বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প অবশেষে গতি পেয়েছে। এসপিএম প্রকল্পটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপারেটর নিয়োগের ঠিকাদার নিয়োগের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে সাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল খালাসের কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আমদানিকৃত জ্বালানি তেল নিয়ে আসা মাদার ভ্যাসেলগুলো বহির্নোঙরে অবস্থান করে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে তেল খালাস করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) নিজস্ব দুটি জাহাজে এই তেল লাইটারিং করছিল। কিন্তু এক মাসের ব্যবধানে দুটি অয়েল ট্যাংকার অগ্নিকাণ্ড এবং বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতোমধ্যে এগুলো বহর থেকে বাদ দিয়ে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। ফলে চুক্তি অনুযায়ী তেল লাইটারিং করার জন্য বিএসসি বিদেশ থেকে ভাড়া করে একটি জাহাজ আনে। ওই জাহাজ দিয়ে বর্তমানে আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল লাইটারিং করা হচ্ছে। বহির্নোঙর থেকে গুপ্তাখাল জেটি পর্যন্ত জ্বালানি তেল লাইটারিং করতে বিপুল অর্থ খরচের পাশাপাশি প্রচুর সময়ও লাগে। এভাবে ১ লাখ মেট্রিকটন জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ খালাসে ১০–১১ দিন এবং ৩০ হাজার মেট্রিকটন ডিজেলবাহী জাহাজ খালাসে ৪–৫ দিন সময় লাগে।
এই পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল খালাস সময়সাপেক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল খালাসের জন্য ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে নেওয়া ওই প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সাগরে নোঙর করা বড় বড় মাদার ভ্যাসেল থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়। এতে একটি পাইপলাইনে ডিজেল এবং অপর পাইপলাইনে ক্রুড অয়েল আনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কঙবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী দ্বীপের স্টোরেজ ট্যাংক থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে সাগরে ভাসমান বয়াটির অবস্থান। ২২০ কিলোমিটার সমান্তরালে দুটি পাইপলাইনের সঙ্গে সেটি সংযুক্ত। এর মধ্যে ১৪৬ কিলোমিটার পাইপলাইন অফশোর বা সাগরের তলদেশে এবং ৭৪ কিলোমিটার পাইপলাইন অনশোর বা স্থলভাগে স্থাপন করা হয়েছে। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যসের দুটি আলাদা পাইপলাইন ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত আনা হয়।
বড় জাহাজ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রথমে মহেশখালীর ট্যাংক টার্মিনাল, পরে সেখান থেকে পতেঙ্গায় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংক টার্মিনালে নিতে এগুলো স্থাপন করা হয়েছে। চীনের অর্থায়ন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (সিপিপিই) মাধ্যমে এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটির কাজ শেষে কমিশনিং এবং পরীক্ষা–নিরীক্ষাও করা হয়েছে।
এই টার্মিনালটি ঠিকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে পরিচালনার মতো লোকবল বিপিসির নেই। ইতোমধ্যে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিপিপিই তিন বছরের জন্য এসপিএম পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের না দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা জানান, পাইপলাইনটি বিপিসি বুঝে নিয়েছে। কিন্তুএটি পরিচালনার মতো অভিজ্ঞ লোকবল তাদের কাছে নেই। তাই বিপিসি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়ার পর পাইপলাইনে জ্বালানি তেল আনার কার্যক্রম শুরু হবে। তবে শঙ্কার কথা হচ্ছে, চীনা কোম্পানি পাইপলাইন বুঝিয়ে দিয়েছে। তাদের যে দেড় বছরের গ্যারান্ট্রি পিরিয়ড ছিল সেটিও শেষ হয়ে গেছে। এই দেড় বছরের মধ্যে পাইপলাইনে কোনো সমস্যা হলে তা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দিত। এখন কোনো সমস্যা হলে তা বিপিসিকে নিজস্ব অর্থায়নে করতে হবে।
বিপিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ঠিকাদার নিয়োগের প্রয়োজনীয় টেন্ডার ডকুমেন্টস তৈরিসহ আনুষাঙ্গিক কাজ করার জন্য আইএলএফ নামে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা টেন্ডার ডকুমেন্টসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। টেন্ডারে চীনের সিপিপিই, ইন্দোনেশিয়ার পারটামিনা এবং চীন ও হংকংয়ের হিলং অফসোর ইঞ্জিনিয়ারিং নামের তিনটি কোম্পানি অংশগ্রহণ করে। এসব টেন্ডার যাচাই বাছাই করে ইন্দোনেশিয়ার পারটামিনা এবং চীনের সিপিপিই কোম্পানি দুটির টেকনিক্যাল প্রস্তাব কোয়ালিফাই করা হয়েছে। এরপর ৬ জুলাই ওই দুটি কোম্পানির অর্থনৈতিক দরপত্র খোলা হয়েছে। এখন তাদের ফিন্যান্সিয়াল ডকুমেন্টস মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেওয়া হবে।
বিপিসির পরিচালক (প্ল্যানিং) মোহাম্মদ আসাদুল হক আজাদীকে বলেন, সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পাওয়ার পর তারা প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট ও লোকবল এনে এসপিএম চালু করবে। সবকিছু ঠিকভাবে এগোচ্ছে। আশা করছি নভেম্বরের মধ্যে এসপিএমে অপারেশন শুরু হবে।











