্তর দিকে এবং শীর্ষবিন্দুটি দক্ষিণ দিকে অবস্থিত, যেখানে ডাকার সমুদ্রবন্দরটি রয়েছে। অন্তরীপের উত্তর–পশ্চিম প্রান্ত পোয়াঁত দে আলমাদিয়ের কাছে ডাকারের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবস্থিত, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি আন্ত:আটলান্টিক ফেরি পারাপারের কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল। ১৪৬২ সালে পর্তুগিজ বসতি স্থাপনকারীরা সান্তিয়াগোতে এসে রিবেইরা গ্রান্দে নামে একটি বসতি স্থাপন করে। আজ এটিকে রিবেইরা গ্রান্দে থেকে আলাদা করার জন্য সিদাদে ভেলহা (পুরাতন শহর) বলা হয়। মূল রিবেইরা গ্রান্দে ছিল গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে প্রথম স্থায়ী ইউরোপীয় বসতি।
ষোড়শ শতাব্দীতে আটলান্টিক দাস ব্যবসার ফলে দ্বীপপুঞ্জটি সমৃদ্ধি লাভ করে। জলদস্যুরা মাঝে মাঝে পর্তুগিজ বসতিগুলিতে আক্রমণ করত। ফ্রান্সিস ড্রেক, একজন ইংরেজ প্রাইভেটিয়ার ১৫৮৫ সালে দুইবার রিবেইরা গ্রান্দে লুণ্ঠন করেন যখন এটি আইবেরিয়ান ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৭১২ সালে ফরাসি আক্রমণের পর, নিকটবর্তী প্রাইয়ার তুলনায় শহরটির গুরুত্ব হ্রাস পায়, যা ১৭৭০ সালে রাজধানী হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে দাস ব্যবসার পতনের ফলে একটি অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ১৯৫৬ সালে আমিলকার ক্যাব্রাল এবং তার সহকর্মী কেপ ভার্দিয়ান ও গিনীয়দের একটি দল (পর্তুগিজ গিনিতে) গিনি এবং কেপ ভার্দের স্বাধীনতার জন্য গোপন আফ্রিকান পার্টি গঠন করে। ১৯৬০ সালে গিনির কোনাক্রিতে এর সদর দপ্তর স্থানান্তরিত করে, ১৯৬১ সালে পর্তুগালের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। পর্তুগিজ গিনি ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯৭৪ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭৫ সালের কেপ ভার্দীয়রা একটি জাতীয় পরিষদ নির্বাচিত করে, যা ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতার দলিল লাভ করে। কেপ ভার্দের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোসে মারিয়া নেভিস, রাজধানী প্রাইয়া। ৫ লক্ষ ৩০ হাজার জনসংখ্যার কেপ ভার্দে ইতোমধ্যে সবাইকে চমকে প্রথম ম্যাচে স্পেনকে রুখে দিয়েছে। আর দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের সাথে ২–২ গোলে ড্র করে।








