দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সিদ্ধান্তহীনতা আমাকে অস্থির করে তোলে। অস্থির মানে আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করবো বা কি করা উচিত! গুয়াংজু থেকে ঢাকা হয়ে ঘরে ফিরবো, নাকি চীনের রাজধানী বেইজিং ঘুরে যাবো। যে কোন দেশের রাজধানীই ওই দেশের মূল আকর্ষণ। তাই কোন দেশে বেড়াতে গেলে ওই দেশের রাজধানী দেখার প্রতি একটি লোভ সবসময়ই কাজ করে। চীনের গুয়াংজু, সাংহাই, তাইজু এবং শেনজেন প্রদেশ ঘুরলেও রাজধানী ঘুরিনি। অবশ্য রাজধানী না দেখলেও যেসব শহর দেখেছি সেগুলো রাজধানীর মতোই চাকচিক্যময়। সাংহাই, শেনজেন কিংবা গুয়াংজুর জৌলুশ আসলেই বহুদিন মনে রাখার মতো।

চীনে এসেছি পর্যন্ত চরকার মতো ঘুরছি। টানা কয়েকদিন ধরে প্রচুর বেড়াচ্ছি। স্বাভাবিক অবস্থায় যতটুকু বেড়ানো যায় তার থেকে বেশি বেড়ানোর চেষ্টা করছি। যতটুকু দেখা সম্ভব চেষ্টা করেছি তার থেকে কিছুটা হলেও বেশি দেখার। শরীর না চললেও ছুটছি। বেড়ানোর ব্যাপারে কোন বাছবিচার করছি না। খাড়া পাহাড়ের শীর্ষে চড়ায় অনেক ঝুঁকি থাকলেও থামিনি। মোটা মানুষ নড়তে চড়তে কষ্ট হচ্ছিল, তবুও পর্বত থেকে পর্বতে, এক গুহা থেকে অন্য গুহায় কিংবা খাড়া সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের শীর্ষে উঠেছি। দলপতি লায়ন ফজলে করিম বারণ করলেও ঘামে জুবুথুবু শরীর নিয়ে পাহাড় ডিঙ্গিয়েছি। শহর দেখেছি, গ্রাম দেখেছি। পাহাড় দেখেছি, নদী দেখেছি। খোলা চত্বর দেখেছি, উন্মুক্ত প্রান্তর দেখেছি। দেখেছি সাজানো গোছানো পার্ক কিংবা আগোছালো ধানীজমি। ধানক্ষেত যেমন দেখেছি, তেমনি কমলালেবুর বাগানে গাছ থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে কমলাও খেয়েছি। অভিজাত শপিং মলের সাজানো গোছানো আয়োজন যেমন দেখেছি, তেমনি পাড়ার আগোছালো বাজারেও ঘুরেছি। কিন্তু সবকিছুর পরও দিনশেষে একথা সত্য যে, আমি চীনের রাজধানী দেখিনি!

তাহলে? চলে যাবো? কিন্তু একা এতদূর কি করে যাবো! বুঝতে পারছিলাম না। নিতে পারছিলাম না সিদ্ধান্ত!

বিগত দিনগুলোতে একা একা অনেক দেশেই ঘুরেছি। কোথাও কোনো অসুবিধা হয়নি। অবশ্য সেই অনেক দেশ আর চীন যে এক নয় সেটা বেশ টের পাচ্ছি আমি। পার্থক্যটা কোথায়? জ্বী, প্রথমতঃ ভাষায়। পশ্চিমা বা মিডল ইস্টের দেশগুলোতে মোটামুটি ইংরেজী দিয়ে দিব্যি চলা যায়। ইউরোপের কোন কোন দেশে ইংরেজী শুনলে রাগ করে তবে কেউ কেউ হেল্পও করে। কিন্তু চীনসহ এতদঞ্চলের দেশগুলোতে ইংরেজী শুনলে রাগ করে না ঠিক, কিন্তু অধিকাংশই কিছু বুঝেও না। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের কাছে ইংরেজী ভাষা মানে আমাদের কাছে চাইনিজ ভাষার মতোই! একটি শব্দও ইংরেজী বুঝে না এমন চীনার সংখ্যাই অত্যধিক।

দ্বিতীয় সমস্যা বাঙালি! ইউরোপ আমেরিকা আফ্রিকা কিংবা মিডল ইস্টের যেখানে যখন গিয়েছি সেখানেই কোন না কোন বাঙালির হেল্প পেয়েছি। রাস্তায় কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই দুয়েকজন বাঙালী পাওয়া যায়। শপিং মলে ঘুরতে গেলে বাঙালির সাথে দেখা না হওয়াটা এক্সিডেন্ট! কিন্তু চীনে সেভাবে বাঙালি আছে বলে আমার মনে হয়না। ইতোমধ্যে বহু পথ পাড়ি দিয়েছি তবে কোথাও কোন প্রবাসী বাঙালির দেখা মিলেনি। আমরা যেকজন একসাথে গিয়েছি সেই কজন ছাড়া অন্য কোন বাঙালি আমাদের খবর নিতে আসেনি। অর্থাৎ বেইজিং গিয়ে আমি যে কোন বাঙালী পাবো না সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। তাহলে এমন একটি অচিন জায়গায় একা গিয়ে হাতে ধরে বিপদ ডেকে আনার মতো কোন ব্যাপার হবে বলেও শংকা হচ্ছিল! আবার রাজধানী না দেখে ফিরতেও ভালো লাগছিল না। ফলে অস্থিরতা কেবলই বাড়ছিল!
গুয়াংজু থেকে বেইজিং এর দূরত্ব প্রায় ২৩শ’ কিলোমিটার। যা চট্টগ্রাম থেকে দিল্লী কিংবা মুম্বাইর দূরত্ব থেকে দুইশ’ কিলোমিটার বেশি। চট্টগ্রাম থেকে কলম্বোর দূরত্বও এর থেকে প্রায় দুইশ’ কিলোমিটার কম! তো, কি করবো! না, বুঝতে পারছিলাম না।

জাহেদ ভাই এবং কায়সার ভাই পরামর্শ দিলেন, চলে যান তো ভাই। অনলাইনে ট্রেনের টিকেট কেটে দিই। দেখতে দেখতে চলে যান, আবার দেখতে দেখতে চলে আসবেন। অফিসের চীনা সহকর্মী তরুণীটিকে ডেকে জাহেদ ভাই গুয়াংজু-বেইজিং ট্রেনের টিকেট এভিলেবল আছে কিনা দেখতে বললেন। রেটও দেখে নিতে বললেন। ট্রেনের টিকেটের দামও বিমানের টিকেটের দামের মতো নাকি উঠানামা করে। যাত্রার সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে টিকেটের দাম বাড়তে থাকে।

চীনা তরুণী অল্পক্ষন পরই সব তথ্য নিয়ে জাহেদ ভাইর রুমে আসলেন। বললেন, টিকেট এভিলেবল। দিনে বেশ কয়েকটি ট্রেন আছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গতির ট্রেন বিভিন্ন রুট ধরে গুয়াংজু থেকে বেইজিং যায়। তবে দুইটি ট্রেন একেবারে ডিরেক্ট যায় সকাল এবং দুপুরে। বিকেল এবং রাতেও ট্রেন যায়। তবে সেগুলো বেইজিং পৌঁছানোর সময়টা আমার মতো নতুন মানুষের জন্য ভালো হবে না বলেও জানালেন তরুণী। দুপুরের দিকে যে ট্রেন সেটি সাত ঘন্টার কিছু বেশি সময়ে ঘন্টায় তিনশ’ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে ছুটে রাত আটটা নাগাদ বেইজিং ওয়েস্ট স্টেশনে পৌঁছাবে। এটিই ভালো হবে বলেও তরুণী মন্তব্য করলেন। বললেন, রাতে হোটেলে থেকে পরদিন সকাল থেকে বেড়াতে পারবেন।

ইউছুপ আলী ভাই এই তরুনীর কর্মদক্ষতার বেশ প্রশংসা করেছিলেন প্রথম দিনই। এখন বুঝলাম যে, মেয়েটির এত প্রশংসা কেন করেছিলেন তিনি। তরুণী এবার ট্রেনের টিকেটের ভাড়ার কথা বললেন, যাত্রীর আইডি ছাড়া টিকেট কেনার সুযোগ নেই। আবার একজনের আইডিতে টিকেট কিনে অন্য কারো ওই টিকেট ব্যবহার করার সুযোগ নেই। ফলে আমাকে আমার পাসপোর্ট এবং ভিসার কপি দিয়ে বিদেশী হিসেবে টিকেট কিনতে হবে। পেমেন্ট দিতে হবে ডলারে। তরুণী জানালেন, দুপুরের ট্রেনটির কালকের টিকেটের দাম সেকেন্ড ক্লাস ১৬০ ডলার, ফার্স্ট ক্লাস-২৩০ ডলার এবং বিজনেস ক্লাস ৪৩০ ডলার। এটি সিঙ্গেল ওয়ের দাম। আসা যাওয়ার টিকেটের দাম এর দ্বিগুণ হবে। জাহেদ ভাই সেকেন্ড ক্লাসই ভালো বলে মন্তব্য করে বললেন, এসি কেবিন, চেয়ারও ভালো। সাত ঘন্টা দেখতে দেখতে চলে যাবে। হাজার হাজার মানুষ সেকেন্ড ক্লাসে ভ্রমণ করেন। আমি মনে মনে হিসেব কষে দেখলাম যে, আসা যাওয়ায় ত্রিশ হাজার টাকারও বেশি শুধু ট্রেন ভাড়ায় খরচ হবে!

জাহেদ ভাই আমার অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, ভাইরে এটা এই দুনিয়ায় না, বহুদূর। দূরত্ব এবং ট্রেনের মান হিসেব করলে তুলনামূলকভাবে ভাড়া কম। চলে যান, মজা পাবেন। তরুণী আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি টিকেট করে ফেলতে বললাম। বললাম, একটি হোটেলও বুকিং দিতে। একটু দেখে শুনে ভালো হোটেল বুকিং দিতে বললাম।

তরুণী চলে গেলেন। একটু পরই দুইটি টিকেট এবং হোটেল বুকিং এর কাগজ নিয়ে আবারো জাহেদ ভাইর রুমে ঢুকলেন। আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, টিকেট দুইটির একটি যাওয়ার, অপরটি আসার। তিনি টিকেট মেইলেও আমাকে ফরোওয়ার্ড করে দিয়েছেন বলে জানালেন। অর্থাৎ হার্ড কপি হারিয়ে গেলেও কোনো সমস্যা হবে না।

তিনি বললেন, যে স্টেশনে আপনি নামবেন তার কাছেই এই হোটেলটি পেয়েছি। ফোর স্টার। অনেক ভালো হবে। সকালে ব্রেকফাস্টসহ পেমেন্ট করা হয়েছে। তিনদিনের জন্য হোটেল নেয়া হয়েছে। ফিরতি টিকেটও তিনদিন পরের। হোটেলে গিয়ে কোন একটি প্যাকেজ নিয়ে ঘুরে টুরে আসতে পারবেন। তিনি আমাকে টিকেট এবং হোটেলের খরচের হিসেব দিলেন, তাতে বুকের ভিতরটা টিপ করে উঠলো। বেইজিং বলে কথা, হোটেল ভাড়া অনেক। ফোর স্টার হোটেলের একটি রুমের এক রাতের ভাড়া দশ হাজার টাকারও বেশি! কলজের ভিতর শব্দতো করবেই!

তরুণী নিজের ক্রেডিট কার্ড থেকে টিকেট এবং হোটেলের পেমেন্ট অনলাইনে দিয়ে দিয়েছেন। আমাকে আর পেমেন্ট দেয়ার জন্য কোথাও যেতে হবে না। আমি তরুণীর হাতে চীনা মুদ্রা বুঝিয়ে দিলাম।

আমি বেইজিং যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় জাহেদ ভাই এবং কায়সার ভাই বেশ খুশি। বললেন, একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বেইজিং না দেখলে চীনের আর দেখলেন কি! গ্রেটওয়াল না দেখে চীন ছাড়ার কী কোন মানে আছে! গ্রেটওয়াল বেইজিং? নিজে নিজে চমকে উঠলাম। পৃথিবীর সপ্ত আশ্চর্যের এক আশ্চর্য চীনের দেয়াল না দেখেই চীন থেকে ফিরে যাচ্ছিলাম! এখন আমি চীনের বিখ্যাত দেয়াল দেখতে পাবো! ভিতরে ভিতরে এত বেশি রোমাঞ্চিত হলাম যে, একটু আগে কলজের ভিতরে যে টিপ শব্দ হয়েছিল সেটি যেনো এখন সানাই বাজাতে লাগলো! (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।