টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম জেলায় এ পর্যন্ত ৩৩ হাজার ৬৭৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৫ জন, আহত হয়েছেন ৫ জন। গতকাল রাতে জেলা প্রশাসন থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদে রাখতে জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে ১ হাজার ২২২ জন মানুষ অবস্থান করছে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ২১০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৭ লাখ ৪১ হাজার টাকা মজুত রয়েছে বলেও জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়।
জেলা প্রশাসন জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা (এসওডি) অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জরুরি সভা সম্পন্ন হয়েছে। সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরের চিহ্নিত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ টিম এবং প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিন–রাত কাজ করছেন। এদিকে গতকাল রাতে নগরীতে পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। স্থানীয়দের সাথে কথা বলার পাশাপাশি তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে শিশু, নারী ও বয়স্কদের হাতে শুকনো খাবার তুলে দিয়েছেন। গত প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের জেরে গতকাল রাতে লালখান বাজার সংলগ্ন পোড়া কলোনির ওয়াইডব্লিউসিএ কমিউনিটি স্কুল আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক। তার সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত ১৬০ জন মানুষের মাঝে রাতের খাবার, মুড়ি, চিড়া, গুড়, কেক, বিস্কুট, বিশুদ্ধ মিনারেল ওয়াটার ও ওরস্যালাইন বিতরণ করা হয়। জেলা প্রশাসক নারী, শিশু ও প্রবীণদের খোঁজখবর নেন এবং উপস্থিত স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। এর আগে মঙ্গলবার আকবরশাহ এলাকার ১ নম্বর ঝিল, ২ নম্বর ঝিল, ৩ নম্বর ঝিল, বিজয়নগর ও শান্তিবাগ (পানির ট্যাংক এলাকা) পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ তদারকি করেন তিনি।
আশ্রয়কেন্দ্রে উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, গত প্রায় চার দিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি স্বাভাবিক হলেও এবার বৃষ্টিপাত গত প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, ‘সবার আগে আপনার জীবন, আপনার সন্তানের জীবন। আমরা এই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। পাহাড় ধস হলে ঘরবাড়ি আবার বানানো যাবে, কিন্তু একটি প্রাণ চলে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না।’ দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কষ্টের কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, তিনি জানেন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার কারণে অনেকের কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই কষ্ট সাময়িক। অসতর্ক হলে একটি বড় দুর্ঘটনায় মূল্যবান জীবন হারাতে হতে পারে। তিনি আশ্রিতদের উদ্দেশে বলেন, এখানে থাকতে হয়তো কিছুটা কষ্ট হবে। কিন্তু সুন্দরভাবে বাঁচতে এই কষ্ট আমাদের মেনে নিতে হবে। আপনারা কেউ রাতের বেলা ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ফিরবেন না। এই বৃষ্টিতে কখন পাহাড় ধস হবে, কেউ বলতে পারে না। ঘুমিয়ে থাকতেই মাটি আপনার ওপর নেমে আসতে পারে। জেলা প্রশাসক বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে যেকোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। খাবারের কোনো সংকট হবে না। সবাই একটু ধৈর্য ধরুন। এই পরিস্থিতি কেটে গেলে আবার আপনারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, সোমবার রাত থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। আগাম সতর্কতা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ের উপস্থিতির মাধ্যমে সম্ভাব্য পাহাড় ধসে প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনাই এখন জেলা প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।












