ডিন ফক্সক্রফটের ডেলিভারিটির কোনো জবাব পাননি লিটন কুমার দাস। বোল্ড হয়ে বেশ কিছুক্ষণ ক্রিজে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যাটার। হয়তো বিস্ময়ে, হয়তো হতাশায়। তবে যেটিই হোক, লিটনের ওই প্রতিক্রিয়াই যেন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের একটি প্রতীকি দৃশ্য। একটি জায়গায় আছেন লিটন, আফিফ হোসেন, নাজমুল হোসেন শান্তরা। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে আউট হওয়ার আগ পর্যন্ত লিটনের ব্যাটিং ছিল মন্দের ভালো। ৪৬ রানের ইনিংস খেলেছেন। যদিও ফিফটি করা সাইফ আউট হওয়ার পর লিটনের দায়িত্ব ছিল ইনিংস আরও টেনে নেওয়া। তিনি সেটি তিনি পারেননি। তবে কিছু রান তো অন্তত করেছেন। সমস্যা হলো, ৪৬ রানের এই ইনিংসটি ১৮ ইনিংসের মধ্যে তার সর্বোচ্চ স্কোর। সেই ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে পুনেতে ৬৬ রানের ইনিংসের পর এই সংস্করণে তার পঞ্চাশের দেখা পাননি তিনি। মাঝে টানা ৯ ইনিংস তো দু অঙ্কই ছুঁতে পারেননি। ফিফটি খরার এই ১৮ ইনিংসে মোট ২৯৫ রান করেছেন স্রেফ ১৮.৪৩ গড়ে। স্ট্রাইক রেট ৭১.৪২। দলে জায়গাও হারিয়েছিলেন এই পরিক্রমায়। বাইরে থাকার সময় তেমন কিছু না করলেও গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে আবার তাকে ফেরানো হয়। এবার নতুন ভূমিকায়। এখন আর তিনি টপ অর্ডার নন, ৪ নম্বর পজিশনের ব্যাটসম্যান। মিডল অর্ডারে নেমে অবশ্য রানে ফিরতে পেরেছেন তিনি। কিউইদের বিপক্ষে এই ৪৬ রানের আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ দুই ওয়ানডেতে ৪১ রানের দুটি ইনিংস খেলেছিলেন। টানা ৩ ইনিংসে ৪০ ছোঁয়া ইনিংসে তার ফর্মে ফেরার আশা জেগে উঠেছে আবার। কিন্তু ফিফটির পর্যন্ত তো যেতেই পারছেন না! এই দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যাটার লিটন। দেশের চতুর্দশ ক্রিকেটার হিসেবে ম্যাচ খেলার সেঞ্চুরি হবে পরের ম্যাচেই। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের বয়স ১১ বছর হতে চলেছে। অথচ ব্যাটিং গড় মোটে ৩০.৩৩। এত বছর পরও দলে জায়গা নড়বড়ে। এত অভিজ্ঞ হয়েও টানা ১৮ ইনিংসে ফিফটি নেই। তবু তার ওপর ভরসা রাখতে হচ্ছে নির্বাচকদের ও টিম ম্যানেজমেন্টকে। মিরপুরে শুক্রবার লিটন আউট হওয়ার পর ক্রিজে যান আফিফ হোসেন। বাংলাদেশের ইনিংসও যেন থমকে যায়। তাওহিদ হৃদয়ের সঙ্গে আফিফের জুটির সময় টানা ১১ ওভারের বেশি সময় কোনো বাউন্ডারিই হয়নি। নাগালে থাকা ম্যাচটি তখনই কঠিন করে ফেলে বাংলাদেশ। সেখানে বড় দায় আফিফের। প্রায় এক ঘণ্টা ক্রিজে কাটিয়ে ৪৯ বল খেলেও কোনো বাউন্ডারি আদায় করতে পারেননি তিনি। এর চেয়েও দৃষ্টিকটূ ব্যাপার ছিল, কিছু করার চেষ্টা করেছেন বলেও মনে হয়নি। উইকেট যদিও মন্থর ছিল, বল থমকে এসেছে কিছুটা। বাউন্স ছিল একটু অসম। কিন্তু আফিফের ব্যাটিংয়ে কোনো তাড়নাই দেখা যায়নি। কিউই বোলাররা তাকে ড্রাইভ করার বল দেননি খুব একটা, লাইন–লেংথ রেখেছেন আঁটসাঁট। তিনিও উইকেটে স্রেফ পড়ে থেকেছেন, বাড়তি কিছু করার ইচ্ছে তার ব্যাটিংয়ে দেখা যায়নি। অথচ দ্রুত রান তোলার চাপ এ দিন ছিল না, প্রতিপক্ষের বোলিং ছিল না খুব ক্ষুরধার। তবু সময়ের দাবি তিনি মেটাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আউট হয়েছেন ২৯ রানে। এই চিত্রও নতুন নয়। ওয়ানডেতে এই নিয়ে টানা ১৭ ইনিংস পঞ্চাশের দেখা পেলেন না আফিফ। সবশেষ ২০২২ সালের অগাস্টে জিম্বাবুয়ে সফরে ৮১ বলে ৮৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন ছয়ে নেমে। পরের ১৭ ইনিংস এমনকি ৪০ ছুঁতেও পারেননি তিনি। এই সময়ে তার ব্যাটিং গড় ১৫.৪৬, স্ট্রাইক রেট ৭৬.৩১। আগের দুই সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ছয় ম্যাচেই তাকে টানা খেলানো হয়েছে। এই সিরিজের শুরুতেও সুযোগ পেলেন। প্রতিদান দিতে পারছেন সামান্যই। লিটন–আফিফদের আগে এই ম্যাচে ব্যর্থ হয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তও। বাজে শট খেলে বোল্ড হয়েছেন তিনি প্রথম বলেই। অনেক সময় প্রথম বলে আউট হয়ে গেলে আসলে বলার মতা কিছু থাকে না। তবে এই ম্যাচই তো শুধু নয়, ব্যর্থতা এই সংস্করণে এখন তার নিয়মিত সঙ্গী। তার সবশেষ ফিফটি ছিল গত বছরের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ৭৭ রানের সেই ইনিংসর পর টানা ১৩ ইনিংস আর ফিফটির ছোঁয়া পাননি তিনি। এর মধ্যে দুটি ইনিংস তিনি ব্যাট করেছেন চার নম্বরে, বাকিগুলোয় তিনে। এমন গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে ব্যাট করে এই সময়ে তার ব্যাটিং গড় ১৪.৯২, স্ট্রাইক রেট ৬৭.৫৯। ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম ৬ জনের ৩ জনেরই যদি থাকে এমন চিত্র, সেই দলের তো ম্যাচ জেতাই কঠিন। নজর দেওয়া যেতে পারে অন্যদের ওপরও। সামপ্রতিক সময়ে সবচেয়ে ধারাবাহিক বলা যায় তাওহিদ হৃদয়কে। সবশেষ ১১ ইনিংসে ৫টি ফিফটি করেছেন তিনি, আরেকটিতে অপরাজিত ছিলেন ৪৮ রানে। বাংলাদেশ দলের বাস্তবতায়, এমন একজনের দিকে আঙুল তোলার উপায় নেই। সমস্যা হলো, এই ৫ ফিফটির কোনোটিতেই ৬০ পর্যন্ত যেতে পারেননি তিনি। ৩ বার ফিরেছেন ৫১ রানে, এছাড়া আর ৫৫ ও ৫৬। কে না জানে, যে কোনো সংস্করণেই থিতু হওয়া ব্যাটারের কাছেই বড় ইনিংসের দাবি থাকে। হৃদয় তা পারছেন না। তার ফর্ম আছে, কিন্তু বড় ইনিংস নেই। তানজিদ হাসান গত সিরিজের প্রথম ম্যাচে করেছিলেন অপরাজিত ৬৭, শেষ ম্যাচে করেছিলেন ১০৭। এবারের সিরিজ শুরু করলেন বাজে শটে ২ রান করে। ৩২ ওয়ানডের ক্যারিয়ারে ১টি সেঞ্চুরি ও ৫টি ফিফটি করেছেন তিনি। স্ট্রাইক রেট বাংলাদেশের বাস্তবতায় দারুণ (১০১.৫১)। কিন্তু টানা দুই ম্যাচে ফিফটি ছুঁতে পারেননি একবারও। সাইফ হাসান মোটে ১০টি ওয়ানডে খেললেন। এখনও কোনো নির্দিষ্ট ধারায় তাকে ফেলা কঠিন।। তার টেকনিক ও ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে যদিও প্রশ্ন ও সংশয় আছে। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৮০ রানের ইনিংসের পর এবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফিফটি করেছেন। ইনিংসটি আরও বড় হওয়া উচিত ছিল ম্যাচের বাস্তবতায়। তবু আপাতত তাকে আলাদাই রাখা যায়। বিশেষজ্ঞ ব্যাটার না হলেও মেহেদী হাসান মিরাজের কাছেও রানের চাওয়া থাকে দলের। সবশেষ ১২ ইনিংসে বাংলাদেশ অধিনায়কের ফিফটি ১টি। ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে অনেক আলোচনা–সমালোচনার পর লোয়ার–মিডল অর্ডারে নেমে এসেছেন তিনি। ওপরের দিকে ব্যাটসম্যানদের বেশ কজন ভালো ফর্মে নেই বলে মিরাজের দায়িত্বটা বেশি ও ভূমিকা ভিন্ন। কিন্তু তিনি পারছেন কম সময়েই। সব মিলিয়েই ব্যাটিংয়ের চিত্র নাজুক। সবশেষ দুটি সিরিজ বাংলাদশ জিতেছে। কিউইদের বিপক্ষে এই সিরিজ জয়ের সুযোগও এখনও আছে। তবে তাতে আড়াল হচ্ছে না হবে হবে না ব্যাটিংয়ের বাস্তবতা।
ওয়ানডে ক্রিকেট যেভাবে বদলে যাচ্ছে, বিশ্ব ক্রিকেট যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই ব্যাটিং দিয়ে খুব একটা তাল মেলাতে পারার কথা নয় বাংলাদেশের। স্কোয়াডে বিকল্প আছেন সৌম্য সরকার ও মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন। নিজের সবশেষ সিরিজে দলের সর্বোচ্চ রান করার পরও সুযোগের অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করছেন সৌম্য। অঙ্কন এখনও মাঠে নামারই সুযোগ পাননি একবারও। সিরিজ চলার সময় এসব নিয়ে গভীর আলোচনায় যেতে চাইলেন না নতুন নির্বাচক কমিটির প্রধান হাবিবুল বাশার। তিনি শুধু শোনালেন তাদের দল নির্বাচনী নীতির কথা। ‘সিরিজের মাঝপথে এসব নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে একটা ব্যাপার বলতে পারি, দল ঘোষণার সময় যেমন বলেছিলাম, আমরা ধৈর্য রাখতে চাই, আপাতত অতীতে তাকাচ্ছি না। যাদের ওপর আস্থা রেখেছি, তাদেরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে চাই।’












