(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
তারেক ভাই তাড়া দিয়ে আমাদেরকে বেশ ভালো মানের একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন। আমরা চারজন একটি টেবিলে বসলাম। বিভিন্ন রকমের খাবারের অর্ডার দেয়া হলো। রাজসিক আয়োজনে লাঞ্চ করালেন প্রিয় বন্ধু তারেক। খেতে পারছিলাম না, তবুও তিনি জোর করে অর্ডার করছিলেন। আমাদের টেবিলের ওয়েস্ট্রেস ছিলেন একজন তরুণী। আমার বন্ধুর আন্তরিকতা যেনো তাকেও ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। তিনি বেশ আনন্দের সাথে একের পর এক ডিশ আনছিলেন এবং আমার প্লেটেই খাবার সার্ভ করে পরে লায়ন বিজয় দা, ছোটভাই রুবেল এবং তারেক ভাইর পাতে দিচ্ছিলেন। তরুণী কী আমাকে মায়া করে বেশি বেশি খাবার দিচ্ছিলেন নাকি ‘মোটা মানুষ, বেশি খাই’ ভেবে আমার প্লেটে পাহাড় বানাচ্ছিলেন বুঝতে পারছিলাম না। তবে তাকে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিলো। বেশ প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েটি খাবার আনতে যেনো খুবই উৎসাহ পাচ্ছিলেন। রেস্তোরাঁয় আরো দুয়েকটি টেবিলে লোকজন খাবার খাচ্ছিলেন। সবাই কথা বলছিলেন একেবারে নিচু স্বরে। আমরা হৈ চৈ করতে অভ্যস্ত হলেও এখানে আমারও গলার স্বর যেনো একেবারে তলানিতে নেমে গিয়েছিল। আমরা শেষ করলেও তরুণী আবারো আমাদের টেবিলে ঝুঁকে আসলেন, আর কিছু লাগবে কিনা তারেক ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলেন। আমি হাতজোড় করে তারেক ভাইকে ইশারা করলাম। তারেক ভাই থামলেও তরুণীর উচ্ছ্বাসে ঘাটতি দেখা গেলো না। তিনি উচ্ছ্বসিত ভাব নিয়ে আমাদের বিল আনতে চলে গেলেন।
খাওয়ার সময় আমরা প্রচুর গল্প করছিলাম। তারেক ভাই বললেন, অস্ট্রেলিয়ার নাম উচ্চারণ করলেই অনেকের চোখে প্রথমে ভেসে ওঠে সিডনির অপেরা হাউস, মেলবোর্নের ব্যস্ত নগরজীবন কিংবা গোল্ড কোস্টের সমুদ্র সৈকত। যেগুলো ইতোমধ্যে আপনারা দেখে এসেছেন। কিন্তু এই দেশটির হৃদয়ে যে একটি শান্ত, সুশৃঙ্খল, নান্দনিক এবং প্রকৃতিনির্ভর রাজধানী শহর নিভৃতে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি যেন অনেক পর্যটকের কাছেই অজানা। সেই শহরের নাম ক্যানবেরা। আপনারা সৌভাগ্যবান যে, ক্যানবেরাও আজ ঘুরতে পারবেন। সময় থাকলে রাতটা কাটিয়ে গেলে আরো ভালো করে দেখতে পারতেন বলেও তারেক ভাই লোভ দেখালেন। কিন্তু আমরা সমস্বরে না না করে উঠলাম।
তারেক ভাই শিক্ষক ছিলেন। তিনি শিক্ষকের মতো করেই বললেন, রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং প্রকৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় এই শহরকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। এই শহরটি অনেকেরই অনেক প্রিয় একটি শহর। আমি অস্ট্রেলিয়ার অন্য শহরে ভালো চাকরির অফার পেয়েছিলাম। কিন্তু ক্যানবেরায় থাকতে ভালোলাগার কারণে এই শহর ছাড়তে পারিনি।
তিনি বললেন, ক্যানবেরা অসাধারণ পরিকল্পিত একটি শহর। এর প্রতিটি কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে নিখুঁত পরিকল্পনায়। কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই, নেই অতিরিক্ত শব্দ কিংবা মানুষের ভিড়। প্রশস্ত রাস্তা, গাছপালায় ঘেরা আবাসিক এলাকা এবং সুপরিকল্পিত স্থাপত্য শহরটিকে এক অনন্য সৌন্দর্য দিয়েছে। তারেক ভাই পুরো অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় সবগুলো শহর ঘোরার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বললেন, অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় ক্যানবেরা অনেক শান্ত। কিন্তু এই শান্তির মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের অভিজাত সৌন্দর্য। এখানে প্রকৃতি এবং আধুনিকতা পাশাপাশি হাঁটে।
আমাদের খাওয়া দাওয়ার পাঠ চুকলো। তারেক ভাই কার্ডে পেমেন্ট করলেন এবং তরুণীকে ক্যাশে টিপস দিলেন। তরুণী একেবারে মাথা ঝুকিয়ে ধন্যবাদ জানালেন। চ্যাপ্টা নাকের অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটি জাপানের বলে বুঝতে পারলাম। কেবলমাত্র জাপানী মানুষকেই আমি এমনভাবে শরীরের অর্ধেক নুইয়ে ধন্যবাদ জানাতে দেখেছি।
তারেক ভাই বললেন, চলেন, এবার ক্যানবেরা ঘুরে দেখি। যদিও সময় কম, তবুও একটু দ্রুত চলতে পারলে সবকিছুই দেখে যাওয়া সম্ভব হবে। তারেক ভাইর পরামর্শে রুবেলের গাড়িটি পার্কিংয়ে রেখে আমরা তারেক ভাইয়ের গাড়িতে চড়ে বসলাম। তিনি নিজেই চালাচ্ছিলেন। অবশ্য এসব দেশে ড্রাইভার পোষা সম্ভব নয়। তারেক ভাই সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে আমাকেও বেঁেধ ফেলার ইঙ্গিত দিলেন। বললেন, আমরা শুরু করবো ক্যানবেরার সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট লেক বার্লি গ্রিফিন থেকে। এখন আমরা একটি লেকের পাড়ে যাবো। আসার সময় হালকা দেখে এসেছেন, এখন আমরা সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরবো, যতটুকু সম্ভব সবকিছু দেখবো।
গাড়ি চলছিল। পরিকল্পিত শহর কাকে বলে তা যেনো আমি টের পাচ্ছিলাম। মনে পড়ছিলো তারেক ভাইয়ের কথাগুলো। রাস্তার পাশে গাছগাছালী, ফুল। বসার জায়গা, তকতকে ঝকঝকে ফুটপাত, পানির ফোয়ারা। ছায়াঢাকা পাখী ডাকা একটি শহর, ছবির মতো সাজানো গোছানো। ক্যানবেরা শহরে ছিটিয়ে ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য আমার মুগ্ধতার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছিলো।
অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা লেক বার্লি গ্রিফিনের পার্কিং এরিয়ায় পৌঁছে গেলাম। তারেক ভাই গাড়ি পার্কিং করলেন। আমরা পায়ে হেঁটে লেকের ধারে পৌঁছালাম। থৈ থৈ করছে পানি। একেবারে টলটলে। ঝাঁপ দিয়ে ইচ্ছেমতো সাঁতার কাটতে পারলে দারুণ হতো। কিন্তু উপায় নেই। লেকের দিকে অপলক তাকিয়ে আমার মনে হলো এটি আক্ষরিক অর্থেই ক্যানবেরার সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বিশাল এই লেকটি কৃত্রিম। মানুষই লেকটি তৈরি করেছে। একটি শহরকে সুন্দর করার জন্যই একটি লেকের জন্ম বলেও জানালেন তারেক ভাই। তিনি বললেন, অস্ট্রেলিয়ার সরকার ক্যানবেরাকে পরিকল্পিত রাজধানী শহর হিসেবে গড়ে তোলার সময় থেকেই একটি বড় লেক তৈরির পরিকল্পনা করেছিল। ১৯১২ সালে মার্কিন স্থপতি ওয়াল্টার বার্লি গ্রিফিন এই শহরটির যে নকশা উপস্থাপন করেছিলেন, তার কেন্দ্রেই ছিল এই লেক। অবশ্য পরবর্তীতে নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে লেক তৈরির প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। পরে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট মেনজিসের শাসনামলে তারই বিশেষ উদ্যোগে কাজ দ্রুত এগোয়। লেক খননের কাজ শুরু হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৬৩ সালে স্থানীয় স্ক্রিভেনার ড্যাম বন্ধ করা হয়। ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে লেক পুরোপুরি তৈরি হয়। ১৯৬৪ সালের ১৭ অক্টোবর লেকটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজের নামে লেকের নামকরণ না করে মার্কিন স্থপতি ওয়াল্টার বার্লি গ্রিফিনের নামে লেকটির নামকরণ করেন। মূলত স্ক্রিভেনার ড্যাম বন্ধ করে মোলংলো নদীর পানি আটকে লেকটি তৈরি করা হয়। লেক তৈরির আগে পুরো এলাকাটি ছিল নদীর বন্যাপ্রবণ সমতলভূমি। নির্মাণের সময় বিপুল পরিমাণ মাটি খনন করা হয় এবং কয়েকটি কৃত্রিম দ্বীপও তৈরি করা হয়। আর এই লেকের চারপাশে তৈরি হয় ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পরিকল্পিত শহর।
আমরা চারজন গল্প করতে করতে লেকের পাড়ে হাঁটছিলাম। বসার জায়গায় কিছুক্ষণ বসেও থাকলাম। সূর্যের আলো পানির উপর পড়ে ঝিলমিল করছিল। লেকের এই রূপ আসলেই অবর্ণনীয়। শুধু আমরা চারজন নয়। ক্যানবেরাকে জনশূন্য একটি শহরের মতো লাগলেও লেকের পাড়ে অনেক মানুষ। পুরো ক্যানবেরার লোকসংখ্যা ৪ লাখেরও সামান্য বেশি। প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটারের শহরটিতে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে চার লাখ মানুষ! প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫শ’ জনের কিছু বেশি মানুষের বসবাস। এটি অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে কম ঘনত্বের শহর বলেও তারেক ভাই জানালেন। ক্যানবেরাকে অনেকেই ‘বুশ ক্যাপিটাল’ বলেন। কারণ শহরের ভেতরেই প্রকৃতি এত গভীরভাবে মিশে আছে যে, মনে হয় এটি যেন এক বিশাল উদ্যানের মধ্যে গড়ে ওঠা নগরী।
আমরা লেকের পাড়ে হাঁটছি। আমাদের পাশাপাশি আরো বহু মানুষ লেকের ধারে হাঁটছে, কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, লেকের জলে কায়াকিং করছে, নৌকা চালাচ্ছে, কেউ কেউ মাছ ধরছে। কেউ আবার পরিবারের সঙ্গে পিকনিকে মেতেছে। পরিবারের বড়দের সাথে শিশু কিশোরও এসেছে। কিন্তু কোথাও কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না। কোন হৈ চৈ নেই, সবাই যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে প্রকৃতি উপভোগ করছে। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












