প্রবাহ

শিশুকালে পিতার শাসন : একালে অনুকরণীয়

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ১৫ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

শিশুকালে পিতা তথা আব্বা আমরা সন্তানদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। আমরা যাতে বড় হয়ে বিলাসী না হই মনে হয় এতে আব্বার ভিতর কাজ করছিল। আব্বা ইন্তেকাল করেছেন, কিন্তু আমরা সন্তানেরা ছোটকালে পিতার শাসনে নিয়ন্ত্রণের সুফল ভোগ করছি। যা একালে ধনী পরিবার তো বটেই মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে অনুকরণীয়, অনুসরণীয়, শিক্ষণীয় বলে মনে করি।

আব্বা ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব আমিরুল হজ্ব খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী। প্রখ্যাত জমিদার হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত আলোচিত ব্যক্তিত্ব। এতদাঞ্চলে খান বাহাদুর হিসেবে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব।

বাঁশখালী জমিদার বাড়ী হিসেবে মনে হয় না কোন কিছুর কমতি ছিল। রান্না ঘরে ৮/১০ জন কাজের মেয়ে, ১০/১২ জন কাজের লোক, /৭ জন মুন্সি কেরানী, ঘোড়া গরুর তদারককারী, পালকি বহন করা লোক; সাম্পানের মাঝি, কাঠমিস্ত্রিসহ সহযোগী, রাজমিস্ত্রি, (দালান নির্মাণের মিস্ত্রি), মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, আমরা সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষক, প্রাইমারী স্কুলের, হাই স্কুলের শিক্ষক মিলে ৪০/৫০ জনের রান্না হতো দৈনন্দিন। দক্ষিণ বাঁশখালী ও বৃহত্তর চকরিয়া থেকে জমিদারগণ নিয়মিত আসতেন পরামর্শের জন্য, অবস্থান করতেন। আনোয়ারা, সাতকানিয়া, কালীপুর, গুনাগরী থেকে নারী পুরুষ আত্মীয় নিয়মিত আসতেন থাকতেন। এ যেন বাড়ীতে প্রতিদিন ছোট খাট খাবারের আয়োজন। সে লক্ষে পুকুরের মাছ, বাড়ীর পেছনে রাখা মুরগি, বাড়ির নিকটে কয়েকটি গাভি পেকুয়া উজানটিয়া থেকে ছাগল, মাছ, দধি নিয়মিত আনা হত। অর্থাৎ উন্নতমানের খাবার আয়োজনের কোন কমতি ছিল না।

কিন্তু আমরা সন্তাননাতীদের দুপুর রাতের খাবার খেতে হত আব্বার সাথে কাছারী ঘরে। ১০/১২ আসন বিশিষ্ট ডাইনিং টেবিলে থাকত বড় বাটি করে উজানটিয়া রাজাখালী চাষের লাল চাল এর ভাত। বড় বড় বাটি করে ২/৩ প্রকারের সবজি। মাছ অথবা গোশত যে কোন এক আইটেম নিকটে তাকের উপর রাখা হত। তিন ভাগের এক ভাগ খাবার খাওয়া হয়ে গেলে কাজের লোকেরা মাছ /গোশতের বাটি হাতে নিয়ে মাছ বা মুরগি এক পিস সাথে দুচামচ ঝোল দিত। আমরা সন্তাননাতীরা দুপুর রাত্রে খাবারের সময় আব্বার সাথে বসব, সাথে ধর্মীয় শিক্ষক, হাইস্কুল ও প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। তারা কাছারী ঘরে থাকবে, খাবে। সকালে ও বিকেলের নাস্তা হবে ঘরে বানানো উজানটিয়া রাজাখালী থেকে আনা ধান ভাঙা চালের।

আমাদেরকে দৈনন্দিন সময় মেনে চলতে হবে। শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে চলে যেতে হবে মসজিদে। ফজরের নামাজের পর ধর্মীয় শিক্ষক থেকে কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত ও ধর্মীয় শিক্ষা। অতঃপর ঘরে বানানো চাউলের নাস্তা। এরপর কাছারী ঘরে স্কুলের শিক্ষকের নিকট লেখাপড়া করা, গোসল করা, ঘড়ির কাটায় ঠিক ১০ টার পর আব্বার সাথে ভাত খাওয়া। অতঃপর স্কুলে চলে যাওয়া। দুপুরের ছুটিতে ক্ষুধা লাগলে ভাত বা চালের নাস্তা, যোহরের নামাজ পড়া, বিকেলে চালের নাস্তা। মসজিদে আসরের নামাজের পর পর স্কুল মাঠে মাগরিবের আজান পর্যন্ত খেলাধুলা।

আজানের সাথে সাথে মসজিদে এসে মাগরিবের জামাত পড়া, অতঃপর কাছারী ঘরে অবস্থান করা শিক্ষক থেকে লেখাপড়া করা, এশারের জামাতের পর পর আব্বাজানের সাথে কাছারী ঘরে রাতের খাবার খাওয়া। দুপুর এর মত রাতের খাবারে একই নিয়ম অর্থাৎ টেবিলে লাল চালের ভাতসহ ২/৩ প্রকারের সবজি থাকবে। মাছ বা গোশত কোন প্রকার দুপুরের নিয়মে এক পিস করে দিয়ে দিবে। ভাত খাওয়ার পর পর আন্দর বাড়ীতে চলে যেতে হবে। এখানে দুধ যে যত পারে খাবে। অতঃপর ঘুমাতে যাওয়া। অনেকটা রাত ৯ টার পরপর ঘুমিয়ে যাওয়া হয়।

কর্ণফুলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। কেরোসিন তেল দিলে ল্যাম্প এর মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা, রান্না ঘরে কেরোসিন তেল দিয়ে বুম্বা, কোন অনুষ্ঠানে আলো বাড়ানোর জন্য মেন্থল লাইট।

কাছারী ঘরের এক কক্ষে; হল কাম গেস্ট রুমে (বাংলো) বৃহৎ আকৃতির রোমান অক্ষরে দেওয়াল ঘড়ি। রাত যত গভীর হয় এই ঘড়ির ঘন্টার ধ্বনি শুনা যায় দূরত্বে। কতক্ষণ ঘুমানো যায় শেষ রাতে অনায়াসে উঠে যাওয়া হয় এবং আব্বার সাথে সকলে মসজিদে যেতে হয় ।

বছরে ১/২ বার শহর থেকে কাপড়ের থান নিয়ে আসবে পায়জামা শার্ট সেলাই করে দিবে। স্কুলের বই পুস্তক খাতা কলম লাগলে পারিবারিক শিক্ষকের সুপারিশক্রমে শহর থেকে এনে দিবে।

নিজের কাপড় নিজেকে ধুয়ে দিতে হবে। কাজের মহিলারা মাড় রেডি করে দিবে। আমরা নিজেদের কাপড় নিজেদের মাড় নিতে হবে। শুকিয়ে গেলে কাজের লোকেরা বাজারে নিয়ে গিয়ে লন্ড্রি থেকে ইস্ত্রি করে নিয়ে আসবে। আমরা বাজারে যেতে পারব না, গেলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় নতুন কাপড় কিনে দেয়া আব্বার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। শার্ট পায়জামা ধুয়ে মাড় দিয়ে শুকালে কাজের লোকেরা ইস্ত্রি করে এনে দিবে। আব্বার যৌক্তিকতা হল যারা গরীব, কাপড় নেই, তারা নতুন কাপড় কিনবে বা সেলাই করবে।

বছরে ৩ বার পরীক্ষা। ১ম, ২য় সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষা। ১ম ও ২য় সাময়িক পরীক্ষার পর কয়েক দিনের জন্য স্কুল বন্ধ দেয়া হয়। তখন আমরা সন্তান নাতিদেরকে ডেকে আদর সোহাগের মাধ্যমে জানিয়ে দিবে স্কুল বন্ধকালীন কয়েক দিনের জন্য আমরা সাতকানিয়া মির্জাখীল বেড়াতে যাব। আমাদের বড় ভাতিজি দিল আরা বেগম (বর্তমানে মরহুম) এর বিয়ে হয় ১৯৫৮ সালে। মির্জাখীল চৌধুরী বাড়ী বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুস সবুর চৌধুরীর সাথে। আমরা সন্তান নাতি কয়েকজনে মিলে যাব কালীপুরঢেউদিঘী পাহাড়ী রাস্তায় পায়ে হেঁটে প্রায় ১৩/১৪ কি.মি এ রাস্তা অতিক্রম করা হবে সকাল ৭ টার দিকে রওনা দিয়ে। আমাদের নিরাপত্তার জন্য ন্যূনতম অভিজ্ঞ ২ জন কাজের লোক থাকবে। পাহাড়ের ভিতর রাস্তার ধারে ধারে রয়েছে খোলা রেস্টুরেন্ট এতে খাজা, মোলা, বিস্কুট, মুড়ি নিয়ে আসত পাহাড়ি এলাকার লোক নিজের বাড়ি থেকে সকালে। মাটির চুলায় গরুর দুধ দিয়ে ১ কাপ চা ১ আনা, তাদের ঘরের বানানো চিনির সিরা দিয়ে নিমকি হলে এক আনা, খাজা ২ আনা, কলসি করে নিয়ে আসা পাহাড়ের ঝর্ণার পানি, এ রকম ২/৩ বার করে বিশ্রাম নিয়ে বেলা ১১ টার আগে পরে আমাদের অতি আপন দিলু ভাতিজির শ্বশুর বাড়ি পৌঁছতাম। এখানে স্বাধীনভাবে উৎসবমুখর আনন্দঘন পরিবেশে ৩/৪ রাত বেড়ানো শেষে আমরা একই নিয়মে পায়ে হেঁটে বাঁশখালী বৈলছড়ী গ্রামের বাড়ি চলে আসতাম। এসে আব্বার কঠোর নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ হয়ে যেতাম।

বছরের শেষে শীতকালে বার্ষিক পরীক্ষার পর প্রায় সপ্তাহখানেকের জন্য স্কুল বন্ধ হত। তখন আমরা বেড়ানোর জন্য শহরে আসতে পারতাম। দুপুরে ভাত খাওয়ার ঘণ্টা খানেক পর আব্বা পালকিতে আমরা ঘোড়ার পিঠে করে ২ কি.মি দূরত্বে মানিক পাঠান সাম্পান ঘাটে আসতাম। তথায় মাঝি সাম্পান নিয়ে রেডি হয়ে থাকত। সাম্পান নিয়ে আনোয়ারা উত্তর বরুমচড়া পৌঁছে নানার বাড়িতে রাতের খাবার খাওয়া হত। অতঃপর শহরের উদ্দেশ্যে রওনা। চাক্তাইখালের পাড়ে মিয়াখাননগর ১৯৫০ সালে আব্বার নির্মিত নিজস্ব বাসায় ৫/৬ দিন অবস্থানকালে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতাম। শহরের বৈদ্যুতিক আলো দেখা, আইসক্রিম, রসগোল্লা খেতে পারা ইহা এক পরম পাওয়া। ৫/৬ দিনের ব্যবধানে একইভাবে সাম্পানে শহর থেকে আবার বৈলছড়ী গ্রামের বাড়ীতে ফিরে এসে আব্বার কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকতে হত।

আব্বা ১৯৬২ সালের ১৩ এপ্রিল শুক্রবার আজ থেকে ৬৪ বছরপূর্বে ইন্তেকাল করেন। আমরা এখন বার্ধক্যে উপনীত। তিনি হয়ত চেয়েছিলেন তার সন্তাননাতিরা যাতে আয়েশী বিলাসী না হয়। সে লক্ষ্যে আমাদেরকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। যদিওবা আমরা তখন শিশু বিধায় আব্বাকে ভুল বুঝতাম। যৌবনকাল থেকে বার্ধক্যে পৌঁছা দীর্ঘ সময় আব্বার শিশুকালের শাসনের সুফল ভোগ করছি। অর্থাৎ আমরা আয়েশী বিলাসী জীবনের দিকে পা বাড়াতে সচেষ্ট নই। মন থেকেও সায় আসে না। যা জীবনের জন্য কল্যাণকর। একালে ধনীদের সংখ্যা লাখ লাখ। তারা তো বটেই মধ্যবিত্ত পরিবারের পিতারা সন্তানদেরকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। বিলাসী জীবন কল্যাণকর নয়। ধর্মমতেও নয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকটি বিষাদী গান ও জুবীন গার্গের শেষ অনুধাবন
পরবর্তী নিবন্ধনাঙ্গলমোড়ায় বন্যার্তদের পাশে ইউনিয়ন বিএনপি