জীবনটা যেন এক অদৃশ্য দাঁড়িপাল্লা। এক পাশে যদি বেশি ভার পড়ে, অন্য পাশটা কমে হালকা হয়ে যায়। দুটোই সমস্যা। আমাদের জীবনের অনেক সংকটের পেছনেই ‘কম’ কিংবা ‘বেশি’ শব্দ দুটি লুকিয়ে থাকে। আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িপাল্লা সমান থাকলে ভারসাম্য থাকে, জীবনও থাকে স্বস্তিতে। ভারসাম্য হারিয়ে গেলেই শুরু হয় অস্থিরতা। চন্দ্র সূর্য যেমন তার নিজস্ব গতিতে নিজস্ব নিয়মে প্রতিদিন ঠিক একইভাবে উদিত হয় এবং অস্ত যায় পৃথিবীও ঠিক তেমনি তার আপন গতিতে এগিয়ে যায়, ভারসাম্য রক্ষা করে।
আমার দেখা এক ভদ্রলোক উপার্জনের তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যে চলে যান। কিছুদিন যেতে না যেতেই বেশ টাকা–পয়সাও উপার্জন করলেন। পরিবারে পাঁচ থেকে ছয় জন সদস্য। গৃহিণী অল্পস্বল্প অক্ষরজ্ঞানের যোগ্যতা রাখেন। ছেলেমেয়েগুলো প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক স্তরে বিভিন্ন ক্লাসে অধ্যয়নরত ছিল। কর্তা মধ্যপ্রাচ্য থেকে টাকা পাঠান, গৃহকর্ত্রী খরচ করেন। মাত্র অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আধুনিক মনোমুগ্ধকর ও দামি দামি জিনিসপত্রে ঝলমল করতে লাগলো ভদ্রলোকের পরিবার। বিদেশ থেকে কিছুদিন পর পর টাকা পাঠালেও মহিলা টাকা হাতে পাওয়া মাত্রই এতই খরচ করে ফেলেন যে মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতায় সবার চোখ কপালে ওঠে। গৃহকর্ত্রী ব্যাংক থেকে যেদিন টাকা তোলেন সেদিন দেদারছে খরচ করেন। কয়েকদিন পরই টাকা এবং খাদ্য সামগ্রী দুই–ই ফুরিয়ে যায়। এমনকি সবচেয়ে জরুরি …ভাতের চাল পর্যন্ত থাকে না রান্না করার জন্য। মানুষ এই ধরনের বেহিসেবি চলাফেরায় অবাক হয়। বিলাসিতা তাদের এমনভাবে চেপে বসে যেন কিছুতেই আর চলে না। এক সময় ভদ্রলোক অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন। অভাব অনটনে পড়তে হয় পরিবারটিকে। দেখতে না দেখতে ঘরের সমস্ত মনোমুগ্ধকর পছন্দের এক একটা জিনিস পানির দরে বিক্রি করা শুরু হলো। বছর দুয়েকের মাথায় পথে বসলো এই পরিবার।
ভদ্রমহিলা মৌলিক চাহিদা ও বিলাসিতার মাঝখানে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেননি। প্রয়োজন অপ্রয়োজনের হিসেব বুঝে সংসার সাজাতে পারেননি। যার ফলে সাজানো গোছানো একটা পরিবার অচিরেই পথে নামলো। তার মধ্যে যদি পরিমিতি বোধ থাকতো সংসারের এই হাল হতো না।
আমাদের জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে পরিমিতিবোধ অবশ্যই জরুরি। এটি মানুষকে সুশৃঙ্খল , দায়িত্বশীল ও সফল হতে সাহায্য করে। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই পরিমিতিবোধের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আসলে অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। কথায় আছে ‘এক্সেস অফ এভরিথিং ইজ ব্যাড’। খাওয়া–দাওয়া, পড়ালেখা, রান্নাবান্না, কেনাকাটা, খেলাধুলা, বিনোদন, ঘুম, দুশ্চিন্তা, অলসতা এমনকি কানাঘুষা, পরচর্চা, ভোগ–বিলাস পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই হিসেব করে চলা জরুরি।
একজন বাবা মা যদি তার সন্তানকে অতিরিক্ত শাসন করেন সেই সন্তান ভীতু বা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। আবার যদি একেবারে শাসন না করে তবে সন্তান নিয়মানুবর্তিতা শেখে না। তাই একজন বাবা মা‘র উচিত অতিরিক্ত শাসন বা অতিরিক্ত আদর না করে দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ।
অর্থ উপার্জন জরুরি। কিন্তু অবিরাম অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে যদি পরিবার স্বাস্থ্য ও মানসিক শান্তিকে অবহেলা করা হয়, তাহলে সেই সাফল্য একদিন অর্থহীন হয়ে যায়। আবার একেবারে অলস বা বেকার বসে থাকলেও জীবন চলে না। সেজন্য অর্থ উপার্জন আয়–ব্যয় সবকিছুতেই ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সবচেয়ে অবহেলিত গুণগুলোর একটি হলো পরিমিতিবোধ। আমরা প্রায় ‘অতিরিক্ত’ ‘আর’ ‘অপ্রতুল’ এর দোলাচলে দোদুল্যমান থাকি।
মাঝামাঝি পথটাকে আমরা উপেক্ষা করি। পরিমিতিবোধ হচ্ছে সেই সচেতনতা যা বলে দেয় – কখন থামতে হবে, কতটুকু থামতে হবে আর কোন জায়গায় সীমা অতিক্রম করা ঠিক নয়।
বর্তমানে আমরা যেন চরমতার দিকে ধেয়ে চলেছি। কেউ অতিরিক্ত অপচয় করে কেউ প্রয়োজনীয় জিনিস থেকেও বঞ্চিত হয়। এই দুই প্রান্তিক অবস্থার মাঝখানে যে ভারসাম্য সেটাই সুস্থ ও সুন্দর জীবনের মূল চাবিকাঠি।
তাহলে আমরা কেন এই পরিমিতিবোধ হারিয়ে ফেলছি? আমার মতে, এর জন্য অনেকাংশে সামাজিক অবস্থাই দায়ী। ছোটবেলা থেকেই আমরা শিখি ‘মানুষ কী বলবে’, ‘মানুষ কী ভাববে’। কিন্তু নিজের সীমাবদ্ধতার কথা ভাবি না।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ভোগবাদী সংস্কৃতিও আমাদের পরিমিতিবোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের জীবনযাপন দেখে আমরা নিজের সঙ্গে তুলনা করি। এতে নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। আবার চাপ বাড়ে পরিবারের ওপরও। কারো সাফল্য, কারো বিলাসিতা, কারো জনপ্রিয়তা সবকিছুই আমাদের মনে অস্থিরতা তৈরি করে। ফলে আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করে।
খাদ্যাভ্যাসের কথাই বলি না কেন, অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাসে শরীরে নানা ধরনের রোগ বাসা বাঁধতে পারে অথবা যে কোনো ধরনের শারীরিক ঝুঁকির সম্ভাবনাও হতে পারে। ঠিক তেমনি একেবারে কম খাওয়াও পুষ্টিহীনতার কারণ হয়।
অতিরিক্ত পড়ালেখা যেমন মানসিক চাপ বাড়াতে পারে কিংবা শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে তেমনি কম পড়ালেখাও ব্যর্থতার কারণ হতে পারে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এর বাইরেও অতিরিক্ত গল্পবই পড়া বা লেখালেখির পেছনে সময় দেয়ায় দৈনন্দিন কাজ উপেক্ষিত হয়, সেটিও ভারসাম্যহীনতা। আবার আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় যেমন সংসারে সংকট সৃষ্টি করতে পারে ঠিক তেমনি অতিরিক্ত কৃপণতাও আনন্দহীন পরিবারে পরিণত হতে পারে। সারাদিন অতিরিক্ত পরিশ্রমে যেমন অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে ঠিক তেমনি অতিরিক্ত অলস বসে কাটালেও সুস্থ থাকা দায় হয়ে পড়ে।
বর্তমানে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মনোযোগ, সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সংসারে ছেলেমেয়ে ও স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। একটা খিটখিটে মেজাজের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এতে করে নিজের কর্মক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যস্ত থাকার কারণে দেখা গেছে অনেকে পাগল হয়ে গেছে । অনেকের সংসার ভেঙে গেছে । সংসারে শান্তি হারিয়ে যাচ্ছে। নগর জীবনে দৈনন্দিন গ্যাস বিদ্যুৎ পানি ব্যবহারেও ভারসাম্য রক্ষা করা উচিত। কেউ অতিরিক্ত ব্যবহারে বিলাসিতা করে আর কেউবা ছিটেফোঁটাও না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে। অতিরিক্ত শপিং কিংবা দামি রেস্টুরেন্টে সব সময় খাওয়ার অভ্যেস ছেলেমেয়েকে উড়নচণ্ডী, বেহিসেবী, বিলাসী এবং অহংকারী করে তুলতে পারে। তেমনি একেবারে বিমুখ থাকাও জীবন রুক্ষ বা আনন্দহীন মনে হতে পারে। তাই মাঝামাঝি পথই শ্রেষ্ঠ। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এই সমস্যা প্রকট। একদিকে তারা স্বপ্ন পূরণে অস্থির, অন্যদিকে ব্যর্থতার ভয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না। এই দুই অবস্থাই ক্ষতিকর। পরিমিতিবোধ এখানে দিকনির্দেশনার মতো কাজ করে ‘এগিয়ে যাও, তবে নিজের সীমা ও সামর্থ্য বুঝে।’
এখন প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে এই পরিমিতিবোধ গড়ে তুলব? প্রথমত আত্মসচেতনতা দরকার। নিজের সীমা ও সামর্থ্য বুঝতে হবে। দ্বিতীয়ত তুলনার অভ্যাস কমাতে হবে। প্রত্যেক মানুষের পথ আলাদা। তৃতীয়ত ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে খাদ্যে সংযম, সময় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই পরিমিতিবোধ শেখাতে হবে। শুধু অন্যকে খুশি করার শিক্ষা নয়, নিজের সঙ্গে সৎ থাকার শিক্ষাও জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনায়ও পরিমিতিবোধ দরকার। উন্নয়ন, ভর্তুকি, করনীতি সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য জরুরি। অতিরিক্ত ব্যয় যেমন সংকট তৈরি করে, তেমনি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও অস্থিরতা আনে।
লেখক: প্রাবন্ধিক।












