দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সিডনি শহরের বিস্তৃত এলাকা দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম বন্ধুকন্যা ডা. নিশার বাসায়। পুরো শহরটি যেনো সাজানো গোছানো। কোথাও কোন ছন্দপতন নেই, বিশৃঙ্খলা নেই। আমরা প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসলাম, শহরের ভিতরেই। এতো বড় একটি শহর, অথচ কোন সোনার কাঠি রূপোর কাঠির ছোঁয়ায় যেনো নিজে নিজেই সবকিছু সামলে নিচ্ছে। রাস্তায় হাজার হাজার গাড়ি চলছে, অথচ কোথাও কোন ঝামেলা নেই, কোথাও কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। পথে পথে সাতরাজ্যের মুগ্ধতা যেনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে।

আমাদেরকে বাসার গেটে পৌঁছে দিয়ে নিশার ননাসের স্বামী মারুফ সাহেব ফোন করলেন নিশাকে। বললেন, ওনার জরুরি একটি কাজ আছে, তাই বাসায় ঢুকবেন না। নিশা যেনো আমাদেরকে বাসায় নিয়ে যায়। নিশা দোতলা বাসা থেকে ছুটতে ছুটতে নিচে এসে আমাদের রিসিভ করে নিলেন। আমি এবং লায়ন বিজয় শেখর দাশ। দু’জনই একেবারে খালি হাতে হাজির হয়েছি নিশার বাসায়। পথিমধ্যে বিষয়টি মাথায় না থাকলেও এখন গেটে প্রবেশ করে কেমন যেনো বিব্রত হচ্ছিলাম। গেটের বাইরে উঁকি মারলাম, যদি একটি দুইটি দোকান থাকে তাহলে কিছু ফলমুল বা কুকিসচকলেট কিনে নেবো। কিন্তু না, তেমন কিছু চোখে পড়লো না। পুরোটাই আবাসিক এলাকা। তাছাড়া, এটি চট্টগ্রাম নয় যে, যেখানে সেখানে দোকান নির্মাণ করে যে কেউ চুটিয়ে ব্যবসা করতে পারবে!

বিষয়টি কানে কানে বিজয় দা’কে বলতে তিনিও ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। বললেন, আসলেই তো, বিষয়টি এভাবে ভুলে যাওয়া একদম ঠিক হয়নি। ততক্ষণে আমরা সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করেছি। নিশা আমাদের পথ দেখিয়ে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে গেলো। ফ্ল্যাটবাড়ি হলেও এটি কোন এ্যাপার্টমেন্ট নয়, দোতলা একটি বাড়ি। এক ফ্লোরে তিনটি বাসা। দুই রুমের ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে নিশা তার স্বামী জনি এবং একমাত্র কন্যা তাকিয়াকে নিয়ে বসবাস করে। নিশারা অস্ট্রেলিয়ায় এসেছে খুব বেশিদিন হয়নি। বুঝতে পারলাম যে, এখন গুছিয়ে উঠার সংগ্রাম চলছে।

নিশার কন্যা বছর চারেকের তাকিয়া যখন এসে জড়িয়ে ধরলো তখন আরো বেশি খারাপ লাগতে লাগলো। পরিবারে এতো ছোট্ট একটি শিশু রয়েছে, অথচ এক বক্স চকলেট নিয়ে আসলেই হতো!

ডা. নিশা আমাদের পেয়ে যেনো তার বাবাকে পেয়েছে। সে একবার রান্না ঘরে, একবার আমাদের কাছে ছোটাছুটি করতে লাগলো। যতই তাকে বলি যে, তেমন কিছু লাগবে না, লাঞ্চ করেছি বিকেলে। ক্ষুধা নেই, অল্প কিছু হলেই হবে। ততই যেনো তার দৌঁড়ের মাত্রা বাড়তে থাকে। আমাদেরকে চা দিয়ে সে আবারো রান্নাঘরের দিকে ছুটলো।

অল্পক্ষণের মধ্যেই নিশার স্বামী, মানে আমাদের জামাই মাইনুল ইসলাম জনি এসে হাজির হলো। বাইরে থেকে আসার সময় জনি কোল্ড ড্রিংকস এবং জুসের কয়েকটি বোতলসহ নানা ধরনের খাবারদাবার নিয়ে এসেছে। শ্বশুরপক্ষের লোকজন এসেছে শুনে জনির যে এই বাজারসদাই তা বেশ বুঝতে পারছিলাম। জনি এবং নিশা দুজনই চাকরি করেন, আয়রোজগার যথেষ্ট ভালো। দেশ থেকে গিয়ে তারা অল্পদিনেই মোটামুটি গুছিয়ে নিচ্ছে।

নিশাকে ডেকে বললাম, খাওয়া দাওয়া পরে হবে, এসে বস, কিছু গল্পটল্প করি। নিশা ছুটতে ছুটতে গল্প করছিল। তারা এখন যে চাকরি করছে সেটা বেশিদিন করবে না। ছেড়ে দেবে। অন্য চাকরি যোগাড়ের চেষ্টা চলছে। তাকিয়াকে স্কুলে দিয়েছে। তার পেছনেও সময় দিতে হবে। সবকিছু মিলে ছোট্ট পরিবারের মানুষগুলো ভালো আছে। বাবা কিংবা শ্বশুরের বন্ধুকে পেয়ে তাদের ছোট্ট পরিবারে যেনো ঈদের চাঁদ উঠেছে।

বিদেশে সবাই আর্লি ডিনার করে। নিশা এবং জনিরও আর্লি ডিনারের অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা গল্পে গল্পে বেশ সময় পার করে দিলাম। টেবিলে খাবারের বিশাল বহর সাজিয়ে আমাদের ডাকা হলো। কিন্তু আয়োজন দেখে চোখ কপালে না তোলার উপায় ছিল না। টেবিলে প্লেট দেয়ার জায়গা নেই। মাছ মাংস সবজি থেকে শুরু করে কত আয়োজন যে মেয়েটি করেছে!

নিশার পরিবারে কোন কাজের লোক নেই। সব কাজই নিশা এবং জনি মিলেমিশে করে। বিদেশে কাজের লোক এবং ড্রাইভার রাখার কথা চিন্তাও করা যায় না। সব কাজই নিজেকেই করতে হয়। যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। এখানেও তারা নিজেরাই করে, করেছে। কিন্তু এত্তো কিছু করার কি দরকার ছিল! আমার খুব খারাপ লাগছিলো যে, আমাদের একবেলা ডিনার করাতে গিয়ে কতগুলো টাকা তাদের খরচ হয়ে গেল!

নিশার দেশি স্বাদের রান্না বেশ মজা করে খেলাম। ইলিশের বেশ বড়সড় একটি টুকরো পাতে তুলে দিল নিশা। এতোবড় ইলিশ দেশেও কোনদিন খেয়েছি কিনা মনে করতে পারছিলাম না। ড্রেজার্টেও কয়েক রকমের আইটেম ছিল। খাওয়া দাওয়া শেষ করতে করতে বেশ রাত হয়ে গেলো। নিশা বললো, আংকেল চলেন, পাশেই আমার ননাসের বাসা। ওদের একটু দেখে চলে যাবেন। মারুফ ভাই আপনাদের পৌঁছে দেবেন।

পাশেই মারুফ সাহেবের বাসা। বাসা না বলে প্যালেস বলা ভালো। বিশাল এক ডুপ্লেক্স বাড়ি, সাজানো গোছানো। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিলো। মারুফ সাহেব আমাদের স্বাগত জানালেন। বিশাল ড্রয়িংরুমে বসে মনে হলো, কোন রাজপ্রাসাদে বসে আছি। জনির বড়বোন মানে মারুফ সাহেবের স্ত্রী নানা ধরণের খাবার দিয়ে টেবিল ভরিয়ে তুললেন। চা ছাড়া আর কিছুই খাবো না বলাতে তিনি বিভিন্ন খাবারের বায়োগ্রাফি উপস্থাপন করতে শুরু করলেন। এটা একটু খেয়ে দেখুন, ওটা একটু চেখে দেখুন। এই যে, এটা না খেলে মিস করবেন! ইত্যাদি বলে বলে ভদ্রমহিলা আমাদেরকে যা খাওয়ালেন তা সত্যিই অতিরিক্ত হয়ে গেলো।

আমাদের বিদায় নেয়ার সময় হলো। নিশার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করলাম। দোয়া করলাম জনি এবং তাকিয়াকেও। নিশার ননাসকে ওদের দেখে রাখার অনুরোধ জানাতে গিয়ে মনে হলো, বন্ধুর মেয়ে হলেও আমি যেনো নিশার বাপের দায়িত্ব পালন করছিলাম। মারফ সাহেব ৭০ কিলোমিটার দূরে আমাদেরকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে আবার ৭০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে বাড়িতে ফিরে আসবেন। বিষয়টি ভালো লাগছিলো না। বললাম, আমাদেরকে একটি উবার করে দিন, চলে যেতে পারবো। কিন্তু তারা কেউই সেটা আমলে নিলেন না। বললেন, তা হয়না। মারুফ সাহেব একা ফিরবেন, তাই জনিও আমাদেরকে এগিয়ে দেয়ার জন্য গাড়িতে চড়লো।

ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতের ধারে কাছে। আমরা ছুটে চলেছি সিডনি শহরের রাস্তা ধরে। চারদিকে আলোর বন্যা। সুউচ্চ ভবনগুলোর পুরো দেয়ালজুড়ে যেনো টিভি চলছে। চলছে বিজ্ঞাপনচিত্র। দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলেও বিভিন্ন ভবনে আলোর কমতি ছিলো না। রাস্তার পাশে ফুটপাতের গাছগাছালীতে চলছিলো আলোআঁধারির এক মায়াবী আবহ। নাইট ক্লাব এবং বারগুলো থেকে ঠিকরে ঠিকরে বের হচ্ছিলো আলোকছটা। রাস্তার পাশে কয়েকটি পার্কও দেখলাম। পার্কে লোকজন নেই, তবে ভিতরে বর্ণিল আলো।

আমাদেরকে হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন মারুফ সাহেব ও জামাই জনি। তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হলো, পৃথিবীতে মায়া বুঝি এমনই। একসাথে বসাতো দূরের কথা, জীবনে এর আগে কোনদিন দেখাও হয়নি, অথচ কী অদ্ভুদ এক মায়ায় যেনো মানুষগুলো আটকে ফেললেন! আত্মার আত্মীয় হয়ে গেলেন!! এভাবে দেশে দেশে কত মানুষ যে আমার আত্মার আত্মীয় হয়ে রয়েছেন!

হোটেলের লবিতে গিয়ে বসলাম। আরো কয়েকজন বসে আছেন। টিভি দেখছেন। রিসিপশনে বসা মেয়েগুলো আমাদের দেখলো, কিন্তু কিছু বললো না। চিনতে পেরেছে কিনা কে জানে! কত লোকের আনাগোনা, কত বোর্ডার। কার খবর কে রাখে! আমাদের হোটেলটিতেও নাইটক্লাব রয়েছে। রিসিপশনের পাশেই। সেখানে উচ্চস্বরে ড্রাম বাজছিল। দরোজা খোলে কেউ কেউ বের হয়ে চলে যাচ্ছিলেন, কেউবা ঢুকছিলেন। দরোজা খুললে ভিতরে আওয়াজ বেশ তাগড়া হয়ে কানে বাজছিল। খেয়াল করে দেখলাম যে, যারা ঢুকছে তারা যেমন উচ্ছ্বসিত, যারা বের হয়ে চলে যাচ্ছে তারাও। পুরষদের কাপড়ছোপড় পর্যাপ্ত হলেও স্বল্পবসনা তরুণীদের কোন রাখঢাক ছিলো না। কারো কারো পা’ও টলছিল।

রিসিপশনে টিভি দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম যে, বাইরে দলে দলে নারী পুরুষ কোথায় যেনো যাওয়া আসা করছে। হোটেলের সামনের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো তারা, সাথে হল্লা। এতোরাতে এতো এত্তো নারী পুরুষ কোথায় যায়! সবাই তরুণ তরুণী! বিজয় দা’কে বললাম, ঘুমাবেন? তিনি মাথা নাড়লেন। বললাম, চলেন, রাতের সিডনি দেখে আসি। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভয়াল ২৯শে এপ্রিল : এখনো অরক্ষিত বাঁশখালী উপকূল
পরবর্তী নিবন্ধবয়স যখন টিনএজ- সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ