বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) সারাজাহানে ভালোবাসা বিলিয়ে গেছেন। সবাইকে হৃদয়ে ভালোবাসা ধারণ করতে বলেছেন। যারা অন্যকে ভালোবাসে আল্লাহ তায়ালাও তাদেরকে ভালোবাসেন। এক হাদিসে নবীজি (দ.) বলেছেন আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ ও অনুকম্পা প্রদর্শনকারীদের প্রতি আল্লাহ রহমানুর রহীম অনুগ্রহ ও দয়া বর্ষণ করেন। তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আকাশের মালিক তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করবেন। (আবু দাউদ, তিরমিজি) নবীজি শুধু মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখাননি প্রাণী পশু–পাখিদের প্রতি তাঁর দয়া ও ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। পশু পাখিকে কষ্ট দিতে নিষেধও করেছেন।
বিড়াল প্রীতি: আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বিড়াল খুব পছন্দ করতেন। বিড়ালের ওপর কোন ধরনের অবিচার হলে গুনাহগার হতে হবে। হাদিসে আছে এক মহিলাকে বিড়ালের জন্য আজাব দেওয়া হয়েছে। ঐ মহিলা একটা বিড়ালকে আটকে রেখে খাবার পানীয় দেয়নি ফলে সেটি মারা গিয়েছিল। ঐ মহিলার স্থান হয়েছে জাহান্নামে ।
এক হাদিসে বর্ণিত আছে আল্লাহ রাসূল বিড়ালকে পানি পান করার জন্য পানির পাত্র কাত করে দিয়েছেন বিড়ালটির পানি পান করার পর অবশিষ্ট পানি দ্বারা তিনি অজু করেছেন। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ৩৪৬) বিড়াল প্রেমী সাহাবী আবদুর রহমানকে স্নেহভরে তিনি আবু হুরায়রা নাম দিয়েছেন আবু হরায়রা মানে বিড়ালের বাবা। আল্লাহর রাসূলের প্রতি আবু হুরায়রার ভালোবাসা গভীর ছিল। তিনি বারবার নবীজির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হতেন।
হরিণীর প্রতি প্রেম: হযরত উম্মে সালামা (রাঃ) বর্ণনা করেন। রাসূল (স.) একবার মাঠে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ একটা হরিণী হে আল্লাহর রাসূল বলে ডাক দিল। হরিণীর ডাক শুনে আল্লাহর রাসূল দাঁড়িয়ে যান। হরিণীর পাশে এক লোক ঘুমাচ্ছিল। হরিণীকে আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি কিছু বলবে? হরিণী বলল, এই শিকারী আমাকে শিকার করে এনেছে। এ পাহাড়ের অপর প্রান্তে আমার দুটি বাচ্চা আছে। আমাকে ছেড়ে দেন আমি বাচ্চা দুটিকে দুধ পান করিয়ে আবার ফিরে আসব। আল্লাহর রাসূল গাছ থেকে হরিণীকে বন্ধন খুলে দিল। হরিণী দূরে গিয়ে বাচ্চাদের দুধ পান করিয়ে আবার চলে আসল। রাসূল (দ.) হরিণীকে গাছে বেঁধে রাখলেন। শিকারী ঘুম থেকে উঠে রাসূল (দ.) কে দেখে জিজ্ঞেস করলেন ইয়া রাসূল (দ.) আপনার কোন আদেশ আছে কি। রাসূল (দ.) বললেন, তুমি হরিণীকে ছেড়ে দাও। হরিণী মুক্তি পেয়ে যেতে যেতে বলতে লাগলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহা ছাড়া আর কোনও হুকুম নেই মুহাম্মদ (দ.) আল্লাহর রাসূল।
উটের প্রতি ভালোবাসা: হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক আনসারীর একমাত্র বাহন একটি উট ছিল। কিন্তু উটটি ছিল অবাধ্য। একদিন উটটি কিছু বহন করছিল না। তখন তিনি রাসূল (স.) দরবারে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমার উঠটি অবাধ্য তাকে বশে আনতে পারছি না। আল্লাহর রাসুল(স.) উপস্থিত সবাইকে নিয়ে চলো উটটা দেখে আসি। সবাইকে নিয়ে নবীজি বাগানের দিকে চলল। সাহাবীরা বলল হে আল্লাহর রাসূল উটটি খুবই হিংস্র কুকুরের মতো ধেয়ে আসে এবং কামড় দেয়। আমাদের ভয় হচ্ছে যদি আপনি শিকার হন। নবীজি বললেন, কোনও ভয় নেই বাগানের ভিতরে প্রবেশ করে দেখলেন উটটি বাগানে বাঁধা আছে। যখন উটটি রাসূলকে (দ.) দেখলেন উটটি ধীরে ধীরে নবীজির দিকে আসতে লাগলো। সাহাবারা ভয় পেয়ে গেলেন। উটটি নবীজির সামনে এসে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। আল্লাহর রাসূল উটটির ঘাড়ের চুল নাড়া দিয়ে দাঁড় করালেন। উটটি পরবর্তীতে এমন আনুগত্য হলো যা পূর্বে কখনো হয়নি। উটটি কাজে লাগিয়ে দিল।
এক সাহাবী বলল, হে আল্লাহর রাসূল উট কথা বলতে পারে না এই অবুঝ প্রাণী আপনাকে সেজদা করলো আমরা বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও আপনাকে সেজদা করবো না। নবীজি বললেন, একজন মানুষ কখনো অপর একজন মানুষকে সেজদা করতে পারে না। যদি পারতো তাহলে আমি আদেশ করতাম নারীরা যেন তাদের স্বামীকে সেজদা করে।
বকরীর ভালোবাসা: হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার রাসূল (দ.) হযরত আবুবকর ও হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) কে সাথে নিয়ে এক আনসারী সাহাবীর বাগানে গেলেন। এবং সেখানে কিছু বকরী বিচরণ করছিল। রাসূল(দ.) কে দেখে বকরীগুলো সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। এ দৃশ্য দেখে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। অতএব আমরাও আপনাকে সেজদা করবো। রাসূলাল্লাহ (দ.) বললেন, আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকে সেজদা করা ঠিক নয়। একবার প্রিয় নবীজি তাঁর সাহাবীদের নিয়ে (প্রায় চারশত সাহাবী) সফর করছিলেন। পথ চলতে চলতে এক পানি শূন্য এলাকায় উপস্থিত হন। রাসূলকে (দ.) এক সাহাবী বিষয়টি অবহিত করেন। ঠিক সে সময় হঠাৎ একটি ছোট বকরী রাসূল (দ.) এর সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন। দুধ দুহনের জন্য। তিনি বকরীর দুধ দোহন করলেন নিজেও বকরীর দুধ পান করলেন এবং সবাইকে দুধ পান করালেন। হযত রাফে (রাঃ) বললেন, বকরীটি সারারাত আটকে রাখবে কিন্তু আমার সন্দেহ তুমি বকরীটিকে আটকে রাখতে পারবে না। হযরত রাফে (রাঃ) ঘুম থেকে উঠে দেখেন বকরী নেই। ঘটনা শুনে রাসূল(দ.) বললেন, যে আল্লাহ বকরীটিকে এখানে এনেছিলেন তিনি তা নিয়ে গেছেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।












