দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ
32

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বাসটি চলছিল। আমরা বসে আছি। বিশাল বাস। এক একজনের দখলে দুইটি করে আসন। আমরা যে যেখানে বসেছি সেখানের পাশের সিটও দখল করেছি। এরপরও বাসের পেছনের দিকে সিট খালি রয়েছে। বিশাল ট্যুরিস্ট বাসটিতে আমরা জনা বিশেক মানুষ। চরম আনন্দ নিয়ে আমরা পথ চলছিলাম। উৎসবের আবহ বাসের ভিতরে। লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের ইসামি ফোরামের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা লায়ন্স ক্লাবের নেতৃবৃন্দ বেড়াতে বের হয়েছি। ইসামি ফোরামের অনুষ্ঠানমালার বাইরে আমরা নিজেদের মতো করেও সময় কাটাচ্ছিলাম।
বাসের ভিতরে আমরা বসে আছি। পাশের সিটে মোবাইল রেখেছি। পানির বোতল টোতলও রাখা আছে কারো কারো। বাস তো নয়, যেন বিমানে চড়ছি। অবশ্য সিট বিবেচনায় নয়। বিমানের ইকোনমি ক্লাসের সিটের মতো বাজে জিনিস দুনিয়ার আর কোন বাহনে আছে বলে আমার মনে হয় না। এমনটি ট্রাকের সিটও এর থেকে ঢের আরামের। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসগুলোর এক একটি সিট তো যেন রাজকীয় বিছানা। আমাদের বহনকারী ট্যুরিস্ট বাসটির সিটও বেশ আরামদায়ক। তবে সবচেয়ে বড় যেই জিনিসটি আমার মন ভরে দিচ্ছিল তা হচ্ছে বাসটিতে কোন ধরনের নড়াছড়া ছিল না। একেবারে বিমানের মতো শূন্যে ভেসে বেড়ানোর মতো করে রাস্তায় ছুটছিল। থালার পিঠের মতো কিংবা নখের পিঠের মতো রাস্তা জীবনে বহু দেখেছি, কিন্তু দুবাই-আবুধাবী সড়ক যে সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে! পেট্রো ডলারের বদৌলতে গড়ে তোলা এক একটি রাস্তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রশস্ত। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মসৃণ বলেও আমার মনে হলো। বিশাল চওড়া রাস্তা ধরে বেশ ভালোই গতিতে এগুচ্ছিল বাস। কোন নড়াছড়া নেই। কোন ঝাকাঝাকিও। নখের পিঠের মতো রাস্তায় বাস জার্নি যে কত আয়েশী হতে পারে তা শুধু ইউরোপ আমেরিকায় নয়, দুবাইও তাদের নাগরিকদের দেখিয়ে দিয়েছে।
আমাদের বাস থেমে গেলো। নামতে বলা হলো আমাদের। আমাদের ট্যুর অপারেটর অথেনটিক ট্যুরিজমের লায়ন আনোয়ারুল আজিম এবং কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আমাদের সবাইকে অপেক্ষা করতে বলে কোথায় কোথায় যেন ফোন টোন করলেন। আমাদেরকে রাস্তার পাশে দাঁড়াতে বলা হলো। রাস্তার পাশেই ধু ধু মরুভূমি। নানা ধরনের কাঁটাজাতীয় গাছ রয়েছে। আমরা গাছের ছায়ায় দাঁড়ালাম। তীব্র গরম। মরুর বুক ছুঁয়ে আসা হাওয়া উষ্ণতা ছড়াচ্ছে।
ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়ে বেশ কয়েকটি প্রাডো টাইপের জীপ আসছিল। মরুর বুক ছিঁড়ে ধেয়ে আসার মতো। এক একটি গাড়ি যে পরিমাণ ধুলো উড়াচ্ছিল তাতে গাড়ির সামনের অংশটি দেখা গেলেও পেছনে কি আছে তা বুঝা যাচ্ছিল না। অবশ্য প্রতিটি গাড়ি আলাদা আলাদা রুট ধরে আসায় পৃথক পৃথক ধুলোর কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বড় কোন তাণ্ডবের শিকার হতে যাচ্ছি। পড়তে যাচ্ছি ভয়াল এক ধুলো ঝড়ের কবলে! তীব্র হর্ণ, সাইলেন্সারের বিকট আওয়াজ এবং ধুলো ঝড়ে পুরো এলাকাটিতে ভর করেছিল আতংক। কিন্তু আমাদের ট্যুর অপারেটর লায়ন আনোয়ারুল আজিমের চোখে মুখে রাজ্য জয়ের তৃপ্তি। দলের প্রতিটি সদস্যকে সন্তুষ্ট করতে পারার এক অনাবিল আনন্দ খেলা করছিল সেখানে।
দৈনিক আজাদী সম্পাদক লায়ন এম এ মালেক, লায়ন কামরুন মালেক, লায়ন রূপম কিশোর বড়ুয়াসহ দশজন অতি সিনিয়র লায়ন লিডারকে একটি মাইক্রোবাসে করে আনা হয়েছে। লায়ন্স ক্লারের অপরাপর সদস্যরাও হেথায় হোথায় অবস্থান করছি। আমাদের সবাইর অনেকটা স্বাস্থ্য পরীক্ষার মতো করে খোঁজ খবর নেয়া হলো। আমরা বেশি ভয় পাই কিনা, হৃদরোগ আছে কিনা, ভয়ে কলজে মুছড়ে উঠার মতো ঘটনা ঘটে টটে কিনাসহ আরো নানা বিষয়ের খোঁজ খবর নেয়া হলো। আমাদের শারীরিক সক্ষমতার উপরই পরবর্তী ব্যাপার স্যাপারগুলো নির্ভর করবে। অবশ্য লায়ন আনোয়ারুল আজিম বললেন, কেউ ভয়টয় পেলে বলে দেবেন। তাদেরকে আমরা বিকল্প পথে মরুর বুকে নিয়ে যাবো। তাদেরকে সাফারিতে যেতে হবে না। যাদের সমস্যা আছে কিংবা ভয় বেশি তাদেরকে সাধারণ গাড়িতে করে মরুভূমির বুকে পাঠিয়ে দেয়া হবে। ওখানে খাওয়া দাওয়াসহ বিনোদনের নানা ব্যবস্থা আছে। সাফারি না করলেও ওখানের বিনোদনের কোন সমস্যা হবে না। ঘাটতি পড়বে না।
দুরু দুরু বুকে অবস্থান করছিলাম। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। শারীরিক অসুস্থতা না থাকলেও ডরভয় নেই তা বলা যাবে না। কতকিছুতেই তো ভয় পাই। একটি বড় সাপ দেখলেও তো কলজে মুছড়ে উঠে। দুইটি গাড়ি পাল্লা দিয়ে ছুটলে অন্তর টিপ টিপ করে। সেক্ষেত্রে সাফারি করবো কিভাবে? জিনিসটিই বা কী!! কেমনে করে!!
আমার এডিটর স্যার দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক আমার দিকে তাকালেন। হাসলেন। বললেন, কি যাবে? বুঝতে পারলাম, স্যারের অভিজ্ঞতা আছে। স্যার আগেও সাফারি করেছেন। তাই বেশ মজা পাচ্ছেন। আমার স্যার যদি আটাত্তর বছর বয়সে সাফারিতে যেতে পারেন তাহলে আমি ‘না’ করি কি করে! তাছাড়া গতবারও এই সাফারির কথা খুব শুনেছিলাম। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দেশগুলোতে এই সাফারি অন্যতম জনপ্রিয় একটি বিনোদন। তবে গতবার সময়ের অভাবে আমি সাফারি উপভোগ করতে পারিনি। এবার সময় হলেও সকলে মিলে এমন ভয় লাগাচ্ছেন যে, কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।
সাফারি মানে শিকারের উদ্দেশে স্থলপথে অভিযাত্রা। এই শিকার কখনো নিজের জন্য, কখনো গোষ্ঠীর জন্য আবার কখনো বা অবকাশ যাপনে থাকা মানুষদের জন্য। অর্থাৎ শিকারের জন্য যেই যাত্রা তাকেই সাফারি বলা হয়। শিকার করতে যাওয়ার সময় নিজের শরীরের তাকদ কিংবা শক্তি প্রদর্শনের একটি ভাব হয়তো অতীতে ছিল। তাই যত ধরনের বাজেভাবে যাত্রা করা যায় তা হয়তো করা হতো। সেই ধারা বজায় রেখে বর্তমানে মরুর বুকে যাচ্ছেতাইভাবে যাত্রা করাকে সাফারি বলা হয়। মরুভূমির বালিয়াড়িতে বেসামাল গাড়ি চালানোর মাধ্যমে উচ্ছ্বসিত ভ্রমণকে ডেজার্ট সাফারি বলা হয়। ডেজার্ট সাফারিতে ফোর হুইল গাড়ি লাগে। চার পাঁচ হাজার সিসির অতি শক্তিশালী গাড়িগুলোর চার চাকা বালিয়াড়ির বুকে এমন আতংক ছড়িয়ে চলে যে, সুস্থ মানুষেরও নাকি হুশ হারানোর উপক্রম হয়। বহু বছর ধরে এই ডেজার্ট সাফারি চলে আসছে। আরব বিশ্বে এই ডেজার্ট সাফারির মতো জনপ্রিয় বিনোদন আরো কোনটিই নয় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
আমাদের দলের লোকজনদের জীপে তোলা হচ্ছিল। এক জীপে চারজন। যারা জীপে সাফারি করতে চাচ্ছেন না তাদেরকে লায়ন আনোয়ারুল আজিমের কাছে রিপোর্ট করতে বলা হলো। কয়েকজন ওদিকেও গেলেন। আমার এডিটর স্যার লায়ন এম এ মালেক, ম্যাডাম লায়ন কামরুন মালেক, লায়ন রূপম কিশোর বড়ুয়া এবং বৌদি একই জীপে চড়লেন। আমার স্যার গিয়ে বসলেন ড্রাইভারের পাশের সিটে। আমি লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী, লায়ন মীর্জা আকবর আলী চৌধুরী, লায়ন কামরুজ্জামান লিটন একই গাড়িতে বসলাম। আমাদেরকে শুধু সিট বেল্টই নয়, পারলে আরো দড়ি টড়ি দিয়েও যেন শক্ত করে বাঁধা হচ্ছিল। শুধু ফ্রন্ট সিটই নয়, মাঝের সিটের তিনজনকেও সিট বেল্ট দিয়ে বাঁধা হলো। লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী ভয়ে চোখ মুখ শক্ত করে আছেন। তিনি সিট বেল্টে বাঁধা পরার পরও যাবেন কি যাবেন না তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন।
হঠাৎ খেয়াল করে বুঝলাম যে, এতক্ষণ ড্রাইভিং সিটে আরব্য পোশাকে সুসজ্জিত চালক বাংলাদেশি। পুরোদস্তুর বাঙালি। বিশাল জুব্বার ভিতরে শরীর ঢুকিয়ে মাথায় রুমাল টুমাল বেঁধে তিনি আরব্য জগতের অভিজাত মানুষের ভাব নিলেও কার্যত তিনি কুমিল্লার চান্দিনার বাসিন্দা। গত পনের বছর ধরে দুবাইতে আছেন। বহুদিন ধরে ডেজার্ট সাফারির গাড়ি চালান। কোন ধরনের ভয় না করতেও তিনি আশ্বস্ত করলেন। চালক গাড়ির চাকার বাতাস কিছুটা কমিয়ে দিলেন। ধুলোর মধ্যে গাড়ি চালাতে চাকায় বাতাস কম রাখতে হয় বলেও তিনি জানালেন। বেশ কয়েকটি গাড়ি পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাড়িগুলো যেন ফোঁস ফোঁস করছে। প্রতিটি গাড়িই স্টার্টে। তেলের দেশ দুবাইতে এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাখলেও কোন সমস্যা নেই। পানির চেয়ে নাকি তেল সস্তা। গাড়ির চালকেরা ইঞ্জিন বেশ গরম করে তুলছিল। এটির খুব বেশি দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না। বাইরের ৪৫ ডিগ্রির তাপমাত্রার মাঝে গাড়ির ইঞ্জিন এমনিতেই আগুন হয়ে রয়েছে। পড়ন্ত বিকেল। তবুও আকাশে সূর্য বেশ তেজ ছড়াচ্ছে। সামনে ধু ধু মরুভূমি। মরুর বুক জুড়ে রয়েছে শত সহস্ত্র বালিয়াড়ি। এই বালিয়াড়ির উপর দিয়ে ছুটবে সাফারির গাড়ি! আহ্‌ ডেজার্ট সাফারি!
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী

x