সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর পর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডটিতে কোনো ধরনের কার্যক্রম চালানো যাবে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি)। বিএসআরবির মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডটির কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। শুক্রবার রাতে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে গতকাল শনিবার সকালে দুর্ঘটনাকবলিত ইয়ার্ড পরিদর্শন করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান জানিয়েছেন, জাহাজটির ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রাথমিক পরীক্ষায় স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত এই বিষাক্ত গ্যাস পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষক্রিয়ায় শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
শিল্প সচিব বলেন, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের যারা এখানে আছেন তারা দেখেছেন হাইড্রোজেন সালফাইড এখানে আছে। সেটা কীভাবে রিমুভ করা যায় সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে। দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে জাহাজের ভেতরে থাকা বিষাক্ত গ্যাস নিরাপদে অপসারণ করা। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে গ্যাস অপসারণের কাজ করা হবে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমাদের ধারণা, দুর্ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা। সমন্বিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাহাজের ভেতর থেকে গ্যাস অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। হাইড্রোজেন সালফাইড পানিতে দ্রবীভূত হয় বিধায় পানি দিয়ে জাহাজের ভেতরের অংশ ধুয়ে গ্যাস অপসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একসঙ্গে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হয়েছে ৯ সদস্যের কমিটি। বিএসআরবির পক্ষ থেকেও ৫ সদস্যের পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে শিল্প সচিবের কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিগুলো শুধু দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করবে না, দুর্ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, কারো অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না, শ্রমিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা পিপিই ছিল কি না, ইয়ার্ডে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা ও জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি না, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা বা অদক্ষতা ছিল কি না, এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখবে। কারো অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিল্প সচিব।
শিল্প সচিব বলেন, এটি কমপ্লায়েন্স ইয়ার্ড। ইন্টারন্যাশনালি তাদের যা যা কমপ্লায়েন্স করতে হয় সেটা তারা করেছিল। তাদের সেফটি অডিটও করতে হয়, করেছিল। এর পরও গতকালের দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, একটি কমপ্লায়েন্স ইয়ার্ড এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স, সেফটি অডিট ও সিকিউরিটি অডিট করা হয়েছিল। এরপরও কীভাবে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটল, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয়। কেন ঘটনাটা ঘটল তা আমরা খতিয়ে দেখছি। যদি এখানে কারো কোনো অবহেলা থেকে থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভবিষ্যতে যেন এ রকম ঘটনা না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
শিপ রিসাইক্লিং খাতকে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় হিসেবে উল্লেখ করে শিল্প সচিব বলেন, সরকার এ খাতকে আরো নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক করতে কাজ করছে। সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে শিপ রিসাইক্লিং খাত নিয়ে বৈঠক হয়েছে। গ্রিন শিপইয়ার্ড গড়ে তোলা, খাতটির প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়েও সেখানে আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে গ্রিন শিপইয়ার্ড নির্মাণের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তে বেরিয়ে আসার পর দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যাতে একই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় শিল্প সচিবের সাথে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান, বিএসআরবির সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে পুরনো একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে ৩৪ জন শ্রমিক–কর্মচারী কাজ করছিলেন। জাহাজের একটি বদ্ধ অংশে থাকা দুই শ্রমিক হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়লে তাদের উদ্ধারে অন্য শ্রমিকেরা সেখানে প্রবেশ করেন। পরে তারাও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। এতে ৯ জনের মৃত্যু হয়। আরো কয়েকজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের দুই ভাই মনসুর আহমেদ ও নাসির উদ্দিন রয়েছেন।
ঘটনার পর থেকে প্রশ্ন উঠেছে, জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস থাকার বিষয়টি আগে শনাক্ত করা হয়েছিল কি না এবং গ্যাসমুক্ত না করে সেখানে শ্রমিকদের প্রবেশ ও কাটিংয়ের কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল কি না। শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই জাহাজ কাটার কাজ চলছিল।












