উচ্চতর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা সরকারের । বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক, সার্ভার, অ্যাপ্লিকেশনসহ ডিজিটাল অবকাঠামো ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে

হাসান আকবর | বুধবার , ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ

দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো (ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচারসিআইআই) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। এর ফলে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো এখন জাতীয় পর্যায়ের উচ্চতর সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় এসেছে। বন্দরের ডিজিটাল ব্যবস্থায় সাইবার হামলা, তথ্য চুরি, অননুমোদিত প্রবেশ কিংবা বড় ধরনের কারিগরি বিঘ্ন ঘটলে তা মোকাবিলায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি, নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট, ঝুঁকি মূল্যায়ন, দুর্বলতা পরীক্ষা, অনুপ্রবেশ পরীক্ষা এবং তথ্যের এনক্রিপ্টেড ও অফলাইন ব্যাকআপের মতো ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

৩১ আগস্ট তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬এর ১৫ ধারার আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সিআইআই ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনটি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। এতদিন দেশের ৩৬টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। নতুন করে চট্টগ্রাম বন্দরকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ফলে জাতীয় অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর একটি সরাসরি উচ্চতর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় এলো।

সূত্র বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম শুধুমাত্র জেটি, ইয়ার্ড, ক্রেন কিংবা জাহাজ চলাচলের ভৌত অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাহাজের আগমনবহির্গমন, কন্টেনার হ্যান্ডলিং, কার্গো হ্যান্ডলিং, বিলিং, ডকুমেন্টেশন, শুল্ক ও রাজস্বসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া, আমদানিরপ্তানির তথ্য, বন্দর ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন সেবা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর বন্দরের প্রতিদিনের কার্যক্রম বহুলাংশে নির্ভরশীল। ফলে এসব সিস্টেমে বড় ধরনের সাইবার হামলা হলে এর প্রভাব শুধু বন্দরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, দেশের আমদানিরপ্তানি, শিল্প উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর অভিঘাত পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বন্দর মূলত একটি ডিজিটাল অবকাঠামো নির্ভর অপারেশনাল ব্যবস্থা। একটি বন্দরের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে জাহাজের কার্গো অপারেশন, কন্টেনারের অবস্থান নির্ধারণ, পণ্য খালাস, বিলিং ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরগুলোতে সাইবার নিরাপত্তাকে এখন অপারেশনাল নিরাপত্তারই অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরকে সিআইআই ঘোষণা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

এই ঘোষণার ফলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমগুলোতে উচ্চতর সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নিজস্ব সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার (এসওসি) এবং সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (সিআইআরটি) পরিচালনা। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক, সার্ভার, অ্যাপ্লিকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল অবকাঠামো ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে। কোনো অস্বাভাবিক কার্যক্রম, সাইবার আক্রমণের চেষ্টা বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘটনা শনাক্ত হলে তা দ্রুত বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে জানিয়ে বন্দর সূত্র বলেছে, একই সাথে বন্দরের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের তথ্য পরিকাঠামোর বার্ষিক নিরাপত্তা নিরীক্ষা করতে হবে। অডিটের ফলাফল নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে হবে। সাইবার নিরাপত্তার জন্য নিয়মিতভাবে সিস্টেমের নিরাপত্তা সক্ষমতা যাচাই এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংশোধন করতে হবে।

বন্দরের ডিজিটাল ব্যবস্থার ঝুঁকি নিরূপণ, ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট (ভিএ) এবং পেনিট্রেশন টেস্টিং (পিটি) নিয়মিত করতে হবে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো সিস্টেমে দুর্বলতা রয়েছে কি না, বাইরের কোনো পক্ষ সেই দুর্বলতা ব্যবহার করে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করতে পারে কি না এবং সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর তা যাচাই করা হবে।

এই উদ্যোগের ফলে তথ্যের এনক্রিপ্টেড এবং অফলাইন ব্যাকআপ সংরক্ষণ করা হবে। কোনো সাইবার হামলার মাধ্যমে তথ্য নষ্ট, পরিবর্তন বা জিম্মি হয়ে গেলেও যাতে মূল তথ্য সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে না যায়, সে জন্য বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিজনেস কন্টিনিউটি প্ল্যান (বিসিপি) এবং ডিজাস্টার রিকভারি (ডিআর) ব্যবস্থা তৈরি ও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। বড় ধরনের সাইবার হামলা বা প্রযুক্তিগত দুর্যোগের পরও যাতে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় চালু করা যায়, সেই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

সিআইআই হিসেবে ঘোষণার পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি (এনসিএসএ) এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা অপারেশন সেন্টারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও প্রতিবেদন বিনিময় করতে হবে। কোনো উল্লেখযোগ্য সাইবার নিরাপত্তার ঘটনা ঘটলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও নিরাপত্তা নিরীক্ষায়ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে।

সিআইআইয়ের নিরাপত্তা বিধান লঙ্ঘন কিংবা অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করে সূত্র বলেছে, সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী এ ধরনের কর্মকাণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোতে অননুমোদিত প্রবেশের বিরুদ্ধে আইনগত সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে।

বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম জানিয়েছেন, সিআইআই ঘোষণার প্রক্রিয়ার আগে নির্ধারিত মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে অগ্রসর হতে হয়েছে। ওই মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটিকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এরই মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ ডেডিকেটেড সাইবার নিরাপত্তা টিম গঠন, তথ্য পরিকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি তৈরি, নিরাপত্তা নীতিমালা হালনাগাদ এবং কর্মকর্তাকর্মচারীদের নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের কার্যক্রম শুরু করেছে।

বন্দরের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর মালিকানা ও পরিচালন দায়িত্ব আগের মতোই বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। তবে এখন এসব গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম জাতীয় পর্যায়ের উচ্চতর সাইবার নিরাপত্তা তদারকি ও নির্ধারিত নিরাপত্তা মানদণ্ড পরিপালনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

এ সুরক্ষার ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সার্ভার বা কম্পিউটার ব্যবস্থার পাশাপাশি ডেটা সেন্টার, কমিউনিকেশন ব্যবস্থা, ডেটাবেজ, অ্যাপ্লিকেশন পর্যায়ের যোগাযোগ এবং এপিএল হাবের মতো আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল অবকাঠামোকেও এর আওতায় বিবেচনা করা হবে। ফলে বন্দরের সঙ্গে ডিজিটালভাবে সংযুক্ত বিভিন্ন সেবা ও অংশীজনের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে আমদানিরপ্তানিকারক, শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পণ্য পরিবহনকারী, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের বিশাল একটি নেটওয়ার্ক। বন্দরের ডিজিটাল সেবা যত বিস্তৃত হচ্ছে, এসব অংশীজনের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানের পরিমাণও তত বাড়ছে। ফলে একটি সিস্টেমের দুর্বলতা পুরো নেটওয়ার্কের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সিআইআই কাঠামোর অধীনে এই আন্তঃসংযোগের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত ও জাতীয় গুরুত্বের একটি সুস্পষ্ট স্বীকৃতি। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বন্দরের নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল কার্যক্রম নিশ্চিত করা জাতীয় দায়িত্ব। বন্দরের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু তথ্যপ্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে নয়, বন্দরের অপারেশনাল ধারাবাহিকতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেবাসমূহকে সুরক্ষিত রাখতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সাইবার হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করা হবে। এ লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে। বন্দরের স্বয়ংক্রিয় কন্টেনার ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, অনলাইন সেবা, তথ্য বিনিময় এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট পোর্ট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা সরাসরি যুক্ত। তাই সিআইআই ঘোষণা দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে সম্ভাব্য সাইবার বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত রাখার বড় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশের উন্নয়নে যারা বাধা সৃষ্টি করবে মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না