চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মাননীয় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন (বর্তমানে প্রশাসক) ১৭ই আগস্ট ২০২৫ আমাকে থিয়েটার ইনস্টিটিউটে ডাইরেক্টর হিসেবে এসাইনমেন্ট দেন। গত শতাব্দী থেকে এই পর্যন্ত আমি দেখেছি ডা. শাহাদাত হোসেন মানেই জেল–জুলুম হুলিয়া। কখনো দেখা যাচ্ছে প্রিজন ভ্যানে, কখনো আদালতে, কখনো জনতার মিছিলে। মুদ্রার অপর পিঠে তিনি উপ–মহাদেশের নামকরা ফিজিক্যাল মেডিসিনের ডক্টর। তাঁর ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে বা আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে দাল্লা হাসপাতাল সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা দিচ্ছে। বর্তমানে তাঁকে দেখা যায় জলবদ্ধতা নিরসনে নগরীর প্রত্যন্তে, রাস্তাঘাটে, নালা–নর্দমা নিয়ে দীর্ঘদিবস, দীর্ঘরজনী পার করছেন। পতেঙ্গায় সাইকেল ট্র্যাক ও নগরীকে সুন্দর রাখার জন্য রাস্তার দুই পাশে ফুল গাছ দিয়ে মিড আইল্যান্ড তৈরি করেছেন।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত একটি কালচারাল কমপ্লেক্স– ‘থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম’। এর প্রধান লক্ষ্য– চট্টগ্রামকে সংস্কৃতি–বান্ধব নগরী রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দক্ষ কলা–কুশলী সৃষ্টির মাধ্যমে মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং থিয়েটার শিল্পকে মর্যাদাশীল পেশায় উন্নীতকরণ। থিয়েটারসহ শিল্পকলার নানান শাখায় সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নিবেদিতদের শিক্ষা–অনুশীলন–চর্চার মাধ্যমে উৎকর্ষ ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্র তৈরির অব্যাহত প্রয়াসকে বেগবান করার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ টিআইসি–র প্রধান উদ্দেশ্য।
থিয়েটার ইনস্টিটিউটের ডাইরেক্টর হিসেবে আমি ৭ম কর্মদিবসে শর্ট টার্ম, মিড টার্ম, লং র্টাম এবং দীর্ঘ মেয়াদী প্রস্তাবনা পেশ করি। মেয়র মহোদয় আমাকে পরামর্শ দেন এই ইনস্টিটিউটকে আয়বর্ধক ও ইনডিভিজুয়েল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চসিক সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল আমিন থিয়েটার ইনস্টিটিউটকে ঢাকার বেইলি রোডের মতো করে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। অত্যন্ত প্রীত হবার বিষয় যে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা লেকচার হল খুলে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের জন্য মহড়ার সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, ইলেকট্রিক সাবস্টেশন সংস্কার করা হয়েছে, দীর্ঘ ৮ বছর পর থিয়েটার ইনস্টিটিউটে ওয়াসার পানির সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ল্যাবরেটরি হলে লাইট, এসি, ফার্নিচার, ফিকচার মেরামত করা হয়েছে। এখন থিয়েটার ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণসহ ৩টা হলেই সবসময় অনুষ্ঠানের সরগরম হয়ে উঠছে।
গত এক বছর মেয়াদকাল ভারতীয় সহকারী হাই কমিশন, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, চট্টগ্রামস্থ অনারারী কনসালসমূহ যথাক্রমে জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ফ্রান্স ইত্যাদি; বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, বিদেশী প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক আয়োজন করার জন্য আমি সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও থিঙ্কট্যাঙ্কসমূহ, কর্পোরেট হাউসগুলোর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকার ও জনসংযোগ করি।
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহ এখানে তাদের ব্রান্ডিং–এর জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালাসহ কিছু অনুষ্ঠান করার জন্য ইতোমধ্যে সম্মতি প্রকাশ করেছেন। উদাহরণসরূপ ফ্লোবেল একাডেমী কিছু অবকাঠামো সংস্কারের জন্য স্বতঃস্ফুর্ত প্রস্তাব দিয়েছেন। উইলিয়াম কেরি একাডেমি নিয়মিত অনুষ্ঠান করে। এদেরকে নীতিমালা সংশোধনপূর্বক কমার্শিয়াল হারে (বর্ধিত ভাড়া) বরাদ্দ দেয়া যায়।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনসমূহ যাতে নানারকম অনুষ্ঠান করে, তাদের কাছে প্রচারণা বৃদ্ধি ও সুযোগ দেয়া যায়। লেকচার হলটাকে সুস্থধারার দেশি বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শন, সাহিত্য আড্ডা, বৈঠকি গান, কর্মশালা, স্টুডিও সংলাপ ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য ভাড়া দেয়া হচ্ছে। ছোট বড় কক্ষগুলোতে প্রশিক্ষণ, মহড়ার সুবিধা দেয়া হচ্ছে। গ্যালারি মিলনায়তন ও কক্ষে চিত্র ও চিত্রকলা প্রদর্শনী করা হয়েছে।
মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা : ১. টিআইসি থেকে নাটক, আবৃত্তি, গান ও নৃত্যের প্রশিক্ষণের জন্য কোর্স চালু করা হবে।
২. থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের জন্য ছোট একটি নাটকের গ্রন্থাগার স্থাপন করা। এর জন্য প্রকাশক ও নাট্যকারগণ সৌজন্য কপি সরবরাহ করার জন্য ইতোমধ্যে সম্মতি দিয়েছে। ৩. ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে টিআইসির একটি বুলেটিন প্রকাশ করা হবে। ৪. চসিক পরিচালিত কলেজ, স্কুল ও সংস্কৃতি বিভাগ সম্মিলিতভাবে অনুষ্ঠান করা হবে। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নাটকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান সমন্বিতভাবে টিআইসিতে আয়োজন করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা : বর্তমানে পূর্বদিকের দেয়াল ৮ ফিট পিছিয়ে নিয়ে গেলে বড় মুক্ত মঞ্চ করার সম্ভাবনা রয়েছে। নিরীক্ষামূলক নাট্যচর্চায় বর্তমানে বিশ্বে আধুনিক থিয়েটারের হলের মধ্যে ‘ব্ল্যাক বক্স থিয়েটার’ অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও জনপ্রিয়। প্রচলিত থিয়েটার হলগুলোর চাইতে কাঠামো এবং স্থাপত্যের দিক থেকেও ব্যতিক্রমী স্থাপনা ‘ব্ল্যাক বক্স থিয়েটার’–এর মঞ্চকে প্রয়োজনে যে–কোন জায়গায় স্থানান্তর করে দর্শক সারি তৈরি করা যায়। এতে অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে অন্তরঙ্গ আবহ সৃষ্টি হয় এবং অভিনয় ক্ষমতাও বাড়ে। এছাড়াও অর্থনৈতিক বিবেচনায় ব্ল্যাক বক্স থিয়েটার বেশ সাশ্রয়ীও বটে, ব্যবহারকারীর প্রদর্শনী ব্যয়েরও সাশ্রয় হয়। এই বিষয়ে চট্টগ্রামস্থ ভারতীয় হাইকমিশন চট্টগ্রামের ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। মাননীয় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এই বিষয়ে মাননীয় সহকারী হাইকমিশনকে পত্র দিয়েছেন।
২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের অনুষ্ঠানচিত্র : ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামে সর্বমোট ৪০০টি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে নাটক, সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, বিতর্কসহ বিভিন্ন শিল্প–সংস্কৃতির ধারার কার্যক্রম সমানভাবে বিকশিত হয়েছে।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনলাইনে ডেঙ্গু বিষয়ক সচেতনতা ও পরিচ্ছন্ন অভিযান, চসিক বাজেট অধিবেশন, নজরুল বর্ষের সূচনা অনুষ্ঠান, ২৯৪ পূজা মন্ডপে অনুদানসহ বেশ কিছু ইভেন্ট পরিচালিত হয় থিয়েটার ইনস্টিটিউট এর লজিস্টিক সাপোর্টে। অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে ছিল, ৪০টি বিভিন্ন নাট্যদলের মঞ্চ নাটক, ১১৮টি আলোচনা সভা, ৩৯টি বিভিন্ন আবৃত্তি সংগঠনের আবৃত্তি অনুষ্ঠান, ১২টি যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশনা, ১৫টি বিভিন্ন নৃত্য সংগঠনের নৃত্যানুষ্ঠান, ৪০টি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ গ্রহণ করে। এ সময়ে ৭৫টি সঙ্গীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, আধুনিক গান, নজরুলসঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরিবেশনা ছিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ২২টি সাহিত্য আড্ডা ও গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান, ১৫টি বিতর্ক (ডিবেট) অনুষ্ঠান, ১০টি তবলা পরিবেশনা, ১০টি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও চলচ্চিত্রবিষয়ক অনুষ্ঠান, ১টি যোগব্যায়াম (যোগাসন) বিষয়ক অনুষ্ঠান, ৩টি চিত্রাঙ্কন ও চিত্রপ্রদর্শনীসহ বিবিধ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোরিয়ান দূতাবাস, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ এবং ভারতীয় হাইকমিশন–সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংস্থাও থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামে তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। আগামীতে মেয়র মহোদয়ের উপস্থিতিতে যৌথ স্বাক্ষরে কর্মশালা বা অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হবে। চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট ইউনেসকোর আওতাধীন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সহযোগী সদস্য।
বর্তমানে ৩জনের বেতন টিআইসির নিজস্ব ফান্ড থেকে দেওয়া হয়। ৩ জন বিদ্যুৎ বিভাগ, ২ জন পরিচ্ছন্ন বিভাগ (৩২ নং ওয়ার্ড) থেকে বেতন ও ভাতাদি গ্রহণ করেন। ২ জন নিরাপত্তা প্রহরী চসিক পরিচালিত নিরাপত্তা বিভাগ আউটসোর্সিং হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার খাতিরে ২ জন প্রহরী সরাসরি কর্পোরেশন থেকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তাছাড়া থিয়েটার ইনস্টিটিউটকে অর্গানোগ্রামভুক্ত করণে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রস্তাব ও জনবলসমূহকে স্থায়ী করা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন অর্গানোগ্রাম ও জব ডেসক্রিপশন : ক) পূর্বোক্ত এম.আই.এস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম অফিসার) পদটি পুনর্বহাল করা। খ) বর্তমানে তিনটি হল পরিচালনা করার জন্য একজন ইভেন্টস ম্যানেজমেন্ট সহকারী রাখার প্রস্তাব করছি তাকে আইটি এক্সপার্ট ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর ধারণা থাকতে হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবে। গ) একাউন্ট ফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাসিক হিসাব, বাৎসরিক হিসাব অডিট পরিচালনার জন্য হিসাব রক্ষক প্রয়োজন। পরিচালকের পরামর্শক্রমে পরিচালনা করবে ও জবাবদিহি থাকবে, কম্পিউটার জানতে হবে। ঘ) দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করার জন্য একজন অভিজ্ঞ কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ করা যেতে পারে। ঙ) তাছাড়া টেকনিশিয়ান, অপারেটর, এম এল এস এস ও প্রেষণে নিযুক্ত স্টাফ সমূহ বহাল থাকবে।
উপরোক্ত সবাইকে থিয়েটার ইনস্টিটিউট এর পরিচালকের নিকট রিপোর্ট ও জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
লেখক: পরিচালক, থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম; অতিথি শিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।












