১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস। আমাদের দেশেও দিবসটি যথারীতি পালিত হয়। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় সরকার কিংবা কোনো নাগরিক তাদের সিনিয়রিটির মর্যাদা দেয় না। যেমন–ঢাকার মেট্রোরেলের প্রতিদিনের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে এক প্রবীণ যাত্রী বলেন–দেখা যায় অধিকাংশ তরুণ তরুণী সিটে বসে মোবাইল স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে আছে। তাদের ঠিক সামনেই লাঠিতে ভর দিয়ে কিংবা সিট ধরার হাতলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন এক বৃদ্ধ মানুষ। অনেকে আবার বয়স্কদের দেখেও না দেখার ভান করে চোখ বুঝে ঘুমের অভিনয় করে। এই ব্যবহার প্রবীণদের খুবই হতাশ করে। কিন্তু বহিঃবিশ্বে এমনটা পাবেন না। এই অঞ্চলে প্রবীণরা খুবই অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত। তরুণদের বুঝা উচিত ঝাঁকুনি সামলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের শরীরে কুলাবে না। একজন বয়স্ক মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজ থেকে সিট ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একজন মানুষের আসল শিক্ষা ও পরিবারিক মূল্যবোধ। এগুলি আইন দিয়ে হয় না। মনে রাখতে হবে মোট জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ প্রবীণ। এ পরিস্থিতিতে প্রবীণ মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বিবেচনা করে সরকারকে অর্থনৈতিক নীতি, আবাসন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। দেখা যায় বিশ্ব জনসংখ্যার কাঠামোতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেশি। এটার কারণ বিভিন্ন দেশে জন্মহার কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে। আমাদের দেশে আয়তনের তুলনায় জন্মহার আশানুরূপ কমেনি। এটা যুক্তরাজ্যের সেনাসাসের প্রতিবেদন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ উন্নতি। স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির ফল। আবার এর মধ্যে রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের কয়েকটা দেশ জন্মহার কমানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাই প্রবীণদের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী দারুণভাবে বেড়েছে। জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা এখন ১ লাখ ছাড়িয়েছে। কারণ তারা নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করেও তাদের খাদ্যে থাকে ভাত, সবজি এবং মাছ। বয়স্ক লোকের ৮৮% নারী। এবার আমাদের দেশের প্রবীণদের বর্তমান অবস্থার কথা বলি–২০১৩ সালে সরকার প্রবীণ–নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল। প্রণয়নের এক যুগ পার হলেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। নতুন গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর যে বিশাল বাজেট পেশ করলো। যেখানে প্রবীণ গোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা, অধিকার ও জীবন মান উন্নয়নের জন্য কোন বরাদ্দ বা পরিকল্পনা রাখেনি। তাদের মনে রাখা উচিত প্রবীণরা জনগোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেকেই জ্ঞাত আছেন কিনা জানিনা ৬০ লক্ষ (এখন কত জানি না) প্রবীণ মাসে ৬৫০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পান। এই দুর্মূল্যের দিনে এই পরিমাণ ভাতা হাস্যকর বটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যানুসারে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৯২% হবেন প্রবীণ। ২০৫০ সালে সেটা দাঁড়াবে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লক্ষ। এই জন্য সরকারের কোন প্রস্তুতি আছে কিনা জানা নেই। বাংলাদেশে এই ৫৪ বছরে কোন সরকার প্রবীণদের জন্য সেটা সরকারি বা বেসরকারি হোক নির্ধারিত কোন সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারেনি। দিবসটি আসলে শুধু নড়ে চড়ে বসে। গণমাধ্যমে মিডিয়াতে প্রবীণদের জন্য প্রোগ্রাম থাকা খুবই জরুরি। তাতে সর্বস্তরের নাগরিক সচেতন হবে। ছোট বড় সবার মনে শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠবে। বৃদ্ধদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আত্মসচেতনতার অংশ এটা আত্মউপলব্ধির ব্যাপার। এই শ্রদ্ধাবোধ কারো উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটা ভেতর থেকে আসতে হয়। মনে রাখতে হবে প্রবীণরা পরিবারের ও সমাজের বোঝা নয় সম্পদ। প্রতিটা পরিবারে রয়েছে প্রবীণদের অমূল্য অবদান। তাদের প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও কর্মময়তা সব সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক। বার্ধক্য জীবন অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক। তাদের সারাজীবনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই সমাজ নির্মিত হয়েছে। তাই তারা শেষ বয়সে একটু সহানুভূতি চায়। প্রবীণরাই পথপ্রদর্শক। জানবেন অতীত না থাকলে বর্তমান সুন্দর হয় না। প্রাচীন না হলে আধুনিক হওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রবীণ বয়সে যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় তা হলো একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা। তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও তাদের খোঁজ খবর রাখুন। বর্তমান বিদেশে যাওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। তাই ছেলেমেয়ে বিদেশে পাঠিয়ে সব মা–বাবারা এখন খুবই একাকিত্ব জীবন যাপন করছে। সারা দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং কিছু উচ্চ মধ্যবিত্ত তাদের মা–বাবারা সেখানে যাচ্ছে। সেখানে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের পাঠানো হয়। সেখানে বৃদ্ধরা জানালা দিয়ে দূরপানে চেয়ে থাকে কখন ছেলে দেখা করতে আসবে। কখন নাতি নাতনীদের দেখতে পাবো। মিডিয়াতে দেখা যায় ছেলে বউ নিয়ে শহরের বাসায় থাকে মা–বাবা একটু দেখা করতে আসলে খুবই অবহেলার চোখে দেখে। বহু পরিবারে দেখা যায় বৃদ্ধা মা খুব ভোরে উঠে নামাজ–কালাম পড়ে রান্নাঘরে যায়। আসবাবপত্র দেখে অথচ সেই মায়েদের পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা নেই। তারা খুবই অবহেলিত। বিশ্বের উন্নত এবং সম্পদশালী দেশ জাপান কিন্তু সে দেশের প্রবীণদের চেয়ে আমাদের দেশের প্রবীণরা অনেক ভালো আছে। জাপানে অবিবাহিত লোকের সংখ্যা বেশি। শেষ বয়সে তারা একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে যায় সেবা শুশ্রূষা বঞ্চিত, রোগে জর্জরিত, অনাহারে কঙ্কাল হয়ে ঘরের এক কোনে মাসের পর মাস মরে পড়ে থাকে। পচা দুর্গন্ধ বাহির হয়। সম্মানের সাথে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে বলতে চাই আপনাদের সঞ্চয় শেষ অবধি হাতছাড়া করবে না। তবেই এই বয়সেও আত্মমর্যাদা নিয়ে পরিবারে সমাজে বাস করতে পারবেন। যানবাহনে, অফিস আদালতে, মজলিশে, উৎসবে পেনশন তুলতে গেলে প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন। যদি অতদিন বেঁচে থাকেন তবে আপনিও বুড়ো হবেন এটা প্রকৃতির চিরন্তন রূপ। সরকারের প্রতি আহ্বান প্রবীণদের জন্য একটা মন্ত্রণালয় গঠন করা হোক। প্রবীণদের সুযোগ–সুবিধা প্রদান কারো করুণা নয়, এটা তাদের মৌলিক অধিকার।
লেখক : প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট,
বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।












