বর্তমানে এক শ্রেণির মানুষ শিক্ষকদের নিয়ে নানা মন্তব্য করা শুরু করেছে। শিক্ষকরা ঠিকভাবে পড়ায় না। আমি পেশায় একজন শিক্ষক। তাই কিছু কষ্ট এবং প্রতিবাদের কথা না লিখে পারলাম না।
আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের নিয়ে কাজ করি। যে শিশুরা পারিবারিকভাবে অবহেলিত। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা তার পরিবারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে। পরিবার থেকেই শিশু ভালো হওয়া অথবা মন্দ হওয়ার ব্যাপারগুলো শিখতে পারে। আমি শিশুদের পাঠদান করতে গিয়ে অনেক সময় খেয়াল করি যে, শিশুটি শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল। অর্থাৎ শিশুটি সারাদিন অভুক্ত অবস্থায় বিদ্যালয়ে অবস্থান করছে। আর করবে নাই বা কেন? যেখানে এই কোমলপ্রাণ শিশুদের সকাল নয়টায় বিদ্যালয়ে উপস্থিত নিশ্চিত করতে হয় আর বিকাল চারটায় বিদ্যালয় থেকে প্রস্থান করতে হয় সেখানে একটি শিশু কী বা খেয়ে আসতে পারে? হ্যাঁ হয়তো এ বিষয়ে কেউ কেউ বলবেন বাসা থেকে টিফিন আনতে পারে অথবা এখন তো বিদ্যালয়ে সরকার প্রদত্ত খাবার দেওয়া হয়। তবুও দীর্ঘ আট ঘণ্টা কখনোই শিশু স্থির হয়ে থাকবে না। এটা আমার ধারণা থেকে বলছি। শিক্ষক এবং শিশুদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনলেই শিক্ষার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এবার বলি শিশুদের অভিভাবকদের বিষয়ে। যে বই নিয়ে শিশুরা বিদ্যালয়ে আসে সেটা শুধু বিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বেশিরভাগ শিশুর পড়া শুধু বিদ্যালয়ে যতটুকু শেখানো হয়, ঠিক ততটুকুই থাকে। অভিভাবকের অসচেতনতার কারণে সেই শিশু আর বই খুলেও দেখে না। আমরা প্রাথমিকের শিক্ষক। একটা শ্রেণিতে কম করে হলেও ৫০ জন থাকে। আর বেশির কথা নাই বা বললাম। আমাদের সবটুকু দিয়ে আমরা চেষ্টা করলেও সেটা যদি বাসায় অনুশীলন না হয় তবে কীভাবে সম্ভব শতভাগ রিডিং দক্ষতা সম্পূর্ণ করা? পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের যখন বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা করি তখন দেখি প্রায় সময়ই অনুপস্থিত। হোমভিজিট, উঠান বৈঠক সবটা করার পরও যখন সেই শিশু নানা সমস্যার কারণে বিদ্যালয়ে আসতে পারে না তখন দায়টা ঠিক কার? একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি একটি প্রজন্মের মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও মানবিকতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। আর এতে শাসন আদর দুটোর ভূমিকায় থাকে। শিক্ষকের মর্যাদা, শিক্ষার্থীর অধিকার এবং আইনের শাসন এই তিনটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি ও সত্য যে, শাসনের নামে কোনো ধরনের শারীরিক শাস্তি, অপমান বা মানসিক নির্যাতন গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্বের সফল শিক্ষা ব্যবস্থাগুলো আমাদের শেখায় যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, স্পষ্ট নীতিমালা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে, সেখানেই একটি নিরাপদ ও কার্যকর শিক্ষা পরিবেশ গড়ে ওঠে। তাই শুধু শিক্ষক নয়, সচেতন হতে হবে প্রতিটি অভিভাবকদেরও।












