পার্বত্য অঞ্চলে ক্রিকেটের সুপ্ত প্রতিভা খুঁজে বের করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক অনটনের কারণে এই অঞ্চলের অনেক উদীয়মান তরুণ–তরুণীর কাছে এ খেলাটি এখনও অধরা থেকে গেছে। বোর্ড মূলধারার ক্রিকেট ব্যবস্থায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর খেলোয়াড়দের নিয়ে আসার উপায় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও বিসিবি পরিচালক সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর মনে করেন, পাহাড় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেট কেন্দ্রগুলোতে আসার অপেক্ষায় দেশের ক্রিকেট কাঠামোকে বসে থাকলে চলবে না। বরং খেলার সুযোগ তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘সব বাধা পেরিয়ে শহরে এসে তাদের পক্ষে ক্রিকেট খেলা সম্ভব নয়। তাই আমি চট্টগ্রামে একটি ডরমিটরি বা আবাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেখানে তারা থাকতে পারবে এবং সব ধরনের সুযোগ–সুবিধা ভোগ করতে পারবে।’ তার প্রস্তাব হলো, এমন একটি কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তৈরি করা, যার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবান তরুণ–তরুণীরা আরও পেশাদার পরিবেশে বসবাস ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা গড়ে তুলতে পারবে। সিরাজউদ্দিন আলমগীরের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে ক্রিকেটের বিকাশে ধীরগতির অন্যতম কারণ হলো এমন কোনো আদর্শ বা ‘আইকন’–এর অভাব। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটকে আপন করে নেওয়ার জন্য আমাদের এলাকায় একজন নায়কের প্রয়োজন। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জন্য তেমন কোনো নায়ক নেই। তাঁর মতে, কোনো জাতিগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা জাতীয় পর্যায়ের একজন সফল খেলোয়াড় শিশুদের জন্য অনুপ্রেরণার শক্তিশালী উৎস হয়ে উঠতে পারেন। বিশেষ করে সেই সব শিশুর জন্য, যারা বর্তমানে নিজেদের সমপ্রদায়ের সাথে শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটের খুব একটা যোগসূত্র খুঁজে পায় না। তবে এমন একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব বা ‘রোল মডেল’ গড়ে তোলার জন্য শুধু প্রতিভাবান তরুণদের খুঁজে বের করাই যথেষ্ট নয়। আলমগীর বলেন, পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিষয়টিও বিসিবিকে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ পরিস্থিতির কারণে অনেক শিশুই স্বাভাবিকভাবেই এমন সব খেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেখানে খুব বেশি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না। তিনি বলেন, ‘দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করার কারণে তারা কম খরচের খেলাগুলোর প্রতি আগ্রহী। পার্বত্য অঞ্চলের দৈনন্দিন জীবনবাস্তবতা শহরাঞ্চলের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন।’ তাই আলমগীর চান, বিসিবি যেন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ব্যবহারিক সহায়তার বিষয়টিও তাদের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যমান সুযোগ–সুবিধা কাজে লাগিয়ে একটি ডরমিটরি বা আবাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছেন আলমগীর। যেখানে থেকে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সম্ভাবনাময় তরুণ ক্রিকেটাররা। পাশাপাশি তিনি আরও চান, বোর্ড যেন নির্বাচিত খেলোয়াড়দের জন্য বেতনসহ আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনা করে। তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে কাউকে বেতনও দিতে পারি, যাতে তারা ক্রিকেট খেলার প্রতি আরও আগ্রহী ও অনুপ্রাণিত হয়। পার্বত্য অঞ্চল থেকে যদি আমরা এভাবেই ক্রিকেটার গড়ে তুলতে পারি, তবে সেখানে এক ধরনের বিপ্লব ঘটে যাবে।’ বিসিবির কাছে এই প্রস্তাব তুলে ধরার পরিকল্পনা করছেন সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর।
ধারণাটি অবশ্য পুরোপুরি নতুন নয়। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনে থাকাকালীন পার্বত্য অঞ্চলে একটি ‘স্পোর্টস সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ বা ক্রীড়া উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ক্রিকেটের প্রসারে বিসিবি এখন আরও সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের কথা ভাবছে। বোর্ড এটিও স্বীকার করে যে, কেবল শারীরিক শক্তি একজন খেলোয়াড়কে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে যেতে পারে না। ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজন কারিগরি দক্ষতা, কৌশলগত বোঝাপড়া এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ। আলমগীর বলেন, ‘টি–টোয়েন্টি ক্রিকেট মানেই শক্তি, এমন একটি ধারণা প্রচলিত থাকলেও, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়া শক্তিই যথেষ্ট নয়।’ তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, নিবিড় প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
বিসিবির সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের শুরুতেই শনাক্ত করা যাবে, তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সুবিধা দেওয়া যাবে এবং পরবর্তীতে মূলধারার বয়স–ভিত্তিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করা যাবে। আলমগীর বলেন, ‘আমাদের উচিত তাদের যথাযথভাবে গড়ে তোলা। বিসিবি এমন একটি নির্দেশিকা ও কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করছে যার মাধ্যমে তারা মূল কাঠামোর অংশ হয়ে নিজেদের দক্ষতা ঝালিয়ে নিতে পারবে। আমরা তাদের বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে দেব না।’ বোর্ডের লক্ষ্য স্পষ্ট, প্রতিভাবানদের খুঁজে বের করা, প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং জাতিগত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের জন্য মূলধারার ক্রিকেট খেলার প্রকৃত পথ তৈরি করে দেওয়া। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পরবর্তী আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার উঠে আসবে কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে এই প্রথমবার খোলাখুলিভাবে বিসিবি ভাবছে যে, পার্বত্য অঞ্চলকে দেশের ক্রিকেটের মূলধারার অংশ করে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।












