টানা চার দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী, পেকুয়া উপজেলা এবং বান্দরবান জেলা শহরসহ নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম উপজেলায় শত শত গ্রামের হাজারো ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। এদিকে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় বান্দরবানে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের মেয়াদ আরও দুদিন বাড়িয়ে ১২ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
চকরিয়া : টানা চার দিনের ভারি বর্ষণ ও পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অন্তত ১৪টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম পানিতে ভাসছে। এতে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। কয়েক ফুট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। অবিরাম ভারি বর্ষণের কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হওয়ায় ভয়াবহ বন্যার পূর্বাভাস দেখা দিয়েছে।
চকরিয়া উপজেলার হারবাং, বরইতলী, বমু বিলছড়ি, কাকারা, সুরাজপুর–মানিকপুর, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী, চিরিংগা নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর, সাহারবিল ইউনিয়নের নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অনেক ফসলি জমি, চিংড়িঘের তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। টানা প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় দুই উপজেলার পাহাড়ি এলাকার পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রশাসন মাইকিং করছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীদ দেলোয়ার বলেন, ভারি বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। উজানের জল যাতে দ্রুত ভাটির দিকে নেমে যেতে পারে সেজন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর পানি নিষ্কাশনের স্লুইচ গেটগুলোর কপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। ইউএনও আরো বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কঙবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, মাতামুহুরী নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত নদীর জল বিপদসীমা ১১.৮০ মিটার অতিক্রম করে ১১.৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কঙবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, আগামী দুই দিনও ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়বে।
পেকুয়া : টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কঙবাজারের পেকুয়া উপজেলার সার্বিক জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বসতবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের আবুল হোসেন সিকদার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ও বিদ্যালয়ে প্রবেশের সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিদ্যালয়ে পাঠাতে দ্বিধায় পড়ছেন। অন্যদিকে টইটং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ও কয়েকটি শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। পানিবন্দি অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী, টইটং, শিলখালী, পেকুয়া সদর, বারবাকিয়া ও পেকুয়া পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অনেক স্থানে কাঁচা রাস্তা কাদাময় ও পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় হেঁটে চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে টইটং ইউনিয়নের হাজীবাজার ও সোনাইছড়ি, শিলখালী ইউনিয়নের মাঝেরঘোনা, হেদায়াতাবাদ, কাছারীমোড়া ও পেঠান মাতবরপাড়া, পেকুয়া পৌরসভার টেকপাড়া, সাগরপাড়া, সিরাদিয়া ও বিলহাচুরা, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মোরারপাড়া, সৈকতপাড়া ও পূর্ব মেহেরনামাসহ বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালী গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার বহু বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
পানিবন্দী মানুষের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরাও। বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলের আমন ধানের জমি, সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক গ্রামীণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কর্মজীবী মানুষ, রোগী ও শিক্ষার্থীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল–নালা ভরাট এবং কিছু এলাকায় স্লুইসগেটের কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারছে না। এতে অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেই জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করছে।
বান্দরবান : অব্যাহত ভারী বর্ষণ পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে জেলা শহরসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চল এবং নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম উপজেলায় সহস্রাধিক ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা কবলিতরা আশ্রয় কেন্দ্রে উঠতে শুরু করেছে। গতকাল বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় ৩০৯ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা আগের চব্বিশ ঘণ্টার দ্বিগুণ।
প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা জানায়, রোববার থেকে অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবান জেলা শহরের শেরেবাংলা নগর, আর্মিপাড়া, মেম্বারপাড়া, ইসলামপুর, উজানীপাড়া, মধ্যমপাড়া এলাকায় সহস্রাধিক ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিত তলিয়ে গেছে। জেলার সাতটি উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। সড়কে পানি উঠায় লামা–আলীকদম উপজেলা সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে।
এদিকে অব্যাহত বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাকখালী তিনটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব। জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সনাতন কুমার মন্ডল বলেন, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গতকালের (মঙ্গলবার) চেয়ে বেড়েছে। ভারি বৃষ্টিপাতে পাহাড় ধসে প্রাণহানির শঙ্কা থাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয় সরে যেতে বলা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, অবিরাম বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।নদী তীরবর্তী এবং পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। খোলা হয়েছে ২২০টি আশ্রয় কেন্দ্র এবং প্রশাসনের জরুরি কন্ট্রোল রুম।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়– সম্প্রতি বান্দরবান পার্বত্য জেলায় অব্যাহত ভারি বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঝুঁকির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যমান আবহাওয়া জনিত পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকির বিবেচনায় পর্যটক ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ৬ জুলাই জারি করা জরুরি গণবিজ্ঞপ্তির ধারাবাহিকতায় বান্দরবান জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র ১২ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝর্ণা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটক, ট্যুর অপারেটরসহ সর্বসাধারণের ভ্রমণ নিষিদ্ধ থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এর আগে ৬ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার ঘোষণা করে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন।












