বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে অনেক মানুষ মারা যান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সহজ নিরাপত্তা নির্দেশিকা ‘৩০–৩০ নিয়ম’ মেনে চললে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব। এ বছর এখন পর্যন্ত বজ্রপাতে ৭২ জন মারা গেছেন, যাদের বেশিরভাগই খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক। সর্বশেষ গত ২৬ এপ্রিল একদিনেই বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম (এসএসটিএফ)। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) পূর্বাভাস ব্যবস্থা উন্নত হলেও ঘন ঘন মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, মানুষ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নিলে আগাম সতর্কতা যথেষ্ট নয়।
বিএমডি স্টর্ম ওয়ার্নিং সেন্টারের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. মোহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, শুধু সতর্ক বার্তা শোনাই মূল কাজ নয়, বরং কী করতে হবে তা জানা প্রয়োজন। বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো ‘৩০–৩০ নিয়ম’।
এই নিয়ম দু’টি ধাপে কাজ করে : বজ্রপাতের আলো দেখামাত্র সেকেন্ড গণনা শুরু করতে হবে। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা গেলে বুঝতে হবে বজ্রঝড় একদম কাছে এবং বিপদ বয়ে আনছে। তখনই ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। ঘরে ঢোকার পর শেষ বজ্রধ্বনি শোনার অন্তত ৩০ মিনিট পর বাইরে যাওয়া উচিত। খবর বাসসের।
মল্লিক বলেন, প্রথম ৩০ সেকেন্ড আপনাকে জানায় বিপদ কতটা কাছে, আর পরের ৩০ মিনিট নিশ্চিত করে যে, ঝুঁকি কেটে গেছে। মানুষ নিয়মটি কঠোরভাবে মেনে চললে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব। দেশে অনেক মানুষ বজ্রপাতে মারা যাওয়ার কারণ হলো– বজ্রপাতের আলো দেখার পরও তারা অনেকক্ষণ বাইরে থেকে যান। অনেক সময় তারা মাঠ থেকে গবাদি পশু আনা, কৃষিকাজ করা বা বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার কারণে এ বিপদের সম্মুখীন হন।
গ্রামীণ এলাকায় বিশাল খোলা মাঠে থাকা কৃষকদের জন্য ঝুঁকি বেশি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বা ঝড়ের সময় মাঠ পার হওয়ার সময় বজ্রপাতে মারা গেছেন। এসব জায়গা বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় নিরাপদ নয়।
কর্তৃপক্ষ নিয়মটির পাশাপাশি একটি সহজ বার্তা প্রচার করছে : ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’। যখনই বজ্রধ্বনি শোনা যাবে, তখনই দৌড়ে ঘরে যেতে হবে। কারণ, ঘর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশে এটিকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর শত শত মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। ২০২০ সালে বজ্রপাতে ৪২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যু। ‘৩০–৩০ নিয়ম’ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা গ্রামীণ এলাকায় মৃত্যুহার কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তারা আরো বাস্তব পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে হাওর অঞ্চলের মতো উত্তর–পূর্বাঞ্চলের খোলা মাঠ এলাকায় বজ্রপাত–নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ। কেননা সেখানকার মানুষ অনেক ক্ষেত্রে যথাসময়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে পারে না।
জনগণকে সচেতন করতে রেডিও, টেলিভিশন এবং মাঠপর্যায়ের প্রচারণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মূলত মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব অভ্যাসে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে এই মাধ্যমগুলো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করা হয়। বিএমডির জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মল্লিক বলেন, বজ্রপাত থামানো যায় না, কিন্তু মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়। সচেতনতা ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপই একমাত্র পথ।
এদিকে, সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম (এসএসটিএফ) সমপ্রতি কৃষকদের বজ্রপাত–সম্পর্কিত মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে। সেগুলো হলো– খোলা আকাশের নিচে কাজ করার সময় কালো মেঘ দেখামাত্র নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, কোনো অবস্থাতেই বৃষ্টির সময় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং মাঠে কাজ করার সময় অবশ্যই জুতা ব্যবহার করা।












