চট্টগ্রাম নগরী দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বাড়ছে জনসংখ্যা, যাতায়াত এবং ব্যক্তিগত ও গণপরিবহনের চাপ। ফলে ব্যস্ত সড়কগুলোতে যানজট এখন নিত্যদিনের সমস্যা। কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীসহ সবাই এর ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।
শুধু সড়ক সমপ্রসারণ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। যানজট নিরসনে সকাল ও বিকেলের পিক–আওয়ারের ট্রাফিক প্রবাহ সচল রাখতে একটি পরিকল্পিত ‘সকাল–বিকাল সময়ভিত্তিক ওয়ান–ওয়ে’ (One-Way Traffic Management system) চালু করা যেতে পারে। প্রয়োজন সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা, যেখানে রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই পরিকল্পনার একটি বাস্তবধর্মী উদ্যোগ হতে পারে পাহাড়তলী রেলস্টেশনে আরেকটি প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ।
কেন পাহাড়তলী? পাহাড়তলী চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ রেল এলাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ও এখানে অবস্থিত। বর্তমানে হালিশহর, পাহাড়তলী, কাট্টলী, খুলশীসহ পশ্চিম ও উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা আন্তঃনগর ও অন্যান্য ট্রেন ধরতে প্রধানত চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে যান। ফলে ট্রেনে ওঠার আগেই তাদের ব্যস্ত সড়কের যানজট পেরোতে হয়। পাহাড়তলী স্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এসব এলাকার যাত্রীরা কাছাকাছি স্থান থেকে রেলসেবা নিতে পারবেন। তবে শুধু প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ যথেষ্ট নয়। ট্রেনের স্টপেজ, সময়সূচি, রেললাইনের সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার সমন্বিত পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
যানজট কমাতে রেল হতে পারে কার্যকর বিকল্প চট্টগ্রাম বন্দরনগরী ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করেন। ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহন বাড়ায় সড়কের ওপর চাপও বাড়ছে।
নগরের একটি অংশের যাত্রীকে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবার আওতায় আনা গেলে সড়কের চাপ কমানো সম্ভব। এজন্য স্টেশনভিত্তিক যাত্রীসেবা, নিরাপদ প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা, সংযোগ সড়ক, পার্কিং এবং অন্যান্য ইন্টারমোডাল সুবিধার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী প্ল্যাটফর্ম সমপ্রসারণ করতে হবে।
নগর ও আঞ্চলিক রেল নেটওয়ার্ক উন্নত হলে পতেঙ্গা ও শহরের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে হাটহাজারী, নাজিরহাট, বোয়ালখালী, পটিয়া ও দোহাজারীর সংযোগও আরও কার্যকর হতে পারে। এতে সড়ক ও রেলের সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
একটি অতিরিক্ত প্ল্যাটফর্ম কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পাহাড়তলী স্টেশনে আরেকটি প্ল্যাটফর্মকে শুধু অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমে যাবে। এটি হওয়া উচিত চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিবহন পরিকল্পনার অংশ।
অতিরিক্ত প্ল্যাটফর্ম থাকলে ট্রেন পরিচালনায় নমনীয়তা বাড়বে, যাত্রী ওঠানামা সুশৃঙ্খল হবে এবং ভবিষ্যতে নতুন সেবা চালুর সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের সঙ্গে নতুন ট্রেন বা অতিরিক্ত স্টপেজের পরিকল্পনাও যুক্ত করতে হবে।
এর আগে কারিগরি সমীক্ষায় নির্ধারণ করতে হবে যাত্রী চাহিদা কত, কোন রুটের যাত্রীরা উপকৃত হবেন, রেললাইনের সক্ষমতা কতটুকু, সিগন্যালিং ও অপারেশনে কী পরিবর্তন দরকার এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে নতুন প্ল্যাটফর্ম কীভাবে যুক্ত হবে।
রেল যোগাযোগ হোক মাস্টারপ্ল্যানের অংশ: আধুনিক নগর শুধু প্রশস্ত সড়ক দিয়ে গড়ে ওঠে না। প্রয়োজন এমন সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা, যেখানে সড়ক, রেল ও অন্যান্য গণপরিবহন পরস্পরের পরিপূরক হবে।
চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রেল যোগাযোগকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। চউকের মাস্টারপ্ল্যান–সংক্রান্ত কার্যক্রমেও উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ, নীতিনির্ধারণ ও বিভিন্ন Action Area Plan–এর কথা উল্লেখ রয়েছে।
ভবিষ্যৎ মাস্টারপ্ল্যানে গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনগুলোকে কেন্দ্র করে Transit-oriented planning বিবেচনা করা যেতে পারে। কোথায় যাত্রী বেশি, কোথায় নতুন স্টপেজ বা প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন এবং কোন স্টেশনকে নগর গণপরিবহনের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব এসব বিষয় একই পরিকল্পনায় আনতে হবে।
সময়ের দাবি–কারিগরি সমীক্ষা ও সমন্বিত উদ্যোগ: পাহাড়তলী স্টেশনে আরেকটি প্ল্যাটফর্মের দাবি শুধু স্থানীয় সুবিধা বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি চট্টগ্রামের পরিবহনব্যবস্থাকে ভারসাম্যপূর্ণ করার প্রস্তাব।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সম্ভাব্যতা ও কারিগরি সমীক্ষা করতে পারে। এতে যাত্রী চাহিদা, ট্রেন পরিচালনা, অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং যানজটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা উচিত। প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হলে পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
চউকের কাছে একটি প্রত্যাশা : চট্টগ্রামের নতুন নগর পরিকল্পনা শুধু ভবন, সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের সময়, স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিক এটাই নগরবাসীর প্রত্যাশা।
ভবিষ্যৎ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের উদ্যোগ নিতে পারেন। পাহাড়তলী স্টেশনে আরেকটি প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই হতে পারে সেই উদ্যোগের সূচনা।
চট্টগ্রামের উন্নয়ন এবং নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সময়সাশ্রয়ী যাতায়াতের স্বার্থে বিষয়টি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত।
আজকের পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত আগামী দিনের চট্টগ্রামের পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত, জনবান্ধব ও কার্যকর করতে পারে। পাহাড়তলী রেলস্টেশনে আরেকটি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীতা আমাদের কাছে শুধু অবকাঠামো নয়; এটি যানজটকবলিত নগরীতে রেলনির্ভর বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সংগঠক।











