“সাহিত্য” শব্দটি সংস্কৃত “সহিত” শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ–একসঙ্গে থাকা বা মিলন। অর্থাৎ, যেখানে মানুষের হৃদয়, চিন্তা–চেতনা, অনুভূতি, কল্পনা, অভিজ্ঞতা ও সৌন্দর্যের মিলন ঘটে, শিল্পরূপে প্রকাশিত হয়। এটি শুধু লেখার মাধ্যম নয়, বরং মানুষের আত্মার প্রকাশ, সমাজের প্রতিচ্ছবি এবং যুগের ইতিহাসও বটে। বর্তমানেও সাহিত্যের চর্চা হচ্ছে, প্রতিনিয়ত বাজারে আসছে নিত্যনতুন বই। এ–সব বইয়ের মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কবিতার বই বেশি প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত প্রকাশিত কবিতার বইগুলো কতটুকু সাহিত্য মানসম্পন্ন? এসব বইয়ের লেখক কারা? এমন সব বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা।
বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীনতম শাখা কাবিতা। চর্যাপদ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত কবিতায় বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী শাখা। কিন্তু বর্তমান সময়ের তরুণ কবিদের কাব্যচর্চা কবিতার সেই আবহ সৃষ্টি হচ্ছে না বা করতে পারছে না। এখনে তরুণ কবি থেকে উদ্দেশ্য যাঁরা বয়সে নয়, বরং লেখক হিসেবে তরুণ তাঁরাই। এই পর্যায়ের তিন ধরনের কবি লক্ষ করা যায়। এক, যারা ফেসবুকে আবেগী পোস্ট করে নিজেকে কবি দাবি করে। দ্বিতীয় শুধু নর–নারীর প্রেম–নির্ভর কবিতা চর্চা করে নিজেকে কবি দাবি করা দল। তিন, দৈনিক সাহিত্য পাতার চাহিদা নির্ভর কাব্যচর্চা করা কবিগোষ্ঠী।
প্রথমত শখের বশে ফেসবুকে দুই–এক লাইন আবেগী পোস্ট করে, এরপর কিছুদিন এটা নিয়মিত করার পার এক সময় যখন ফেসবুকে কিছুটা পরিচিতি পেয়ে যায় তখন তারা নিজেদেরকে কবি হিসেবে জাহির করতে শুরু করে এবং বই প্রকাশে উদগ্রীব হয়ে পড়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সেসব পোস্ট কবিতাও হয়ে উঠে না, আবার এরমধ্যে কোন প্রকার সাহিত্যরস থাকে না। দেখা যায় তারা যখন বই প্রকাশ করেন তখন তাদের সেই ফেসবুকীয় পাঠকগোষ্ঠী তাদের সাহিত্য মানহীন বইগুলো দেদারসে কিনছে, বা তারা নিজেদের বইগুলো ফ্রি–তে মানুষকে বিলি করে, আবার ফেসবুকে পোস্ট করে এটা বুঝানোর চেষ্টা করেন তাদের বই পাঠকের হাতে যাচ্ছে, যা এক প্রকার প্রতারণার সামিল। এরফলে যারা সত্যিকার অর্থেই কবিতার পাঠক তারা প্রকৃত কবিতার বই খুঁজে পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং দিনদিন কবিতার পাঠক সংখ্যা কমে আসছে। ঐসব ফেসবুকীয় কবিরা মনে করছে তাদের আবেগি পোস্ট বা কথামালাই কবিতা, কিন্তু আদতে তা কবিতাই হয়ে উঠে না তা তাদেরকে বোঝানোই মুশকিল এবং তারা তা বুঝারও চেষ্টা কওে না, প্রয়োজনও মনে করে না।
দ্বিতীয়ত একম কিছু তরুণ কবি যাদের কবিতার প্রধান বা একমাত্র বিষয় নারীঘঠিত প্রেমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এরমধ্যেও কোন প্রকার সাহিত্যরস থাকে না বা পাওয়া যায় না । কবিতাগুলো পাঠ করলে মনে হয় যেন সাধারণ বাংলা গদ্য রচনা পাঠ করছি। তৃতীয় হলো এমন কিছু লেখক আছেন যারা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় যেসব বিষয়ে লেখা প্রকাশিত হয় সেসব বিষয় নিয়েই লেখেন। এমনকি একটি বিষয়ে একাধিক লেখাও অনেকে লিখে থাকেন। ঐসব লেখার বিষয়বস্তু সবসময় গড়পড়তা, এতে নতুনত্ব বলতে কিছুই থাকে না। পত্রিকাগুলোতে বেশিরভাগ সময় ঋতু, জাতীয়দিবস, বিশিষ্ট ব্যক্তি কেন্দ্রিক বেশি লেখা প্রকাশিত করে থাকে। পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী এবং মানসম্পন্ন লেখা কমই থাকে এসব সাহিত্য পাতাগুলোতে। তবুও তারা লিখেই যায় এতে সাহিত্যের কতটুকু উপকার হয় বা আদৌ হয় কিনা তা তারাই ভালো বলতে পারেন।
এ–সব তরুণ কবিদের অনেকেই কবিতার ছন্দের প্রয়োগ না জেনে পরপর লাইন সংযুক্ত করে আধুনিক কবিতা বলে চালিয়ে দিতে চায়। কবি আহসান হাবীব এটাকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন “এক পৃষ্ঠা লেখাকে কোনাকুনি ছিড়ে ফেললেই অনেকে মনে করে এটাও আধুনিক কবিতা”। আধুনিক কবিতা মূলত আধুনিক যুগে লেখা হয় বলেই কিন্তু তা আধুনিক কবিতা নয়, তবে হ্যাঁ, আধুনিক কবিতা অবশ্যই আধুনিক কালে লেখা, তবে আধুনিক কবিতার চরিত্র ও চিন্তাই হয় মূলত আধুনিক। বর্তমানে অনেক অক্ষম কবি নিজের খ্যাতির নেশায় সাধারণ কথামালাকে ছোট ছোট লাইন করে পরপর সাজিয়ে লিখে সেটাকে আধুনিক কবিতা বলে চালিয়ে দেন। তারা নিজেদের অক্ষমতা ডাকার জন্য এসব কবিতাকে মুক্তছন্দে লেখা বলেও দাবি করেন। যাঁরা মুক্তছন্দের দোহাই দিয়ে বাংলা কবিতার ভুল ব্যাখ্যা করছে তারা যে শুধু নিজের ক্ষতি করছে তাই নয় বরং বাংলা কবিতারই ক্ষতি করছে।
কবিতায় চিরাচরিত ছন্দ বা মিল থাকলে তা সহজেই কানে ধরে এবং বোঝা যায়। কিন্তু আধুনিক গদ্যকবিতায় ছন্দের দোলা থাকে না এবং অনেক সময় বাক্য গঠনও অবিন্যস্ত থাকে। বাক্যের মাঝখানে যতিচিহ্নের অভাব বা হঠাৎ প্রসঙ্গের পরিবর্তন পাঠককে বিভ্রান্তও করে। কবিতাকে শুধুমাত্র গতানুগতিক সহজতর একটি শিল্প ভাবলে হবে না। কবিতা মানে শুধু আনন্দ নয়, কবিতা মানে কখনো কখনো দগদগে ঘা–কে সরাসরি দেখানো। কবিতায় কোনো সুশৃঙ্খল কাহিনি বা বর্ণনা থাকে না। বরং সমসাময়িক রাজনীতি, যৌনতা, ক্ষুধা এবং ক্ষোভের এক প্রচণ্ড বিশৃঙ্খল বহিঃপ্রকাশও ঘটে। আর কিছু কবিতা স্রেফ অনুভূতির নয়, বরং গভীর মনন বা দর্শনের ফসল। যেখানে কবি মহাজাগতিক রহস্য, অস্তিত্ববাদ বা জটিল কোনো বৈজ্ঞানিক সত্যকে কবিতায় রূপ দেন। আধুনিক কবিতায় কবিরা সরাসরি কোনো কথা না বলে রূপক বা প্রতীকের আশ্রয় নেন। কবিতায় বিভিন্ন বাঁক পরিবর্তন, বিদেশি সাহিত্যের প্রভাব থাকবে। আবার কবিতা সর্বদা সহজবোধ্য হবে তাও কিন্তু নয়। কবিতায় সহজ কথাও অনেক গভীর ইঙ্গিত বা ব্যঞ্জনা থাকে। আবার বহু অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার এবং ভিন্ন ধারার চিত্রকল্পের মেটাফোরিক প্রয়োগও কবিতাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কখনো উত্তরাধুনিকতাও এর অন্যতম কারণ। অনেক কবি এমন সব শব্দ ব্যবহার করেন যা সচরাচর ব্যবহৃত হয় না। আবার এমন কিছু চিত্রকল্প তৈরি করেন যা বাস্তব জগতের যুক্তির সাথে মেলে না। নজরুলের মতো কবিরা তাঁদের লেখায় প্রাচীন ইতিহাস, মুসলিম বা ভারতীয় পুরাণ এবং দর্শনের ব্যাপক রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন।
কবিতা পাঠের আনন্দ আলাদা ও চিরন্তন। মানুষের ক্ষুধা মেটালে যে আনন্দ তা শারীরিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কবিতার একটি লাইন পাঠে যে আনন্দ, তার কোনো জাগতিক উপযোগিতা নেই–তাকেই বলে আত্মার খোরাক। কবিতার মাধ্যমেই পাঠক নিজের শরীর ও অন্য সভার বাইরে গিয়ে ভিন্ন একটি জীবন উপভোগ করতে পারে। অন্যের দুঃখে কেঁদেও পাঠক এক অদ্ভুত শান্তি পায়। কিন্তু বর্তমানের তরুণদের কবিতা পাঠ করে পাঠক কি সত্যি এমন আনন্দ উপভোগ করতে পারছে? তাদের কাব্যচর্চা কি আদতেই কাব্যচর্চা হচ্ছে? কাব্যচর্চা তো অনেকেই করে, কিন্তু ক’জন কবি’ই পাঠককে তাঁর কবিতা পড়তে বাধ্য করতে পারে অর্থাৎ এমন কবিতা যা পাঠক ছেড়ে উঠতে চাইলেও উঠতে পারবে না, পাঠ শেষ করেই উঠবে। এমন কাব্য রচনা করতে না পারলে তা কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে। কাব্যচর্চা তো তখনই মানসম্পন্ন সাহিত্য হয়ে উঠে যখন পাঠক একবার পাঠ করার পর তা পরবর্তীতে আবার পাঠ করার ইচ্ছায় নিজের কাছে যত্ন করে রাখবেন। বর্তমানে এমন কাব্যচর্চা কতজন তরুণ কবি করতে পারছে? এসব বিষয় মাথায় নিয়ে তরুণ কবিদের কাব্যচর্চা করা সময়ের প্রয়োজন।










