পাবলিক পরীক্ষায় মূল্যায়নে গ্রেডিং সিস্টেম চালু হলেও এফ গ্রেড (ফেল) প্রথা বিদ্যমান থাকায় প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবনে নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। ১০ বছর লেখাপড়া শেষে শিক্ষাজীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থীকে যখন ফেল বা অকৃতকার্য ঘোষণা করা হয়, তখন তা একজন শিক্ষার্থীর মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেমে আসে মহাবিপর্যয়। পরীক্ষায় পাস–ফেল এর এই ফলাফল ঘোষণা আর কতদিন চলবে? আমাদের আর্থ–সামাজিক বাস্তবতায়, পাবলিক পরীক্ষায় মূল্যায়নে প্রচলিত এফ গ্রেড বা ফেল প্রথা বাতিল করে ই গ্রেড চালু করা হোক। বর্তমানে এসএসসিতে গ্রেডিং সিস্টেমে ৮০–১০০ নম্বর পেলে এ+, গ্রেড পয়েন্ট ৫, ৭০–৭৯ নম্বর পেলে এ, গ্রেড পয়েন্ট ৪, ৬০–৬৯ নম্বর হলে এ-, গ্রেড পয়েন্ট ৩.৫০, ৫০–৫৯ নম্বর হলে বি, গ্রেড পয়েন্ট ৩, ৪০– ৪৯ নম্বর হলে সি, গ্রেড পয়েন্ট ২, ৩৩–৩৯ নম্বর হলে ডি, গ্রেড পয়েন্ট ১ এবং ০–৩২ নম্বর পেলে, এফ, গ্রেড পয়েন্ট ০। ৩২ বা এর কম নম্বর পেলে পরীক্ষার্থীকে ফেল ধরা হয়। ফেল ধরার এ প্রচলিত নিয়মটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই পাবলিক পরীক্ষায় ‘ফেল’ শব্দটির ব্যবহার নিরুসাহিত করা হয়। গ্রেড বা লেভেলভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে সবার উত্তীর্ণ হওয়া নিশ্চিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নম্বরের পরিবর্তে এ,বি,সি,বা স্কেলভিত্তিক গ্রেড (যেমন জিপিএ বা জিসিএসই গ্রেড) দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী ন্যূনতম গ্রেড (ডি) না পেলেও তাকে সরাসরি ‘ফেল’ হিসেবে না দেখিয়ে মানোন্নয়নের সুযোগ দেয়া হয়। তাই পাবলিক পরীক্ষায় ফেল প্রথা বাদ দিয়ে শুধু গ্রেড পয়েন্ট বা ইতিবাচক মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করতে হবে। একথায় মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও সহজ ও মানবিক হতে হবে।
৩২ বা তার কম নম্বর পেলে ওই শিক্ষার্থীকে ফেল বা অকৃতকার্য ঘোষণা না করে তাকে ই গ্রেডে পাস ঘোষণা করতে সমস্যা কোথায়। এফ গ্রেডের (ফেল) পরিবর্তে ই গ্রেড–এ রেজাল্ট দেয়া হলে তো আর অসুবিধা থাকে না। গতানুগতিক নিয়মে যুগের পর যুগ পাস–ফেল পদ্ধতি চলছে, যা সমাজজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে, তাতে সংস্কার আনা এখন সময়ের দাবী। যেকোনো পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল নয়, শুধু ফল ঘোষণা করতে হবে। পাবলিক পরীক্ষায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে ফেল ঘোষণার কারণে পরীক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের মানসিক ও সামাজিক জীবনে কী অশান্তি নেমে আসে, আমাদের শিক্ষামন্ত্রণালয় তা অনুভব করতে পারে বলে মনে হয় না। সময়ের তাগিদে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংস্কার ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ঠিক তেমনি, পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও সংস্কার করতে হবে। পরীক্ষায় ফেল করা কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে শেষ বা চূড়ান্ত কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি নিজের ভুলগুলো সংশোধন করে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। দুভার্গ্যবশত, আমাদের সমাজ ও পরিবার অনেক সময় পরীক্ষার ফলাফলকে জীবনের একমাত্র মাফকাঠি বানিয়ে ফেলে, যা একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বড়ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে।এই বিপর্যয়গুলো বুঝতে পারলে এবং তা কাটিয়ে ওঠার সঠিক উপায়গুলো জানলে যেকোনো শিক্ষার্থী আবার সফলতার চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।
পাবলিক পরীক্ষায় আর পাস–ফেল নয়, গ্রেড অনুয়ায়ী ফল ঘোষণা করার বিধান চালু করতে হবে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফেল বলতে কিছু নেই। এ+, এ-, বি, সি, ডি ই গ্রেড পয়েন্ট–এ ফল প্রকাশ করা হোক । এ পদ্ধতি চালু হলে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ঘরে ঘরে আর কান্নার আহাজারি প্রতিধ্বনিত হবে না, শোনা যাবে না ফেল করা পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার দুঃসংবাদ। পরীক্ষা চলাকালীন স্নায়ুচাপমুক্ত থাকবে পরীক্ষার্থীরা। পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনের সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হবে। আমাদের শিক্ষামন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নেবে–সেই প্রত্যাশা করছি।











