বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এক প্রতিকারহীন হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। একই দিনে ২১ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের পটিয়ায় বাস চাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন উপজেলার কচুয়ায় ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের জাহেদুল আলমের পুত্র মো: তাজলিম (১৭) ও একই এলাকার আকতার হোসেনের পুত্র শাহাদাত হোসেন সামি (১৬)। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন জয় (১৮) নামের আরো একজন। আহত জয়কে পটিয়া হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পটিয়া আনসার ক্যাম্প এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, শনিবার সকালে তিন বন্ধু মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার ছেড়ে আসা হানিফ এন্টারপ্রাইজের বেপরোয়া গতির একটি বাস মোটরসাইকেল আরোহী তিনজনকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলে একজন মারা যায় এবং পরে পটিয়া হাসপাতালে নেয়ার পথে আরো একজন মারা যায়। ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন বাসটি আটক করে হাইওয়ে পুলিশের কাছে সোর্পদ করেছে। পটিয়া ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশের ওসি মো: হারুনুর রশিদ জানান, দুুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন বাসটি আটক করেছে। মোটরসাইকেল ও বাসটি হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। এ ব্যাপারে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে,দেশের ১১ জেলায় শনিবার সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। তাদের মধ্যে কুষ্টিয়ায় চারজন, দিনাজপুরে তিনজন ও যশোরে চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে দুজন করে এবং মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, গাজীপুর ও জয়পুরহাটে একজন করে মারা গেছেন। এসব দুর্ঘটনায় বহু আহতের ঘটনাও ঘটেছে।
আসলে নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও সড়কে থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাব। মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দিয়ে এবং গতি পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে চালকদের ওই নির্দিষ্ট গতি মেনে চলতে বাধ্য করা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া চালকের দক্ষতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে। মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ করতে হবে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে ইতোপূর্বে নানা ধরনের পরামর্শ ও সুপারিশ করা হয়। কিন্তু কেউ তাতে কর্ণপাত করেন বলে মনে হয় না। কর্তৃপক্ষও যেন নির্বিকার। ফলে একের পর এক ঘটে চলেছে দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ২০১৯ সালে একটি আইন কার্যকর করা হলেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন আজও নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন সহজেই। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকা। অতি বৃষ্টিতে সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও ফিডার রোডে টার্নিং চিহ্ন না থাকার ফলে নতুন চালকরা এসব সড়কে দুর্ঘটনায় পড়েছেন। উল্টোপথে চলাচল, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং অতিরিক্ত সময় ধরে চালকের আসনে একজন থাকায় দুর্ঘটনার সংখ্যা কমছে না। ধীর ও দ্রুতগতির বাহনের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করতে সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমরা মনে করি, এতে চালকের দক্ষতা ও মানসিকতায় রয়েছে বড় সমস্যা। ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ছাড়া ভারী যান চালানো এবং সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছার অমানবিক প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত মানুষ মারছে। এই ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, বাধ্যতামূলক মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত রিফ্রেশার কোর্স চালু করা উচিত। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় জড়িত চালকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে বেপরোয়া মনোভাব বদলাবে না।







