প্রায় এক যুগ আগে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ৭ জুনের মধ্যে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন। তিনি বলেন, এই মামলার তদন্ত কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এই তথ্য দেন। ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫৮ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করার কথাও বলেছে প্রসিকিউশন। খবর বিডিনিউজের।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের তদন্ত কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সমাপ্ত হয়ে গেছে। চট্টগ্রামে আরও কিছু কাজ চলছে। আগামী ৭ জুনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আমরা প্রতিবেদন জমা দিতে পারব বলে আশা করছি। প্রতিবেদন জমার পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
মামলায় আসামি ৩০ জনের কম হবে না তুলে ধরে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে আমরা এখনই সব আসামির নাম প্রকাশ করছি না। ইতোমধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার আছেন।
এই ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, তিনি প্রধান আসামি হবেন। তিনি তো পরিকল্পনাই করেছেন। তার সংশ্লিষ্টতা আমরা পেয়েছি। এছাড়া তৎকালীন সরকারের অন্যান্য বাহিনী প্রধানদের সংশ্লিষ্টতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে তৎকালীন বাহিনীপ্রধান, পুলিশ কমিশনারসহ অনেকেই এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। যাদের যাদের সংশ্লিষ্টতা আছে, আমরা সবাইকেই নিয়ে আসব।
নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত : শাপলা চত্বরের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে শত শত বা হাজারো মানুষের নিহতের দাবির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তদন্তের সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, রাজনৈতিক ময়দানে বা সেমিনারে বলা আর আমাদের তদন্তের মধ্যে পার্থক্য আছে। তদন্তের বাইরে আমরা কিছুই বলতে পারব না। আমাদের তদন্তে এই পর্যন্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা মিলিয়ে মোট ৫৮ জনের নিহতের ঘটনা শনাক্ত করতে পেরেছি এবং তাদের পরিচয় পেয়েছি।
নিহতদের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, শাপলা চত্বরে বা ঢাকার মধ্যে ৩২ জন নিহত হয়েছেন। পরের দিন নারায়ণগঞ্জে আরও প্রায় ২০ জনের মতো নিহত হন। একই দিন চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লাতে একজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমাদের তদন্ত কর্মকর্তাদের কথাবার্তা হয়েছে এবং আইডেন্টিফিকেশন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ৫ মে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে হেফাজতের অবস্থান কর্মসূচি ছিল। পরে তারা শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি পায়। কিন্তু তারা যখন গুলিস্তানে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে আসে, তখন হামলা ও নিহতের ঘটনা ঘটে। সব উপেক্ষা করে তারা সন্ধ্যায় শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। ২টা ৩০ মিনিটের (মধ্যরাত) আগেই প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন হতাহত হন। এরপর মধ্যরাতে ওই সমাবেশের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হলে আরও হতাহতের ঘটনা ঘটে, যোগ করেন তিনি।
এই ঘটনাকে সিস্টেমেটিক ও ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক এবং টার্গেটেড কিলিং দাবি করে আমিনুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল, এই ইসলামিক সংগঠনটিকে একেবারেই নিধন করে দেওয়া। তাদেরকে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে খুন করতে হবে–এটা সবটাই সিস্টেমেটিক, ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক এবং টার্গেটেড কিলিং।
এই হত্যাকাণ্ডের পর হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠক এবং কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়ে তাকে কওমি জননী উপাধি দেওয়ার মতো রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়গুলো তদন্তে প্রভাব ফেলবে কি না? জবাবে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, তাদের সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক কার্যক্রম একরকম, আর আমাদের বিচারের পরিধি আলাদা। হত্যাকাণ্ডের পরের ওই রাজনৈতিক ঘটনাগুলো সঙ্গত কারণেই আমাদের তদন্তে আসবে না, আসা উচিতও না।













