জ্ঞান মানুষের চিরন্তন অন্বেষার নাম। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ প্রতিনিয়ত জ্ঞান অর্জন করে চলেছে নিজেকে উন্নত করতে এবং চারপাশের জগতকে জানতে। তবে এই জ্ঞান অর্জনের পথ এবং এর বহিঃপ্রকাশ সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না। গভীর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানবসমাজে জ্ঞান অর্জন মূলত দুটি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়। একটি হলো বাহ্যিক তথা তথ্য–নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, এবং অন্যটি হলো অভ্যন্তরীণ তথা আত্মোপলব্ধিমূলক প্রকৃত জ্ঞান। এই দুই ধরনের জ্ঞান মানুষের মানসিকতা, আচরণ এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর সম্পূর্ণ বিপরীত প্রভাব ফেলে। বর্তমান আধুনিক সমাজব্যবস্থায় আমরা যে শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করি, তা হলো তথ্য–নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, পিএইচডি, সার্টিফিকেট কিংবা উচ্চতর গবেষণা–এ সবই এই ধারার অন্তর্ভুক্ত। নিঃসন্দেহে এই ধরনের জ্ঞান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সভ্যতার বৈষয়িক উন্নয়নে অপরিহার্য। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই বাহ্যিক অর্জন মানুষের মনের ভেতরে সূক্ষ্ম অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্ববাদের জন্ম দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, উচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরা নিজেদের সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করেন। ‘আমার স্থান সবার উপরে, সবার সাথে আমার মেশা সাজে না’এই ধরনের আভিজাত্যের মানসিকতা তাদের গ্রাস করে। এই কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ববোধ মানুষকে সমাজ ও চারপাশের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যে জ্ঞান মানুষকে মানুষের কাছে টানার কথা ছিল, তা তখন হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য দেয়াল। সার্টিফিকেট তখন কেবল একটি যোগ্যতা থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে অহংকার প্রকাশের হাতিয়ার। এই ধরনের জ্ঞান মানুষকে জাগতিকভাবে সফল করলেও, মানসিকভাবে একা এবং সহানুভূতিহীন করে তোলে। এর ঠিক বিপরীত প্রান্তে রয়েছে আত্মোপলব্ধিমূলক জ্ঞান। এই জ্ঞান কোনো লাইব্রেরির বইয়ে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হলো নিজেকে চেনার, নিজের সীমাবদ্ধতাকে জানার এবং সৃষ্টির গভীর রহস্য অনুভব করার ক্ষমতা। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, “আমি শুধু এটাই জানি যে, আমি কিছুই জানি না।” এই বোধটিই হলো আত্মোপলব্ধির মূল ভিত্তি।
আত্মোপলব্ধিমূলক জ্ঞান মানুষকে অহংকারী করে না, বরং চরমভাবে বিনয়ী করে তোলে। একজন আত্মোপলব্ধি সম্পন্ন মানুষ যখন কোনো বনের মাঝে বা নদীর তীরে দাঁড়ান, তখন তিনি নিজেকে প্রকৃতির চেয়ে আলাদা কিছু ভাবেন না। তিনি বুঝতে পারেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি উপাদান গাছপালা, নদী, পাহাড় এবং অন্যান্য জীবজগৎ সবকিছুর সাথেই তার এক গভীর আত্মিক সংযোগ রয়েছে। প্রকৃতির এই বিশালত্ব মানুষের ভেতরের ‘আমি’ বা ‘অহংবোধ’কে এক নিমেষে গলিয়ে দেয়। ফলে তিনি মানুষের তৈরি কৃত্রিম শ্রেণিবিভাগ থেকে মুক্ত হয়ে সমস্ত সৃষ্টির সাথে একাত্মতা অনুভব করেন। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, আমাদের কি প্রাতিষ্ঠানিক বা তথ্য–নির্ভর জ্ঞানের প্রয়োজন নেই? অবশ্যই আছে। তবে এই দুই প্রকার জ্ঞানের মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্য থাকা জরুরি। বাহ্যিক জ্ঞান যদি আমাদের জীবিকা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটায়, তবে অভ্যন্তরীণ আত্মোপলব্ধি আমাদের মানবিকতা ও আত্মার বিকাশ ঘটায়। বিজ্ঞান ও ডিগ্রির সাথে যদি আধ্যাত্মিক বা আত্মোপলব্ধিমূলক বোধের মিলন না ঘটে, তবে সেই শিক্ষা সমাজকে কেবল যান্ত্রিক রোবট উপহার দিতে পারে, মানুষ নয়। জ্ঞান তখনই সার্থক হয়, যখন তা মানুষের হৃদয়কে প্রসারিত করে, মানুষকে বিনয়ী করে এবং প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত হতে শেখায়।












