পরিষেবার প্রতিটি বিভাগেই চলছে অনিয়ম : প্রয়োজন আইন সংশোধন

রেজাউল করিম স্বপন | মঙ্গলবার , ২৬ মে, ২০২৬ at ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের মতো এতো বেশি আইন বিশ্বের আর কোন দেশে আছে কিনা সন্দেহ। এসব আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে, বিশ্বে আমরাই সবচেয়ে সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক জাতি হিসাবে গড়ে উঠতাম। দুঃখের বিষয় হলো আইন করার বিষয়ে আমরা যত সিরিয়াস, প্রয়োগের ব্যাপারে তত সিরিয়াস নই। আবার অনেক আইন আছে যেগুলো যুগোপযোগী না হওয়ায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে শীতলতা পরিলক্ষিত হয়।

বাংলাদেশে বিদ্যুতের আইনে কোথাও কনস্ট্রাকশন করলে কনস্ট্রাকশন মিটার নিতে হয়। আইনটি নতুন কনস্ট্রাকশনএই পর্যন্ত ভালো। কিন্তু যদি কেউ আর্থিক অসচ্ছলতা বা অন্য কোন কারণে নিজের বাড়িতে থেকে ৫৭ বছর ধরে কনস্ট্রাকশন করান, তখনো তাকে কনস্ট্রাকশন মিটার নিতে হবে, বিষয়টি বড়ই আজব। প্রশ্ন হলো কেন তাকে কনস্ট্রাকশন মিটার নিতে হবে? তার তো মিটার আছে। কনস্ট্রাকশনের জন্য বিদ্যুতের তেমন কোন প্রয়োজন হয় না, শুধু লাইট জ্বালানো ছাড়া। তাহলে আস্তে আস্তে কনস্ট্রাকশন করাতে গেলে কেন তাকে কনস্ট্রাকশন মিটার নিতে হবে? আর আইনের এই সুযোগটি নেন বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীরা। তারা কনস্ট্রাকশন চলা বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনৈতিকভাবে লাভবান হন। বনিবনা না হলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের নোটিশ প্রদান করে। অনেক জায়গায় মিটারের বাইরে দিয়ে কানেকশন দিয়ে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়। এর সবকিছুতে বিদ্যুৎ বিভাগের একশ্রেণির অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারী জড়িত থাকে। ফলশ্রুতিতে বিদ্যুতের সিস্টেম লস ২ অংকের নিচে নামানো যায় না। এতে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য সরকারকে যুগের পর যুগ ধরে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়।

ওয়াসার ক্ষেত্রেও কনস্ট্রাকশন মিটারের নিয়মটি একই রকম। ধরুন আপনার বাড়িতে ওয়াসার পানি নিয়মিত আসে না বা ওয়াসা আপনার চাহিদা মত পানি সরবরাহ করতে পারে না। বহুবছর ধরে আপনি পানির কষ্ট করছেন। বিকল্প উৎস হিসাবে ডিপ টিউবওয়েল বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটি বসাতে পারবেন না, যতক্ষণ না ওয়াসা থেকে টিউবওয়েল বসানোর জন্য ফি দিয়ে লাইসেন্স না নেন। এই আইনটিও বড় আজব। অর্থাৎ আপনি পানির জন্য ওয়াসার কাছে জিম্মি। ওয়াসা আপনার পানির চাহিদা পূরণ করতে না পারলেও অন্য উৎস বিশেষ করে ডিপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করতে গেলে বাগড়া দিবে।

বেশ কয়েক বছর আগে সরকার জমির মিউটেশন আবেদন অনলাইনে করার নিয়ম করেছে। পুরো প্রক্রিয়াটির জন্য সময়ও বেধে দিয়েছে। বিষয়টি খুবই ভালো। এতে আগের মত বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় না। দালালের দৌরাত্ম্য ও মানুষের হয়রানি কমেছে। কিন্তু অনলাইনে আবেদন করে আবেদন ও দখিলকৃত কাগজ পত্রের একসেট সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের তহসিলদারের কাছে জমা দিতে হয় ও তাকে সন্তুষ্ট করতে হয়। যদি ঐ কাগজপত্র জমা দেওয়া না হয় ও সন্তুষ্ট করা না হয়, তবে আবেদনটি বাতিলের জন্য নেগেটিভ রিপোর্ট দেওয়া হয়। অথচ এসি ল্যান্ডের কাছে হিয়ারিংয়ের সময় মূল কাগজপত্র প্রদর্শন করতে হয়। প্রশ্ন হলো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসি ল্যান্ডকে মূল কাগজপত্র প্রদর্শন করতে হলে, আগে কেন তহসিলদারের কাছে কাগজপত্র জমা দিতে হবে? এতে কি দুর্নীতি করার পথ খোলা রাখা হলো না?

আপনি পাসপোর্ট করবেন। সরকার অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু হার্ডকপি জমা দিতে গেলে শুরু হয় বিড়ম্বনা। আপনাকে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত লম্বা লাইনে খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষা করতে হবে। হার্ডকপি কাউন্টারে জমা দিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী নানান অজুহাতে সেটি রিসিভ করতে চাইবে না। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হয়। অনলাইনে আবেদন জমার সময় বিষয়টি সেটেল্ড হয়ে যাওয়ার পরেও নানান অজুহাত তোলা অন্যায় ও অনৈতিক। যদি অনলাইনে আবেদন করার সময় ছবি তোলা ও হার্ডকপি জমার জন্য নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় (স্লট) নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তাহলে মানুষের দুর্ভোগ কমতো ও মানুষ দালালের শরণাপন্ন হতো না।

আপনি নতুন গাড়ির নিবন্ধন করবেন বা ড্রাইভিং লাইসেন্স করবেন। যেতে হবে বিআরটিএতে। সেখানে দালালের ছড়াছড়ি। সামনে যাকে দেখবেন সেই দালাল। যে জটিল ফর্মালিটি পালন করে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে হয়, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিপালন করা অসম্ভব। ডিক্লরেশন অংগীকারনামা আরো কত কী? অথচ দেশীয় গাড়ির ক্ষেত্রে যদি উৎপাদিত কোম্পানির সেল রিসিপ্ট (অনলাইনে আপডেটসহ) ও বিদেশ হতে আমদানিকৃত গাড়ির ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃক ছাড়কৃত ডক্যুমেন্টের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রেশন করা হয়, তবে এসব জটিলতা পরিহার করা সম্ভব। আর ড্রাইভিং লাইসেন্স, সেটি সোনার হরিণ। লিখিত মৌখিক ও প্র্যাকটিকাল সবই ম্যানুয়েলি হয়। তবে দালাল ধরলে পরীক্ষা ছাড়া সহজে লাইসেন্স পেয়ে যাবেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় রাস্তায় চলাচল করলে। এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দেশে লাইসেন্সধারী চালকের প্রায় শতভাগ দালালের মাধ্যমে পাওয়া লাইসেন্সধারী। যথাযথভাবে পরীক্ষা নিলে বেশিরভাগ ড্রাইভার ফেল করবে। তাদের না আছে ট্রাফিক রুলের বিষয়ে জ্ঞান, না আছে দক্ষতা। অন্যদিকে বিআরটিএ অফিসে যারা কর্মরত তারা এক একজন ১০২০ বছর বা সারাজীবন একই জায়গায় ঘুরেফিরে কর্মরত থাকে। তাদেরকে ট্রান্সফার করলেও তদবির করে আবার আগের জায়গায় চলে আসে। এটি এক অদ্ভুত ডিপার্টমেন্ট, যেখানে দালালেরাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে ৪৭ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। যার মধ্যে নিম্ন আদালতে আছে প্রায় ৪০ লাখ ৪২ হাজার মামলা। বাকি সাড়ে ৬ লাখ মামলা আছে উচ্চ আদালতে। সুপ্রিম কোট ও নিম্ন আদালত মিলিয়ে সারা দেশে মোট বিচারকের সংখ্যা প্রায় ২,৩০৭ জন। প্রতি ৭৮,০২৩ জন নাগরিকের জন্য বর্তমানে ১ জন বিচারক রয়েছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। যদিও আইন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকার দ্রুত বিচারক সংকট নিরসন করে এই সংখ্যা অন্তত ৬,০০০এ উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। এই মামলাগুলোর অর্ধেক হলো জায়গা জমি সংক্রান্ত মামলা। যার মধ্যে একটা বড় অংশ হলো ভূমি জরিপ সংক্রান্ত মামলা। এক একটি মামলা ২০২৫ বছরের পুরানো। এরপরেও এই মামলাগুলো শেষ হচ্ছে না। বেশিরভাগ মামলার বাদি বিবাদী উভয়েই অশিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে এসব মামলা চালাতে গিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে যান।

আমাদের দেশে বিচার প্রার্থীরা পুরোপুরি উকিলের উপর নির্ভরশীল। তারা উকিল ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে কোন তথ্য পান না। উকিল সাহেবেরা যা বলেন তা বিশ্বাস করতে হয়। আর উকিল সাহেবেরা যদি সন্তুষ্ট না হয়, তবে বাদী বিবাদীর কপালে দুঃখ থাকে। উকিল সাহেবরা ইচ্ছে করলে যেকোন মামলা দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নিতে পারেন। তাদের সেই সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কিছু সংখ্যক উকিল সেটি করেন না, তারা মনে করেন মামলা শেষ হয়ে গেলে মামলা সংক্রান্ত ফি বন্ধ হয়ে যাবে। যা জনস্বার্থ ও নীতি নৈতিকতা বিরোধী। তাই মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে এডভোকেট বারগুলো মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা চালু করতে পারে। অন্যদিকে সরকারের উচিত যে কোন মামলার বিষয়ে নির্দিষ্ট টাইম বেধে দেওয়া। প্রয়োজনে আইনের ভিত্তিতে ৫ বছরের বেশিদিন ধরে চলা এসব মামলা বিশেষ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এমন আইন প্রণয়ন করা যাতে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে চলা এসব মামলা অটোমেটিকভাবে ঐ বিশেষ আদালতে চলে যায়। নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে এইসব মামলার হালনাগাদ তথ্য সংযুক্ত করাসহ পরবর্তী করণীয় কী, তা সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করা। যাতে ভুক্তভোগীরা যে কোন সময় মামলার পরবর্তী করনীয়সহ সার্বিক বিষয়ে তথ্য পেতে পারেন। দেশে আইন প্রণয়ন করা হয় জনগণের কল্যাণের জন্য। তা সংশোধনও করা হয় জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে। তাই যেসব আইন যুগোপযোগী নয় তা সংশোধন করে জনবান্ধব আইন করা বর্তমান সময়ের দাবি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধধর্ষণ খুন ও কিছুকথা
পরবর্তী নিবন্ধহাম : একটি নীরব মহামারী