একুশে পদকপ্রাপ্ত দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেছেন, প্রযুক্তি প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে। সামনে আরো উন্নত হবে, আরো আধুনিক হবে। কিন্তু একটি জিনিস কখনো বদলাবে না। তখনো একজন রোগী সব সময় একজন সহানুভূতিশীল চিকিৎসকই খুঁজবেন। কারণ যন্ত্র রোগ নির্ণয় করতে পারে, কিন্তু স্নেহ, সাহচর্য, ভালোবাসা দিতে পারে না। এখানেই মানুষের শক্তি। চিকিৎসাসেবার সাথে জড়িত সকলের শক্তি। তাই প্রতিটি রোগী হোক আপনাদের কাছে একেকটি নতুন বই। বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা থাকে। কিন্তু মনে রাখবেন, মানুষের শেখার শেষ পৃষ্ঠা নেই।
চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের (সিএলএফ) উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম লায়ন্স আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে জুলাই ২৬ সেশনের ডিপ্লোমা ইন অফথ্যালমোলজি কোর্সের ইনডাকশন প্রোগ্রাম গতকাল মঙ্গলবার সিএলএফ কমপ্লেক্সের লায়ন ইঞ্জিনিয়ার এম আই খান ভবনের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সিএলএফের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ মালেক বলেন, আধুনিক সুযোগ–সুবিধা সম্বলিত ও মানসম্মত চক্ষু চিকিৎসাসেবা প্রদানে দক্ষ চিকিৎসক গঠনের লক্ষ্যে মূলত সিএলএফ এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এখানে চক্ষু চিকিৎসার বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি দক্ষ এবং মানবিক চিকিৎসক গড়ে তোলাও অন্যতম লক্ষ্য।
চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লায়ন কামরুন মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আজাদী সম্পাদক বলেন, বাংলায় একটা কথা আছে, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝি না। অপরদিকে চোখের মূল্য বুঝি তখনই, যখন চোখ আমাদের আর আগের মতো সঙ্গ দেয় না। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ আছেন, যাদের দৃষ্টিহীনতার একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে তারা আবার দেখতে পাবেন। তাই আপনাদের সামনে দীর্ঘ পথ। আমি বিশ্বাস রাখি, আপনারা নিজেরা আলোকিত হতে সক্ষম হবেন। সেই আলো দিয়ে দৃষ্টিহীন মানুষকে তার পৃথিবী ফিরিয়ে দিতে পারবেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এম এ মালেক বলেন, আপনারা এমন এক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন, যেখানে মানুষের চোখের রোগ সারানোর পাশাপাশি দৃষ্টির অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে। আপনারা অন্ধকারের বুকে আলোর আলপনা আঁকতে যাচ্ছেন। এ যাত্রাপথের শুরুতে আমি আপনাদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। মনে রাখবেন, আজকের দিনটি শুধু একটি অনুষ্ঠানের দিন নয়। এটি একটি দায়িত্ব গ্রহণেরও দিন। এমন একটি দায়িত্ব যাতে কোনো না কোনো মানুষের জীবন আবার আলোয় ভরে উঠবে। আপনারা যে পথ বেছে নিয়েছেন সেখানে জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনো পদক নয়। সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো কোনো একজন মানুষের মনে আপনার অজান্তেই আপনার জন্য শুভ কামনা উচ্চারিত হওয়া।
তিনি বলেন, আপনারা আজ থেকে যে পথে যাত্রা শুরু করছেন, সেখানে দুটি জিনিস কখনো আলাদা করবেন না, নলেজ এবং কাইন্ডনেস। জ্ঞান আপনাকে দক্ষ করবে, দয়া আপনাকে স্মরণীয় করে রাখবে। একজন চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে কী কী লিখলেন, কিছুদিন পরেই হয়তো একজন রোগী তা ভুলে যান। কিন্তু তিনি ভুলবেন না ওই চিকিৎসক তার সাথে কেমন ব্যবহার করেছিলেন। তাকে কতটুকু সম্মান দিয়েছিলেন।
আজাদী সম্পাদক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লায়ন্স ক্লাবের সাথে সংযুক্ত থেকে আমি একটি জিনিস বুঝি, আমরা যখন সমাজের সমস্যার কথা বলি, তখন অনেকেই কেবল সমস্যাগুলো দেখি। কিন্তু লায়ন্স ক্লাব দেখে সমাধান। আমরা দারিদ্র্য দেখি, আমরা শিক্ষা সংকট দেখি, আমরা অন্ধত্ব দেখি, আমরা দুর্যোগ দেখি; কিন্তু আমরা এখানেই থেমে থাকি না। লায়ন্স ক্লাবের সদস্য হিসাবে আমরা এগিয়ে আসি, হাত বাড়াই, পরিবর্তন আনতে কাজ করি। আপনাদেরকেও এই পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে লায়ন কামরুন মালেক বলেন, চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত হয় লায়ন্স আই হসপিটাল। প্রতিদিন শত শত রোগী নামমাত্র খরচে এখানে চিকিৎসা নেন। ১৯৯২ সাল থেকে চট্টগ্রামে লায়ন্স আই হাসপাতালে আমরা চোখের ছানি অপারেশন শুরু করি। এরপর হাজার হাজার মানুষ সেখানে চোখের ছানি অপারেশন করিয়েছেন। এটা দেখে অনেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও চক্ষুশিবির আয়োজন করতে থাকে। এই উদ্যোগেও আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করে আসছি। লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালকে এতদঞ্চলের মানুষের আস্থা ও ভরসার জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে সিএলএফ কাজ করছে।
তিনি বলেন, আমরা পৃথিবীতে আসি দুটি চোখ নিয়ে। কিন্তু পৃথিবীকে দেখতে শিখি আরো অনেক চোখ দিয়ে। কখনো মায়ের চোখ, কখনো শিক্ষকের, কখনো ভালোবাসার। তাই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু তার চোখ নয়, তার দেখার ক্ষমতা, তার দৃষ্টিশক্তি। চোখ একটি অঙ্গ, দৃষ্টি একটি অভিজ্ঞতা।
কামরুন মালেক বলেন, একদিন হয়তো আপনাদের কাছে কোনো বৃদ্ধ আসবেন, যিনি নাতির মুখ দেখতে চান। একটি শিশু আসবে, যে প্রথমবার স্পষ্ট করে ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা পড়তে চায়। একজন মা আসবেন, যিনি সন্তানের মুখ ঝাপসা নয়, পরিষ্কার দেখতে চান। সেদিন এগুলো যেন শুধু রোগীর গল্প না হয়। এগুলোকে হতে হবে নিজেদের পৃথিবীকে আবার তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প। আপনাদের সেবায় তাদের চোখের অন্ধকার কেটে যাবে, পৃথিবীর সব রং তাদের চোখে ধরা দেবে–এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সকল লায়ন সদস্যের একমাত্র চাওয়া। আমি আশা করি আপনারা আপনাদের সর্বোচ্চটা দিয়েই আমাদের এই প্রত্যাশা পূরণ করবেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি লায়ন ডা. দেবাশীষ দত্ত, ট্রেজারার লায়ন এস জোহা চৌধুরী, এসোসিয়েট সেক্রেটারি লায়ন এস এম আশরাফুল আলম আরজু, চট্টগ্রাম লায়ন্স আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক ডা. মো. মহিউদ্দিন, একাডেমিক ডিরেক্টর প্রফেসর ডা. প্রকাশ কুমার চৌধুরী এবং প্রফেসর ডা. এম এ রাকিব।
অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন হাসপাতালের উপ–পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শাবানা সুলতানা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. অনিন্দিতা চৌধুরী। অনুষ্ঠানে হাসপাতালের চিকিৎসকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন জুলাই ২০২৬ সেশনে চট্টগ্রাম লায়ন্স আই ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইন অফথ্যালমোলজি কোর্সের ৩য় ব্যাচে ৪ জন শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়েছেন।










