নোবেলজয়ী তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিভেন ওয়েইনবার্গ, যাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। স্টিভেন ওয়েইনবার্গের নাম আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লেখা থাকবে। ১৯৭৯ সালে আবদুস সালাম ও শেলডন গ্ল্যাশোরের সঙ্গে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮২ সালে অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর জীবনের শেষভাগ পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
যদিও বহু বছর আগে তাঁর ক্লাসের একজন শিক্ষার্থী ছিলাম কিন্তু সেই সময়ের আরো অনেক শিক্ষকের স্মৃতির ভিড়ে তাঁকে নিয়ে একটি বিশেষ ঘটনা বারে বারে ফিরে আসে মনের আঙিনায়।
২০০১ সালের ৯/১১ দিনটি ছিলো সবার জন্য একটি অবিশ্বাস্য বিভীষিকাময় দিন, কিন্তু ২৫ বছর পরেও সেই ভয়াবহ দিনটির কথা মনে করতে গেলেই তাঁর মুখটি আমার স্মৃতিতে ফিরে আসে। সেই দিনের অসংখ্য দৃশ্যের মধ্যে তাঁর শান্তভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করা, ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়ানো এবং যথারীতি কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্যটিই সবচেয়ে জলজ্যান্তভাবে প্রতীয়মান হয়ে উঠে।
২০০১ সালে তাঁর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্লাস করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এমন একটি বিষয়, যেখানে আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক যুক্তি প্রায়ই অচল হয়ে যায়। মজার ছলেই হয়তো প্রথম ক্লাসে বলেছিলেন যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ জানলেই তাঁর ক্লাসের পড়া বোধগম্য হবে। বাস্তবিক অর্থেই এই কঠিন বিষয়টি ওয়েইনবার্গ পড়াতেন অত্যন্ত পরিষ্কার, সংযত ও যুক্তিনিষ্ঠ ভঙ্গিতে। ব্ল্যাকবোর্ডে সমীকরণ লিখতেন, প্রতিটি ধাপের পেছনের যুক্তি ব্যাখ্যা করতেন এবং আমাদের শুধু সূত্র মুখস্থ করতে নয়, তার অন্তর্নিহিত অর্থ ও বৃহত্তর তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বুঝতে উৎসাহিত করতেন। একজন আপাদমস্তক পদার্থবিদের আড়ালে তাঁর মধ্যে যেনো একজন দার্শনিকের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতাম। তাঁর শিক্ষকতার একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করত। তিনি কখনো কঠিন বিষয়কে কৃত্রিমভাবে সহজ করে তুলতেন না। বরং তিনি ধরে নিতেন যে শিক্ষার্থীরা চিন্তা করতে সক্ষম এবং সেই চিন্তাকে একটু একটু করে গভীরতার দিকে নিয়ে যেতেন। একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হয়েও তাঁর মধ্যে আত্মপ্রদর্শনের কোনো ছাপ দেখিনি। তাঁর কাছে যেন বিজ্ঞানীর নিজের কৃতিত্বের চেয়ে সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পদার্থবিজ্ঞানের বাইরেও দর্শন, রাজনীতি, সমাজ ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ে নিয়মিত লিখতেন–সেই সব লেখনী আমাদের চিন্তাধারাকে ঋদ্ধ করেছে।
এবার ফিরে আসি সেই ৯/১১র মঙ্গলবার সকালে। সেদিন ছিল আমাদের নিয়মিত সকাল নয়টার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্লাস। সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানে–ওয়েইনবার্গ শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার মাত্র কয়েক মিনিট আগে। তখনো ছিল স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সর্বক্ষণিক ইন্টারনেটের আগের পৃথিবী। ক্লাসরুমের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে বাইরের পৃথিবী থেকে আমরা প্রায় বিচ্ছিন্নই থাকতাম। কিন্তু সেদিন এক শিক্ষার্থী ক্লাসে ঢোকার সময় সঙ্গে নিয়ে এসেছিল ছোট একটি রেডিও। তার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম–আমেরিকায় ভয়াবহ কিছু একটা ঘটছে যার ধারাবিবরণী সে রেডিওতে শুনছে। আমরা বিশ্বাস করবো কী করবোনা এই নিয়ে ক্লাসরুমে চাপা গুঞ্জন, কিছু ছাত্র ডেস্ক থেকে উঠে বের হয়ে যাবে কীনা ইতস্তত করছে, বেসমেন্টের লাইব্রেরিতে গিয়ে কম্পিউটারে খবরের সত্যতা যাচাই করার জন্য। এই কোলাহলের মধ্যেই ড. ওয়েইনবার্গ শ্রেণিকক্ষে এলেন।
এখানে বলে রাখি তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিউইয়র্কে। তাই সেই মুহূর্তে তাঁর নিজের পরিবার, বন্ধু কিংবা পরিচিতদের কথা মনে পড়েছিল কি না, আমরা জানি না। কিন্তু তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্বেগ আমাদের সামনে প্রকাশ করলেন না। কোনো নাটকীয় বক্তব্য নয়, কোনো বিশেষ ঘোষণা নয়–তিনি যথারীতি ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়ালেন এবং ক্লাস শুরু করলেন। ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ লিখলেন, নির্ধারিত পাঠ পড়ালেন এবং শেষে যথারীতি জিজ্ঞাসা করলেন, কোনো প্রশ্ন আছে কি না। তারপর নীরবে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সেদিন তিনি কী পড়িয়েছিলেন, আজ আর মনে নেই। কিন্তু তিনি কীভাবে পড়িয়েছিলেন, এবং সেই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেকে সংযত রেখেছিলেন সেটি ভুলিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝেছি, সেদিনের ঘটনাটি কেন এত গভীরভাবে আমার মনে রয়ে গেছে। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে ওয়েইনবার্গের মহত্ত্ব তাঁর আবিষ্কার ও তত্ত্বে। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তাঁর মহত্ত্বের একটি ঝলক আমি দেখেছিলাম সেই শ্রেণিকক্ষে। পৃথিবী যখন হঠাৎ করে অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, তখনও তিনি তাঁর দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। একনিষ্ঠভাবে আমাদের পাঠদান করে গিয়েছেন যা আমার কাছে অভাবনীয়। একইভাবে ৯/১১–এর সেই দিনটি আরও অসংখ্য মানুষের কর্তব্য ও আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করে। ২,৯৭৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন যাঁদের অনেকেই কর্মস্থলে স্বাভাবিক দিনের মতো নিজেদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। আর অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ কর্মকর্তা, জরুরি উদ্ধারকর্মীসহ অসংখ্য মানুষ বিপদের ঝুঁকি জেনেও অন্যদের জীবন বাঁচাতে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁরা জানতেন না যে সেদিন তাঁদের স্বাভাবিক কর্মদিবসই তাঁদের জীবনের শেষ দিন হয়ে উঠবে।
এই কারণেই ৯/১১–এর স্মৃতি আমার কাছে ওয়েইনবার্গের সেইদিনে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্লাসের সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা– আমি যেন দুইয়ের মাঝে একটি গভীর সাযুজ্য খুঁজে পাই তা হলো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের দায়িত্বে অবিচল থাকার সেই জীবনদর্শন যা চিরতরে মনে গেঁথে গেছে। একজন মহান বিজ্ঞানী হওয়া এক বিষয়, কিন্তু তা ছাপিয়ে একজন অনুকরণীয় আদর্শ হওয়া বিরল। আমার সৌভাগ্য যে তাঁর এই দুটো দিকই খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাই স্টিভেন ওয়েইনবার্গ থেকে শেখা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটিল সূত্রগুলি সময়ের ধুলোয় মলিন হয়ে গেলেও সবকিছু ছাপিয়ে একজন কর্তব্যনিষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে সেই ৯/১১’র মঙ্গলবার সকালে যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, সেটি আমার স্মৃতিতে চির সমুজ্জ্বল।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী ও গবেষক












