স্বাধীনতার লাভের সাড়ে পাঁচ দশক পরও আমরা শিক্ষা মান উত্তীর্ণ করতে পারেনি। এ আমাদের দৈন্য। শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মানের গতি নিম্নমুখী। গবেষক সেলিম আহমেদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা রিডিং করতে পারে না। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গণিতের সমাধান করতে পারে না এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ইংরেজি রিডিং পড়তে পারে না। এই হলো সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানের চিত্র।
কিন্তু সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বছরব্যাপী শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর এবং সি–ইন–এড বা বি.এড বা ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন অথবা এম.এড ডিগ্রি। তারপরও মানের নিম্নগতির কারণ কী? উল্লেখ্য, এই শিক্ষকই মাসে ৪৫টি রেজিস্টার খাতায় নানান তথ্য লিখেন। বিদ্যালয় পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করেন অর্থাৎ ঝাড়ু দেন এবং অফিস সহায়কের যাবতীয় কাজ করেন। উপরন্তু বিভিন্ন সময়ে সরকারি জরিপ কাজেও এঁদের কাজে লাগানো হয়। শিশু শ্রেণির (৩ থেকে সাড়ে তিন বছর) শিক্ষার্থীদের শৌচাগারে নেওয়া–আনার কাজও করতে হয় এই শিক্ষকদেরই।
লেখক সমপ্রতি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে (কুমিল্লা–১০ আসনের সংসদ সদস্য জনাব মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার পরামর্শক্রমে) আয়োজিত গণিত বিষয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। আলোচনায় শিক্ষার্থীদের গণিত বিষয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে যা বেরিয়ে এলো তা হলো্ত প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা গণিত বিষয়ে অপরিপক্ব থেকেই ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। তারপর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল গণিত শিক্ষকরা ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে গণিত অনুশীলন করান না। এই স্তরে অতিথি শিক্ষক বা অন্য বিষয়ের শিক্ষক গণিত বিষয়ে পাঠ দেন।
অতিথি শিক্ষকদের অনেকেই আবার কোচিং সেন্টারের সাথে জড়িত। যাঁদের অধিকাংশই ক্লাসে পাঠদানের চেয়ে কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগী থাকেন। প্রকৃত গণিত বিষয়ের শিক্ষকরা নবম–দশম শ্রেণিতে গণিত পাঠদান করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যে কারণে নিচের শ্রেণি থেকে উত্তীর্ণ হয়ে উপরের শ্রেণিতে ওঠা দুর্বল শিক্ষার্থীদের নিয়ে দু’বছর অনুশীলন করার পরও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করছে না। তাছাড়া মোবাইলের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা দিন–রাত মোবাইল ব্যবহারের কারণে বিদ্যালয়ের পড়া সময়মতো শেষ করতে পারছে না। ফলে তারা বিদ্যালয়বিমুখ হচ্ছে এবং ধারাবাহিক শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। আরো বড় চিন্তার কারণ, যেসব শিক্ষক শ্রেণিতে পাঠদান করছেন, তাঁদের প্রশ্ন বিদ্যালয়ের সাময়িক পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয় না অথবা স্কুলের পরীক্ষার জন্য কোনো প্রশ্ন তৈরিও করতে হয় না। শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠন থেকে শ্রেণির শিক্ষার্থীসংখ্যানুযায়ী প্রশ্ন কিনে (ক্রয় করে) আনা হয়। এমন পরিস্থিতি সব বিষয়ের এবং এ চিত্র সারাদেশের। এছাড়া এনটিআরসিএ–এর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বিশাল সংখ্যক শিক্ষককে উত্তর বঙ্গ, দক্ষিণ বঙ্গ এবং দেশের মাঝ সীমানা থেকে এনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন স্কুল, মাদ্রাসায় পদায়ন করায় শিক্ষকদের মন সবসময় নিকটজনের কাছেই পড়ে থাকে। তাঁরা মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করতে পারেন না। ফলে মানসম্মত শিক্ষাও অধরাই থাকছে। এঁদের অধিকাংশের পেশাগত প্রশিক্ষণ বা বি এড ডিগ্রি নেই। শিক্ষকতায় এসে স্কেল পরিবর্তনের জন্য কোনো না ভাবে একটা সনদ সংগ্রহে মরিয়া হয়ে ওঠে। মূল শিক্ষা পেডাগোজির জ্ঞান অর্জন আর হয়ে ওঠে না। সনদ সংগ্রহ হয়, স্কেল বাড়ে কিন্তু শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষকতার মান বাড়ে না।
পরিত্রাণের উপায় হিসেবে লেখকের পরামর্শ হলো– প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শ্রেণি কার্যক্রমের বাইরে অন্য কোনো কাজে সম্পৃক্ত না করা। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া এবং অফিস সহায়ক নিয়োগ দেওয়া। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ এবং যোগ্য প্রশিক্ষকের মাধ্যমে মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান। বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিদ্যালয়ের বাইরে রাখা। যোগ্য ও মানসম্পন্ন শিক্ষকদের কাজের (উদ্ভাবনী) স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা রাখা। বিদ্যালয় মনিটরিং জোরদার করা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা। শিক্ষকদের সম্মানজনক সম্মানী প্রদান এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
প্রতিটি বিদ্যালয়ে লাইব্রেরিতে শিশু–কিশোরদের উপযোগী বই সরবরাহ এবং বইপড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। বইপড়া কর্মসূচির (পড়ি শিখি) সাথে সব শিক্ষককে সম্পৃক্ত করা এবং বইয়ের গুরুত্ব নিয়ে মোটিভেশনাল বক্তৃতার আয়োজন করা।
বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষকদের ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন, ব্যাচেলর অব এডুকেশন এবং মাস্টার ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করতে উদ্বুদ্ধ করা। বি.এডবিহীন শিক্ষকদের পাঠদানের পদ্ধতি ও কৌশল আয়ত্ত করার জন্য সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন ডিগ্রি অর্জনের জন্য এক বছরের শিক্ষা ছুটি মঞ্জুরের ব্যবস্থা রাখা। ছুটি প্রদানের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ এবং প্রধান শিক্ষককে নিয়ম মানার ব্যাপারে সচেতন করা। এনটিআরসিএ‘র মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া শিক্ষকদের স্ব স্ব এলাকায় নিয়োগ প্রদান করা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের তত্ত্বাবধানে বিষয় শিক্ষকদের থেকে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন গ্রুপ ও মডারেশন গ্রুপ সিলেকশন এবং প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের উপর বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিক্ষক প্রশিক্ষক।












