বন্ধুর পথ, তবুও আমরা অগ্রসর হচ্ছিলাম। কিন্তু এখন বোধহয় বিপজ্জনকভাবে পিছু হটছি। অন্যান্য অবস্থার প্রসঙ্গ এখানে আনছি না, এখানে নারীদের বিষয়ে ফোকাস করছি।
ইদানীং ব্যাপকহারে বাড়ছে বাল্যবিবাহ। চোখের সামনেই দেখলাম, ১৪/১৫ বছরের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। তারা বলছে, মেয়েদের নিরাপত্তা তলানিতে ঠেকেছে। অফলাইনে কিংবা অনলাইনে সর্বত্র নারী শিকার হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার, তাদের কথিত দুঃসহ পারাবারের পতিত হচ্ছে। না দেশ, না পরিবার, কেউ তাকে প্রটেক্ট করছে!
পুতুল গ্রামের মেয়ে। শীর্ণকায় শরীর হলেও অদম্য মনোবল। এবার এসএসসি ফেল করেছে। ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষায় সে বেহুশ হয়ে পড়ে গিয়েছিল। অপুষ্টির একটা শরীর এত লোড কী করে নিতে পারে! কেবল মায়ের সাপোর্টে তার পথচলা।
বাবা প্রবাসী ছিলেন, তখনও সেখানে জুয়া খেলে টাকা উড়াতেন। সন্তানদের খবর নেওয়ার কোনো দায় তার ছিল না। ভাইদের, সমাজের অল্প সাহায্যে তাদের দিনাতিপাত হতো।
বছরখানেক আগে দায়িত্বহীন পিতাটা প্রবাসে আগুনে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়ে দেশে ফিরে এলেন। চলৎশক্তিহীন একটা লোককে সুস্থ করতে পুতুলের মা সমাজের কাছে, আত্মীয়ের কাছে হাত পাতলেন। তাদের আর্থিক সাহায্য নিয়ে লোকটা উঠে দাঁড়াল। এখন বেশ সরবে বউকে মারে। এটা, ওটা, কত কী দোষ। বাচ্চাদের পড়াশোনা সে–দোষের মধ্যে সবচেয়ে বড়। দুটোই মেয়ে হওয়াতে তার নাকি অশান্তির কপাল।
১৬ আর ১২ বছরের মেয়েগুলো কত আর বড় হলো? তারা এ বয়সেই বুঝে গেছে, নারী হয়ে এই সংসারে তারা কত বড় বোঝা।
চারপাশে টিন দেওয়া ঘর। নতুন ভিটায় কোনো গাছ নেই। উত্তপ্ত সূর্যের তপ্ত তাপে তারা দগ্ধ হ’তে হ’তে স্বপ্ন দেখছে নতুন দিনের।
পুতুলের ইচ্ছে ছিল, এসএসসি পাস করতে পারলে ফ্রিল্যান্সিং করবে। তার ঝোঁক বেশি ক্রিয়েটিভ কাজে। সে ছবি আঁকতে পারে, ভালো মেহেদি পরাতে পারে, হ্যান্ড পেইন্ট দিয়ে টি–শার্ট ডিজাইন করে। এসব কাজের কোনো উপকরণ তার নেই। এর–ওর জন্য করে দিতে দিতে তার হাত পাকানো।
তার বাপ বলে, “গুনার হাম গরছদে, এতের লাই আরতুন বরহত নাই!” (পাপের কাজ করছ বলে আমার জীবনে বরকত নেই)। বাজি ধরে ছক্কা খেললে গুণাহ হয় না, বউ পেটালে গুণাহ হয় না তার।
পুতুলের বাপের চাষযোগ্য জমি আছে। সেখানে চাষ হয় কখনো ধান, কখনো সবজি বা মরিচ। কখনো তারা পাহাড়ে পারিবারিক গাছ বেচে টাকা পায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এসব ইনকামের কোনো সুফল তাদের সন্তানদের ওপর পড়েনি।
তারা সারা মাসে একদিন বা দুদিন মাছ–মাংস খাওয়ার সুযোগ পায়। তাদের বাপ বলে, “সবজি খাবি আর পেট ভরে ভাত খাবি।” দশবার অনুরোধ করলে একবার বাজার করে, নিজে ঠিকই তিনবেলা ভাত খেতে বসে যাবে। তরকারি আছে কি না বা জ্বালানি আছে কি না, খবর নেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
কেবল মুরগির মাংস খাওয়ার বায়না করেছিল ছোট মেয়েটি। বাপের কাছে আবদারটি ছিল সীমাছাড়া। সে স্ত্রী ও দুই কন্যাকে সমানে পেটালেন, পুরো পাড়ার মানুষের সামনে।
পুতুলের মা নিজের মেয়েদের বলছেন, “বিষ খেয়ে মরে গেলে বাঁচবি।”
পুতুল বিষ খাবে না। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এমন যে, সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। এমনকি অত্যাচারী পিতাকে বুঝিয়ে দেবে, সে বোঝা নয়। কষ্ট করে নুন–ফেন যা খাওয়াচ্ছে, তার শোধ সে করে দেবে।
সারা শরীরে কালশিটে দাগের দিকে তাকিয়ে সে কেবল সামনে যেতে চায়। তার খুব সাজগোজের লোভ। নিজের কিছু নেই, তাই অন্যকে সাজিয়ে আনন্দ পায়।
পাড়ার নাটকে অভিনয় করে, বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। সবাই বলে, পুতুলের অনেক মেধা। সে সুযোগ পেলে বহুদূর যাবে।
তার মা বলে, “তুই পারিবি, আরে, এ জেলখানার তুন বাঁচাইত।” (তুই পারবি, আমাকে এই জেলখানা থেকে বাঁচাতে।)
শীর্ণ, অপুষ্ট শরীরে এ রুগ্্ণ দেশের কোন পথে তার সমৃদ্ধি আসবে?
পুতুলের একটাই শান্তি, অন্তত তার মা তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য লেগে পড়েননি। কে জানে, তার বাপের কোনোদিন সাধ জাগে, মেয়ের একটা বিয়ে দিয়ে দিই!












