চট্টগ্রামে ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে পুরুষদের বড় অংশ আক্রান্ত হচ্ছেন খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর ক্যান্সারে। আর নারীদের একটি বড় অংশ আক্রান্ত হচ্ছেন স্তন ক্যান্সারে। চট্টগ্রামে নারীদের মোট ক্যান্সার আক্রান্তের ২৫ শতাংশই হচ্ছে স্তন ক্যান্সার। এছাড়া নারীরা মুখ গহ্বরের ক্যান্সারেও আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে নারীরা পান–সুপারি ছাড়া তামাকপাতা খান। এতেও বাড়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে চমেক হাসপাতালে পুরুষদের মধ্যে মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯০০ জন। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬৬০ জন। কোলেরেক্টাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫১৪ জন। খাদ্যনালি ক্যান্সারে ২৭০ জন, পাকস্থলীর ক্যান্সারে ২৬০ জন এবং অনান্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৩১৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে ৯০০ জন স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া জরায়ু মুখ ক্যান্সারে ৬০০ জন, মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সারে ৪০০ জন, কোলেরেক্টাল ক্যান্সারে ২৫০ জন, ফুসফুস ক্যান্সারে ২২০ জন এবং অন্যান্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৯৫০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সার এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে তামাকজাত দ্রব্য সেবন ও ধূমপান। যারা দীর্ঘ সময় ধরে তামাকজাত পণ্য সেবন করেন তাদের মুখগহ্বর ও গলায় ক্ষত সৃষ্টি হয়ে এক পর্যায়ে তা ক্যান্সারের রূপ ধারণ করে। একইভাবে ফুসফুসের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ধূমপানের পাশাপাশি বায়ুদূষণ, শিল্প কারখানার ধোঁয়া ও পরিবেশগত বিষাক্ত উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর ক্যান্সার সাধারণত অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত গরম খাবার গ্রহণ, ধূমপান এবং কিছু সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের জন্য আধুনিক জীবনযাত্রা দায়ী। অতিরিক্ত লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, কম আঁশযুক্ত খাবার, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সার বৃদ্ধি পাচ্ছে হরমোনজনিত পরিবর্তন, দেরিতে সন্তান গ্রহণ, স্থূলতা ও পারিবারিক ইতিহাসের কারণে। জরায়ু মুখের ক্যান্সার মূলত হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণের ফল, যা টিকাদান ও স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০ থেকে ১৫০ জন রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন চমেকে। ক্যান্সার চিকিৎসা আধুনিকায়ন হলেও চমেকে পুরনো রেডিওথেরাপি মেশিন দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। আধুনিক ও যুগোপযোগী চিকিৎসার জন্য আধুনিক রেডিওথেরাপি মেশিন বসানো গেলে প্রতিদিন আরো বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলী আজগর চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে পুরুষদের মধ্যে নাক, কান, গলা ও মুখগহ্বর সংশ্লিষ্ট ক্যান্সার বেশি, যাকে আমরা হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারও বলে থাকি। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারে প্রবণতা বেশি। আবার নারীদের মধ্যে মুখগহ্বরের ক্যান্সারের রোগীও বাড়ছে। জর্দা, পানসহ বিভিন্ন ধরনের তামাক সেবনের কারণে মুখগহ্বর, গলা ও খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়েছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় অনেকে দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। তাছাড়া হাসপাতালের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চট্টগ্রামে হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারের হার তুলনামূলক বেশি। এক্ষেত্রে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস বিশেষত অতিরিক্ত লবণযুক্ত ও সংরক্ষিত খাবার যেমন শুঁটকি খাওয়ার প্রবণতা বেশি হওয়ায় খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত লাল মাংসের কারণে কোলন বা কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ছে। তামাকজাত দ্রব্যের উচ্চ ব্যবহার এবং লবণাক্ত খাদ্যাভ্যাস চট্টগ্রামে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ানোর প্রধান কারণ। তবে নারীরা স্তন ও জরায়ু মুখ ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নানা কারণে।












