বন্দরে ঢোকার মুখে কর্ণফুলীর মোহনায় আটকে গেছে জাহাজ

জাহাজের স্টিয়ারিং বিকল, এসেছে চীন থেকে রয়েছেন ২৪ নাবিক ও ১২৮২ কন্টেনার পণ্য

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ৪ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ

স্টিয়ারিং বিকল হয়ে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় নিয়ন্ত্রণ হারায় কয়েক হাজার কোটি টাকার আমদানির পণ্যবোঝাই একটি বিদেশি কন্টেনার জাহাজ। নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় প্রায় ৪০ মিনিট ভেসে যাওয়ার পর জাহাজটি নেভাল একাডেমির পশ্চিম পাশে প্রথমে ২ নং লাল বয়ায় ধাক্কা দেয়। পরে রিটেইনিং ওয়ালে ধাক্কা দিয়ে অগভীর চরে আটকা পড়ে। এতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের প্রবেশপথে বড় ধরনের নৌ দুর্ঘটনার আশঙ্কা সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেয়েছে।

গতকাল সোমবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পরপর বন্দরের টাগবোট ও মেরিন বিভাগের পাইলটরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। ভাটার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে জাহাজটি সরানো সম্ভব না হওয়ায় জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। কোস্ট গার্ডের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, জাহাজটি বেশি শুকনায় উঠে গেছে। এটি এমনভাবে আটকে আছে যে, ভর জোয়ার আসার আগে কোনো ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব হবে না। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, জোয়ারের সময় পানি বাড়লে জাহাজটি ভেসে উঠবে এবং এটিকে নিরাপদে সরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে জাহাজটিতে কোনো ফাটল সৃষ্টি হয়েছে কি না তা তাৎক্ষণিকভাবে তিনি জানাতে পারেননি।

বন্দর সূত্র জানায়, মাল্টার পতাকাবাহী ১৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের ও সর্বোচ্চ ৯.৫০ মিটার ড্রাফটের জাহাজটিতে মোট ১ হাজার ২৮২ টিইইউএস আমদানি পণ্য রয়েছে। জাহাজটি চীনের শিকৌ বন্দর থেকে চট্টগ্রামে এসেছে। এটির স্থানীয় এজেন্সি এপিএল (বাংলাদেশ)। জাহাজটিতে মাস্টারসহ মোট ২৪ জন বিদেশি নাবিক রয়েছেন। আমদানিপণ্য বোঝাই কন্টেনারগুলো খালাসের জন্য জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালে (এনসিটি) ভেড়ার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। বহির্নোঙর থেকে কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলে প্রবেশের পরপর জাহাজটির স্টিয়ারিং ফেইল করে। এতে জাহাজটির উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন পাইলট। এরপর জাহাজটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোহনার দিকে ভেসে যেতে থাকে। প্রায় ৪০ মিনিট পর নেভাল একাডেমির পশ্চিম পাশে প্রথমে ২ নম্বর লাল বয়ায় ধাক্কা দেয়। পরে এক পাশের রিটেইনিং ওয়ালে গিয়ে আটকা পড়ে।

জাহাজে থাকা আমদানি পণ্যের আর্থিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। তবে দুর্ঘটনায় কন্টেনার বা পণ্যের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জাহাজে থাকা সব বিদেশি নাবিক নিরাপদে রয়েছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, জাহাজটির যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জাহাজের সব নাবিক নিরাপদে আছেন এবং বন্দর চ্যানেল স্বাভাবিক রয়েছে। বন্দরের মেরিন বিভাগের টিম টাগবোটসহ ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে। বর্তমানে ভাটা চলায় জাহাজ সরানো সম্ভব হচ্ছে না। পরবর্তী জোয়ারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, জাহাজটি যদি কর্ণফুলী নদীর মূল প্রবেশপথ বা নেভিগেশন চ্যানেলে আড়াআড়িভাবে আটকে যেত, তাহলে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেক্ষেত্রে দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হতো। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর জাহাজটি মূল চ্যানেল অতিক্রম করে মোহনার পাশে চরে আটকে পড়ায় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম জানান, দুর্ঘটনার পর বন্দরের টাগবোট কান্ডারী, কান্ডারী৪ ও কান্ডারী১১, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর টাগবোট হালদা, টানেল টাগবোট প্রমত্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে জাহাজটিকে পুনরায় ভাসানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সর্বোচ্চ উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, জাহাজটি একেবারে অগভীর চরে আটকা পড়েছে। ফলে টাগগুলো নিয়ে কাছাকাছি যাওয়া যাচ্ছে না। জাহাজটির কাছাকাছি যে টাগ যাবে সেটিও চরায় আটকে যাবে। তাই ভর জোয়ারের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। জোয়ার পূর্ণ হওয়ার পর একযোগে জাহাজটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। এতে মাঝরাত পার হয়ে যেতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকর্ণফুলীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সভা
পরবর্তী নিবন্ধসড়ক থেকে রান্নাঘর সর্বত্র গ্যাস সংকটের চাপ