বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম পর্বত ‘মাকালু’ অরোহণ শেষে দেশে ফিরেই সেই অভিযানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন বাবর আলী। বললেন, অভিযানে মার্কিন এক পর্বতারোহীর মৃত্যু দেখতে হয়েছে; রুশ এক পর্বতারোহীর আহত হওয়ার খবর তাকে পীড়া দিয়েছে। এবারের অভিযানের অনুভূতি ‘খুবই মিশ্র’ মন্তব্য করে বাবর বলেছেন, লাল–সবুজ পতাকা হাতে আরোহণের আনন্দ যেমন আছে, তেমনই দুর্ঘটনাগুলো নিয়ে অসম্ভব খারাপ লাগাও আছে। গতকাল রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাকালু চূড়ায় পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন বাবর আলী। তার কথায়, পূর্বে আরো বেশ কয়েকটা আট হাজার মিটারের পর্বত আরোহণ করলেও এই পর্বতের মতো ঠান্ডা আর হাওয়ার কামড়ের মুখোমুখি কোথাও হতে হয়নি। এই ভয়াবহ ঠান্ডা আর হাড় হিম করা বাতাসের জন্য এই পর্বতে কাটানো প্রতিটা মিনিটই ছিল এক অর্থে কঠিন। আর মাকালু পর্বত আবহাওয়ার দিক থেকেও খুবই রহস্যময় আচরণ করেছে পুরো অভিযানজুড়েই। এখানের আবহাওয়া খুব দ্রুতই পরিবর্তিত হয়। এর সাথে মানিয়ে নেওয়াটা সহজ নয় অনেকাংশেই। খবর বিডিনিউজের। সহযাত্রী হারানোর কথা তুলে ধরতে গিয়ে বাবর বলেন, এ অভিযানেই আমি হারিয়েছি আমেরিকান বন্ধু শেলি জোহানসেনকে। চূড়া আরোহণ শেষে নেমে আসার পথে তুষারধসে পড়ে প্রাণ হারান শেলি। আজ নেপালে শেলির শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমার আরেক বন্ধু রাশিয়ান পবর্তারোহী কন্সট্যান্টিন শিকার হয়েছে তুষার ক্ষতের। ওর সাথে এই অভিযানে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি আমি। হাত–পায়ের বেশ অনেকগুলো আঙুল তুষার ক্ষতের কারণে হারিয়েছে ও।
আট হাজার মিটারের পাঁচটি পর্বতে সফল আরোহণকারী একমাত্র বাংলাদেশি বাবর পর্বত অভিযানের কঠিন বাস্তবতার কথাও বলেন। পর্বত মাঝে মাঝেই খুবই ‘অন্যায্য’ আচরণ করে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সব মিলিয়ে এই পর্বত আরোহণের অনুভূতি খুবই মিশ্র। লাল–সবুজ পতাকা হাতে আরোহণের আনন্দ যেমন আছে, তেমনিই এই দুর্ঘটনাগুলো নিয়ে অসম্ভব খারাপ লাগাও আছে। পর্বতে জীবন ও মৃত্যু এত কাছাকাছি! সেখানে হাত ধরাধরি করে চলে জীবন–মৃত্যু।
চলতি বছরই পাকিস্তানের নাঙ্গা পর্বত আরোহণের পরিকল্পনা থাকলেও তহবিল স্বল্পতায় তা সম্ভব হয়নি জানিয়ে বাবর আলী বলেন, যদিও এ বছর আমার ইচ্ছে ছিল কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত বিশ্বের নবম উচ্চতম শৃঙ্গ নাঙ্গা পর্বত আরোহণের। কিন্তু অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় টাকার স্বল্পতা ও নানান কারণে আমি শেষ মুহূর্তে পাখির চোখ করি মাউন্ট মাকালুকে।
পর্বত চূড়ায় লাল–সবুজ পতাকা হাতে কেউ দাঁড়ালে–তার সঙ্গে দেশও কিছুটা হলেও উপরে ওঠে বলেই মনে করেন বাবর আলী। তার ভাষায়, আশা করি, অন্য পর্বতারোহীরাও সেই ধারা অব্যাহত রাখবে। তবে পর্বতে যাওয়াটা তো কোনো খেয়ালি ব্যাপার কিংবা দিবাস্বপ্ন নয়। এর পেছনে দীর্ঘ সাধনা আর প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। প্রস্তুতির ব্যাপারটাতে সবাই যাতে আরো বেশি মনোযোগ দেয়, সেই প্রত্যাশা থাকবে আমার। আর আমি চাই ১৪টি আট হাজারি শৃঙ্গের সবকটিতেই চড়তে। সবেমাত্র পাঁচটি হলো, বাকি আছে আরও ৯টি। আশা করি, পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে লাল–সবুজ পতাকা হাতে বাকি ৯টি পর্বতের চূড়ায়ও আমি দাঁড়াতে পারব।
পৃথিবীতে আট হাজার মিটার (২৬,২৪৬ ফুট) বা ততোধিক উচ্চতার পর্বত আছে চৌদ্দটি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এর চারটি পর্বতের চূড়া ছুঁয়েছিলেন পর্বতারোহী বাবর আলী, যে কীর্তি নেই আর কোনো বাংলাদেশির। গত ২ মে ভোরে নিজের পঞ্চম আট হাজারি পর্বত হিসেবে স্পর্শ করেন পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ ‘মাকালু’ শিখর। নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার (২৭,৮৩৮ ফুট) উচ্চতার এই পর্বতে এটিই প্রথম কোনো বাংলাদেশি পর্বতারোহীর সফল অভিযান। অভিযান শেষে নেপাল থেকে দেশে ফিরে ‘এক্সপিডিশন মাকালু : দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই অভিযানের গল্প শোনালেন বাবর।













