প্রাকৃতিক দুর্যোগের শেষ নেই। বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ জনজীবন বিপর্যস্ত করে দেয়। কখনো বন্যা কখনো ঘূর্ণিঝড় আবার কখনো জলোচ্ছ্বাস একের পর এক লেগেই থাকে। টানা বৃষ্টি বা ভারী বর্ষণ কিংবা পাহাড়ি ঢলে বন্যা দেখা দেয়।
গ্রামের মানুষ বন্যার শিকার আর শহরের মানুষ জলবদ্ধতার শিকার। দুএকদিন বৃষ্টি হলে শহরের নানা জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বর্ষার সময় বৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। আষাঢ় শ্রাবণ বৃষ্টির মাস। বৃষ্টির পানি নিস্কাশনের পরিকল্পিত কোন ব্যবস্থা শহরে নেই। শহরের নালা নর্দমা প্রায় সময় ময়লা আবর্জনায় ভরে থাকে। তাই সহজে পানি নিষ্কাশন করা যায় না। যেখানে খাল বা ড্রেন আছে সেগুলো নানা রকম জঞ্জালে পরিপূর্ণ। ফুটপাত দখলের মতো নালা নর্দমার উপর অবৈধ দখলদারেরা স্থাপনা তৈরি করে ফেলেছে। কোথাও কোথাও নালা বা ড্রেনের চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায় না। যেখানে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে ঘর বাড়ি তোলে জলবদ্ধতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আবার বহুতল ভবনের যুগ।
শহরে যানজটের মতো জলজটেও নগরবাসী চরম দুর্ভোগে পড়ে। বর্ষার আগে পরে তিন চার মাস মানুষ জলাবদ্ধতায় আটকে থাকে। মাঝে মাঝে রাস্তায় কোন ধরনের যান চলাচল করতে পারে না। শহরের রাস্তাগুলোতে এতো পানি জমে যায় যানবাহনের পরিবর্তে নৌকা চলাচল করতে পারে। মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নৌকা যোগে যাতায়াত করে। শহরে বৃষ্টি হলেই জলবদ্ধতা আর ময়লা আবর্জনাগুলো রাস্তায় চলে আসে। ফুটপাত ধরে হাঁটার কোন সুযোগ থাকে না। খেটে খাওয়া মানুষের দুঃখ কষ্টের সীমা থাকে না।
বর্ষাকালে মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না। শহরের বা গ্রামের রাস্তাঘাট পাকা হয়ে গেলেও মানুষ ভোগান্তিতে থাকে। নগর জীবনের সুযোগ সুবিধার কথা বলা হলেও মানুষকে একসময় চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের ভোগান্তির সীমা থাকে না। তারা সময় মতো স্কুলে পৌছঁতে পারে না। পরীক্ষার সময়ে নানা বাধার সম্মুখীন হয়। ঠিকমতো রিক্সা পাওয়া যায় না। যানবাহন পেতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আবার রাস্তার পানি জমে গেলে সে পথে যাওয়া যায় না। অনেকে কথা বললেও সমাধানের পথে কেউ এগিয়ে যায় না। বিভিন্ন সংস্থাগুলোরও এ ব্যাপারে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না।
বন্যায় ব্যাপক সম্পদ হানির পাশাপাশি অনেক প্রাণহানিও ঘটে। পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় আবার পাহাড়ে বা ভূমিধসেও মৃত্যু হয়। বন্যার সময় শিশু ও বৃদ্ধরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়ে। এরা কারো সাহায্য ছাড়া একাকি কোথাও যেতে পারে না। এমনকি আশ্রয় কেন্দ্রেও তারা পৌঁছতে পারে না। পানিবন্দি মানুষের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র হয় স্থানীয় কোন স্কুলে। অসহায় বানবাসি মানুষেরা এখানে আশ্রয় নেয়। শুকনো ছিড়া মুড়ি খেয়ে রাত কাটায়। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে দুই একদিনের বেশি থাকা যায় না। এসময়ে নানা রকম রোগ বালাই দেখা যায়। খাবার পানির অভাব দেখা যায়। অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই।
অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি বন্যা খরা ঘন ঘন বজ্রপাত এসবের অন্যতম কারণ পরিবেশের ভারসাম্য। অর্থাৎ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়নি বলে প্রকৃতির অস্বাভাবিকতা। শুধু আমাদের দেশে নয় বিশ্বব্যাপী প্রকৃতির প্রতি বৈরি আচরণ লক্ষ্য করা যায়। আমাদের এখানে গাছপালা বনবনানী যেভাবে উজাড় করা হয়েছে আবার যেভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে একই সাথে খাল ও নদী ভরাট করে শুধু প্রকৃতিক সৌন্দর্যকে বিনষ্ট করা হয়নি প্রকৃতিতে বিপন্ন করে তোলা হয়েছে। অন্যান্য দেশেও মানুষ প্রকৃতির বিপরীতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে প্রাকৃতির আজ এমন বিরূপ আচরণ।
যে কোন ধরনের দুর্যোগ আসতে পারে। এজন্য দুর্যোগ মোকাবেলার বা ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি থাকতে হয়। অর্থাৎ দুর্যোগের আগে কী কী ব্যবস্থা নেয়া যায় এবং দুর্যোগকালীন সময়ে কী করণীয়। ভয়াবহ দুর্যোগের সময় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্যোগকে সেভাবে মোকাবেলা করতে পারে না। ক্ষতি যা হবার তা হয়ে যায়। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে এগিয়ে আসে। বন্যার্তদের পাশে দিয়ে দাঁড়ায়। ত্রাণ কাজে অংশ নেয়। সাধারণ মানুষেরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। আমাদের তরুণরা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সমাজের বিত্তবানেরাও এগিয়ে আসে। আসলে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো সবার কর্তব্য। বন্যা কবলিত দুর্গত মানুষেরা যে কত অসহায় বোধ করে, তাদের পাশে না গেলে বোঝা যায় না। মানুষই পারে মানুষের জন্য কিছু করতে। এখনই সময় দুর্গতদের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেয়ার। তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী












