পতেঙ্গা সৈকতকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন জরুরি

| শুক্রবার , ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম শহরের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হলো ‘পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত’। ওপারে সুন্দর প্রকৃতি পরিবেষ্টিত মেরিন একাডেমি। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় সৃষ্টি হয়েছে মায়ার এই পর্যটন কেন্দ্র। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ঘাঁটি বিএনএস ঈসা খান পতেঙ্গার একেবারে সন্নিকটে অবস্থিত। পতেঙ্গা সৈকতে যাওয়ার পথে নৌবাহিনীর গল্ফ ক্লাব ও পাশের বোট ক্লাব পর্যটকদের চাহিদা মেটায়। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক জেটি এখানে অবস্থিত। এখানে বসে পর্যটকদের মিলনমেলা। ইতোমধ্যে এই সৈকত ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফলে বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমায় এই সমুদ্র সৈকতে। তেমন মনোমুগ্ধকর এক পর্যটন এলাকাটির সৌন্দর্য বিনষ্ট হতে চলেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দৈনিক আজাদীর ২১ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত ‘কেন এই অযত্ন, অবহেলা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকশ কোটি টাকা খরচ করে দৃষ্টিনন্দনভাবে গড়ে তোলা হয় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে। সৈকতের সৌন্দর্যবর্ধনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। তৈরি করেছিল ওয়াকওয়ে, পুলিশের বাগান, নান্দনিক লাইট পোস্টসহ নানা কিছু। কিন্তু মাত্র বছর দুয়েকের মধ্যে সবই প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। ফুলের বাগান ও গাছ কেটে তৈরি করা হয়েছে দোকান। যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে দোকান তৈরির পাশাপাশি নাগরদোলা থেকে শুরু করে স্ট্রিট ফুডের নানা সরঞ্জামের দখলে পতেঙ্গা সৈকত। বাঁধ রক্ষার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের বসার জন্য তৈরি করা অপরূপ ‘ঝিকঝাক ব্লক’ অযত্নের কারণে ঘাসের দখলে চলে যাচ্ছে। অযত্ন আর অবহেলায় এটা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। সৈকতকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
এখানে উল্লেখ করতে পারি, সিডিএ সৈকতের একটি অংশ বেসরকারি খাতে দেয়ার জন্য টেন্ডার আহ্বান করে। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ‘এক কিলোমিটার অংশের অপারেটর পুরো সৈকতের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে। তারা পুরো সৈকতে আলোর ব্যবস্থা করবে, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করবে, পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও চেঞ্জিং রুম তৈরি করবে। তবে এক কিলোমিটারের বেশি এলাকা তারা সংরক্ষণ করতে পারবে না। বাকি অংশের ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থও দাবি করতে পারবে না।’ কিন্তু এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অনেকেই সিডিএর এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে। এতে করে সিডিএ উক্ত প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে।
পত্রপত্রিকায় বলা হয়, তুরাগ নদ দখল ও দূষণ নিয়ে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন। সেই রায়ে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, ঝিল, নদীর পাড়, পাহাড়-পর্বত, টিলা, বন, বাতাস ইত্যাদি জনগণের সম্পত্তি। এসব সম্পত্তি নাগরিকের, কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়। এসব পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তিতে সাধারণ জনগণের মুক্ত ও বাধাহীন ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র হচ্ছে এখানে ট্রাস্টি। এগুলো কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানিকে বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দেওয়া চলবে না।’ এই রায় একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা। সুতরাং সিডিএ পতেঙ্গার সমুদ্রসৈকত ইজারা দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আদালতের রায় তথা রাষ্ট্রের সংবিধানপরিপন্থী। নাগরিক মন্তব্যে আরো বলা হয়, সিডিএ পতেঙ্গার সৈকতে অব্যবস্থাপনার যে চিত্র তুলে ধরেছে, তার দায় তারা এড়াতে পারে না। নিজেদের ব্যর্থতার দায় ঢাকতে সমুদ্রের জল-হাওয়া বিক্রির যে ব্যবস্থা তারা নিয়েছে, এটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়; বরং পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে আরও মনোরম চিত্তবিনোদনের স্থান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে সিডিএকেই। সুষ্ঠু ও দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে সৈকত ব্যবস্থাপনার অর্থও এখান থেকে আয় করা সম্ভব, এর জন্য বড় বিনিয়োগকারীর কাছে হাত পাতার প্রয়োজন পড়ে না।
আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরেজমিনে সৈকতে গিয়ে ময়লা-আবর্জনার ছড়াছড়ি দেখা গেছে। বেশ কিছু দোকান উচ্ছেদ করা হলেও দখল থেকে নিস্তার মিলছে না। নান্দনিক সৈকত এলাকা এখন শ্রীহীন। এরকম একটি পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য যাতে কোনো ক্রমেই বিনষ্ট না হয়, তার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ না নিলে এটির সৌন্দর্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এজন্য সৈকতকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন জরুরি।