বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, তখনই দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশ গড়ার যে স্বপ্ন তারেক রহমান দেখিয়েছেন, সেটা গড়ার কাজ চলছে। এটার জন্য সময় লাগবে। এসময় বিএনপি গর্তে নিমজ্জিত ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে সরকার গঠন করেছে জানিয়ে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার, পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বেকার সরকার আমি বলি, তারা মিলে যেই গর্তের মধ্যে ফেলেছে, আজকে আমরা যেখানে আছি, আবার সেই গর্ত থেকে আমাদেরকে উঠে আসার জন্য সবাই মিলে কাজ করতে হবে। ওই গর্ত থেকে উঠে আসতে একটু সময় লাগবে, কিন্তু কাজ করলে এই বিএনপি পারবে। এই দলই পারবে, তারেক রহমান পারবেন। তিনি গতকাল বিএনপির ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নগরের পুরাতন রেলস্টেশন চত্বরে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য এসব কথা বলেন।
এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম–৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এমপি–এর সভাপতিত্বে সমাবেশ পরিচালনা করেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান।
সমাবেশ শেষে পুরাতন রেলস্টেশন চত্বর থেকে র্যালিটি নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে লালদীঘি চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। র্যালিতে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির বিভিন্ন ওয়ার্ড, থানা, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বীরশ্রেষ্ঠদের এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের ছবি সংবলিত ব্যানার–ফেস্টুন নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় নেতাকর্মীদের ব্যাপকউপস্থিতিতে র্যালিটি বর্ণাঢ্য রূপ নেয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু বলেন, দেশের উন্নয়নের পথে যারা বাধা সৃষ্টি করতে চায়, বাংলাদেশের মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না। মানুষ অনেক কষ্ট করে একটি রাজনৈতিক সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। অনেক কষ্টের পর অনেক ত্যাগের বিনিময়ে একটি নির্বাচন হয়েছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে একটি নির্বাচিত সংসদ হয়েছে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে নির্বাচিত সরকার হয়েছে।
খসরু বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে পরিপূর্ণভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা। সরকার সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সরকারকে সহায়তা করতে হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত কাজ আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্পন্ন করছেন। অপশক্তি বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে। কিন্তু সেটা আমরা করতে দিতে পারি না। সবাই ভালো থাকব। দেশ ভালো থাকবে। এজন্য আমরা এত ত্যাগ স্বীকার করেছি। পাঁচ বছর পর বিশ্বের সামনে একটি নতুন বাংলাদেশ আমরা উপহার দিতে পারব ইনশাল্লাহ।
আমির খসরু এলাকায়–এলাকায় চাঁদাবাজ, দখলদার ও মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পুলিশের জন্য বসে থাকবেন কেন? আমরা কি চিনি না আমাদের এলাকায় কারা মাদকের ব্যবসা করে? তাহলে পুলিশের জন্য অপেক্ষা করব কেন? মাদক ব্যবসায়ী যারা আছে পুলিশের হাতে তুলে দিন। এলাকায় যারা চাঁদাবাজি করে দখলদারি করে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কাজ করছে। তিনি দেশের মানুষের স্বার্থে যে বিশাল অংকের বাজেট দিয়েছেন, ইনশাআল্লাহ তারেক রহমানের সরকার সেই বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেবে।
আমীর খসরু বলেন, বাংলাদেশ যখনই কঠিন কোনো সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, বিএনপি তখন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেই সংকট থেকে দেশকে বের করে আনার চেষ্টা করেছে। বর্তমান সময়েও আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে। দল ও দেশের মধ্যে দেশের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাদের সেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন। মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াও তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেই আদর্শকে ধারণ করেছেন। সেই রাজনৈতিক শিক্ষা ও আদর্শকে সামনে রেখে একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও জনগণের কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, আজকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যেমন আনন্দের, তেমনি বেদনারও। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন–সংগ্রামে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন, কেউ শহীদ হয়েছেন, কেউ খুন হয়েছেন, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের ত্যাগের কারণেই আজ আমরা একটি প্রতিবন্ধকতামুক্ত পরিবেশে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র্যালি ও সমাবেশ করতে পারছি। তাই এই দিনে তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে। বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র মানেই তারেক রহমানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র। তাই দেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যেকোনো ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়েছিলেন। সেই আদর্শ ও কর্মসূচিকে ধারণ করেই বিএনপির দীর্ঘ পথচলা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে দলের নেতাকর্মীদের ত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করে আগামী দিনের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আরও দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চের প্রতি ইঙ্গিত করে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বললেন, শুনছি পাঁচ তারিখ নাকি এক হাজার গাড়ি নিয়ে একটা র্যালি হবে। কিসের বিরুদ্ধে র্যালি হবে? বলে দেশে তেল নাই গ্যাস নাই কিছু নাই। এক গাড়িতে যদি ২০০ লিটার তেল লাগে তাহলে এক হাজার গাড়িতে ২ লাখ লিটার তেল লাগবে। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির হিপোক্রেসি। অন্তরে এক আর মুখে চায় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে। মনে রাখবেন, তারেক রহমানকে পাঁচ বছরের জন্য ম্যান্ডেট দিয়েছে এদেশের জনগণ। সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধান আমরা এই সময়ের মধ্যে করব।
মীর হেলাল বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাদের দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অটল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী রাজনীতির যে ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়ার সেই রাজনৈতিক দর্শন আজও বিএনপির নেতাকর্মীদের পথ দেখায়। তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমাদের প্রত্যয় হতে হবে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধারণ করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা। দলের নেতাকর্মীদের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বিএনপির প্রত্যেক নেতাকর্মীকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে চট্টগ্রামে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি সফল ও বর্ণাঢ্য হয়েছে। আগামী দিনেও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও দেশ গঠনের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় বিএনপির শ্রম বিষয়ক সম্পাদক এস এ নাজিম উদ্দীন, বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য আলহাজ্ব শামসুল আলম, সাঈদ আল নোমান এমপি এবং মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর।












