চামড়া শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় দেশের সব বন্ধ ট্যানারি পুনরায় চালুর দাবিসহ ৭ দফা দাবি পেশ করেছেন চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির নেতারা। গতকাল শনিবার বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির নেতারা বলেন, কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকদের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা বিশ্বাসের অভাব, সরকার–নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করা এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক ক্ষতির কারণে চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়ার ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, বারবার লোকসান ও পুঁজি ক্ষয়ের কারণে বিগত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। একসময় এই বন্দরনগরীতে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ জন ব্যবসায়ী কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকলেও এখন এই ব্যবসায় মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জন সক্রিয় রয়েছেন। তিনি আরও বলেন যে, সমিতির ১১২ জন সদস্যের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি বছর ঈদের আগে লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও ট্যানারি মালিকরা কোরবানির পরে চামড়া কেনার সময় সরকার ঘোষিত দামের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে চামড়া কেনেন। ঈদের আগে সরকার ঘোষিত দাম কোরবানির পরে প্রকৃত বাজারে প্রতিফলিত হয় না। ফলে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ঋণ নেওয়া অনেক ব্যবসায়ী ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে না পেরে পরবর্তীতে দেউলিয়া হয়ে যান। কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ট্যানারি মালিকদের কাছে প্রায় ২০ কোটি টাকার বকেয়া এখনও অপরিশোধিত রয়েছে।
কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির ব্যবসায়ীরা বলেন, ঈদের মৌসুমে লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার জন্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম বৃহত্তম বাজার হিসেবে থাকে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ চামড়ার লেনদেন হয়। তবে পর্যাপ্ত স্থানীয় ট্যানারির অভাবে বেশিরভাগ চামড়াই ঢাকায় পরিবহন করতে হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের পর তারা তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হন, কারণ ঢাকার প্রধান ক্রেতারা প্রায়শই চামড়া কিনতে চট্টগ্রামে আসেন না।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের মদিনা ট্যানারিসহ দেশের সব বন্ধ ট্যানারি পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে আরও বেশি স্থানীয় ট্যানারিকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ পেতে সহায়তা করার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সমিতির মতে, বর্তমানে দেশে মাত্র পাঁচটি ট্যানারির এলডব্লিউজি সনদ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ, অ্যানথ্রাঙ এবং পঙ–সম্পর্কিত সংক্রমণসহ গবাদি পশুর বিভিন্ন রোগ চামড়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট করছে এবং এর গুণমান কমিয়ে দিচ্ছে, যা এই শিল্পের আরও ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এ ধরনের রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকাদান ও চিকিৎসা কর্মসূচি জোরদার করতে তারা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানিয়েছেন।
নেতারা সরকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠনেরও দাবি জানিয়েছে, যা যৌথভাবে কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করবে এবং ঈদের পর সেই হারের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। চামড়ার মান সংরক্ষণে জনসাধারণকে ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে ব্যবসায়ীরা পরামর্শ দিয়েছেন, কোরবানির পরপরই চামড়ায় লবণ মাখাতে এবং কেবল অনুমোদিত ব্যবসায়ী বা গুদামেই তা বিক্রি করতে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, যথাযথ পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দেশের চামড়া খাত তার হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন সমিতির সহ সভাপতি সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান, সহ সাধারণ সম্পাদক মো. জাহেদুল আলম সোহেল, অর্থ সম্পাদক মো. আইয়ুব খান।














