এ বছরের বিশ্ব প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হল “দীর্ঘায়ুর যুগ; দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোর পুনর্চিন্তা”। সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণার একটি তথ্য গোটা বিশ্বকে চমকে দিল। বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস সেন্সাস ব্যুরোর এক প্রতিবেদনে তা উঠে এসেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে, জন্মহার কমে যাওয়া এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষ আগের তুলনায় কম সন্তান নেওয়া, দেরিতে বিয়ে, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, সন্তান পালনের বাড়তি খরচ এবং পরিবার পরিকল্পনার সুযোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে জন্মহার কমছে। একই সময়ে উন্নত চিকিৎসা, পুষ্টি, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির কারণে মানুষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকছেন। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উন্নত বিশ্বে সীমাবদ্ধ নেই, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দ্রুত হারে বাড়ছে প্রবীণদের সংখ্যা। জাপানে জনসংখ্যা কমতে শুরু করে ২০০৮ সালে আর রাশিয়ায় শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। অতি সম্প্রতি জাপানে ১০০ বছরের বেশি বয়সী জনসংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
জ্ঞান–বিজ্ঞান ও চিকিৎসার উন্নতির সাথে সাথে মানুষের জীবনাচরণ পরিবর্তনের ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েই চলছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল বাংলাদেশে বর্তমান গড় আয়ু ৭২+। বাংলাদেশে প্রবীণ জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার ৬+ শতাংশের উপরে। দেশে যৌথ পরিবারের সংখ্যা যেমন হ্রাস পাচ্ছে, তেমনি বাড়ছে একক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবারের সংখ্যা।
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মহাবিশ্বের সকল জীব, জীবনের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয়। এই কঠিন সময়ে তারা শারীরিকভাবে দুর্বল ও অক্ষম হয়ে পড়েন। দেশে দেশে প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করে ১৯৯০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তা হলো ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর থেকে সারা বিশ্বে প্রবীণ দিবস উদযাপিত হবে। এই সিদ্ধান্তে দেশে দেশে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়াও বিশ্বব্যাপী প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতি ও সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্ব পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এতে করে বিশ্বব্যাপী প্রবীণদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন নিশ্চিত করতে সচেতন হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে র্যাালি, আলোচনা সভা ও সুস্বাদু খাবার বিতরণের মধ্যেই এ দিবস উদযাপন সীমাবদ্ধ। বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের প্রবীণগণ ন্যায্য অধিকার ও সম্মান থেকে বঞ্চিত। জাতিসংঘ নীতিমালা অনুযায়ী ৬০ ঊর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রবীণ বলে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশেও ৬০ বছর বয়সীদের জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিধান আছে। প্রবীণ নাগরিক আইন ২০১৩, মাতা–পিতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩, বয়স্ক ভাতার প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশের প্রবীণদের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে–এটা বলা যাবে না। এখানে আইন আছে, তার প্রয়োগ নেই। বয়স্ক ভাতাও সর্বজনীন নয়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল ফান্ড বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৪৭ সাল নাগাদ বাংলাদেশ জাপানের মতো প্রবীণ সমাজে রূপান্তরিত হবে। বাস্তবতা হলো, দেশের প্রায় শতভাগ প্রবীণ পরিবারের সাথে বসবাস করে থাকেন। নানাবিধ কারণে সকল প্রবীণদের প্রবীণ নিবাসে বাস করার সুযোগ ও সামর্থ্য নেই।
এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সকল প্রবীণদের জন্য পাড়ায় পাড়ায় ‘প্রবীণ ক্লাব’ গড়ে তোলা জরুরি। যেখানে অবসর সময়ে প্রবীণগণ নিজেদের মধ্যে মতবিনিময়, আড্ডা, খেলাধুলা, গান শোনা, বই পড়া, টিভি দেখে মগ্ন থাকতে পারেন। প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ও চলাচলসহ সকল নাগরিক সেবার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ সহযোগী সংগঠনসমূহের সমন্বয় করে বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য পৃথক ডাটাবেজ, আইডি কার্ড, প্রায়োরিটি কার্ড প্রবর্তন করা বাঞ্ছনীয়।
প্রতি ওয়ার্ডে পাড়া–মহল্লায় বয়স্কদের বিনোদনের জন্য পার্ক, অডিটোরিয়াম, পাঠাগার, ব্যায়ামাগারসহ অভ্যন্তরীণ খেলাধুলার ব্যবস্থা করা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের কারিকুলামে প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সম্মানসূচক আচরণের শিক্ষা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গণমাধ্যমে প্রবীণবান্ধব সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করার বিকল্প নেই।
উদাহরণত, প্রবীণ নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রাম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পেরেন্টস লাউঞ্জের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। প্রবীণবান্ধব এই ক্লাবে অভ্যন্তরীণ খেলা, ব্যায়াম, পাঠাগার, টিভি দেখা এবং হালকা চিকিৎসা সুবিধা ইত্যাদি বিদ্যমান। সন্ধ্যায় প্রবীণগণ ছুটে এসে আনন্দ উপভোগ করেন। মতবিনিময় করে মুগ্ধতা নিয়ে যার যার বাড়ি ফিরে যান। তাই দেশের প্রতিটি পাড়া–মহল্লায় বয়স্কদের জন্য গড়ে উঠুক প্রবীণ ক্লাব। বিশ্ব প্রবীণ দিবসে এই অঙ্গীকার হোক। দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণদের জন্য নতুন করে টেকসই ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, পরিবেশবিষয়ক গবেষক।











