শেয়ার মার্কেটের ধারাবাহিক পতন ঘটিয়ে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে যেসব অনিয়ম ও কারসাজি হয়েছে, বর্তমান সরকার তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।
গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে খুলনা–৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উত্থাপিত হয়। কুমিল্লা–৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্মানি পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। অন্যদিকে সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের অপর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করতে চায়। খবর বাংলানিউজ ও বিডিনিউজের।
আওয়ামী আমলে শেয়ার বাজারে দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির অভিযোগ ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক অনুসন্ধান করা হয়েছে। কতিপয় ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কারসাজির দায়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এক হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেছে। অপরাধীদের তালিকা অধিকতর তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলে শেয়ারবাজারের ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে– বাজার কারসাজি ও কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দর নিয়ন্ত্রণ; আইপিও ও বন্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়ম; নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘমেয়াদী তদারকির অভাব ও সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া; কর্পোরেট সুশাসনের ঘাটতি এবং আর্থিক তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অভাব ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অসঙ্গতি।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ও একটি টেকসই পুঁজিবাজার গঠনে বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো– ১. বিএসইসিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ। ২. বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার। ৩. লাভজনক সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তকরণে উদ্বুদ্ধ করা। ৪. ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিকে বাজারে আনা। ৫. কারসাজি রোধে তথ্য প্রদানকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ৬. অডিট ফার্মগুলোর জন্য প্যানেল নীতিমালা প্রণয়ন। ৭. ক্যাপিটাল গেইন ট্যাঙ হ্রাস ও লভ্যাংশ আয়ে দ্বৈত কর বাতিল। ৮. পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা দায়েরের বিধান। ৯. ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ এবং বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন। ১০. ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এআই (অও) ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু। ১১. ই–কেওয়াইসি ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন সহজীকরণ। ১২. বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল গঠন এবং ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা।
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার শেয়ার মার্কেটের স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। আমরা এমন একটি উন্নত পুঁজিবাজার গড়তে চাই যেখানে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।
শিক্ষকদের সম্মানি বাড়ানো প্রসঙ্গে : দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্মানি পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদে গতকাল বিকালে কুমিল্লা–৪ আসনে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ প্রতিশ্রুতি দেন।
টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে লিখিত বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, আমরা যদি আমাদের প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি শিক্ষকদেরকে সঠিকভাবে ট্রেনিং দিতে না পারি, সম্মানি যদি বৃদ্ধি করতে না পারি, তাহলে অবশ্যই তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করি না যে, তারা ভালো কিছু দিতে করতে পারবে। পর্যায়ক্রমিকভাবে তাদের সন্মানি বাড়ানো প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা এই কাজটি ইনশাল্লাহ করবো।
শিক্ষকদের সম্মানি বাড়ানোর প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক সময় দেখেছি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের তাড়াতাড়ি করে ক্লাস করে হয়ত আরেকটি সেকেন্ডারি জবে অথবা কৃষি কাজে যেতে হয়। তা না হলে তার জন্য সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে যায়। মাধ্যমিকের স্কুলের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি এরকম ঘটনা ঘটে। এই কাজ যাতে তাদের না করতে হয় এবং তারা যাতে সঠিকভাবে তাদের সময় এবং মেধা শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করতে পারেন, সেজন্য শিক্ষকদের সম্মানি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করি।
চলতি অর্থবছরে বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ শিক্ষাখাতে দেওয়ার কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য শাম্মী আখতারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের স্কুল ড্রেস প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। একইসঙ্গে তাদের স্কুল ব্যাগও দেব।
অন্যদিকে সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার নারী শিক্ষার পাশাপাশি নারীদের ক্ষমতায়ন অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবেও যাতে তারা শক্তিশালী হতে পারেন সেজন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে। আমরা একইসঙ্গে আরেকটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, যেটি বেগম খালেদা জিয়া সরকার করেছিলেন– মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা এইচএসসি পর্যন্ত ফ্রি করেছিলেন, আমরা এবার অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করতে চাই। ডিগ্রি বা অনার্স পর্যন্ত।
তিনি আরও বলেন, আজকে আমাদের সঙ্গে গ্যালারিতে অনেক নারী শিক্ষার্থী উপস্থিত আছেন। তারাও সরাসরি এই সংসদ অধিবেশনটি দেখছেন। আমরা অনার্স পর্যন্ত যে নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করব। তাদের মধ্যে যারা ভালো রেজাল্ট করবে তাদেরকে আমরা স্কলারশিপ দিতে চাই।









