বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তথ্য প্রযুক্তির পরিবর্তন নিয়ে বিশদভাবে যদি ভাবতে হয়, তবে বলা যায় দু’হাজার নয় দশ সাল নাগাদ ফেসবুকের মোটামুটি প্রচলন শুরু হয়েছিলো। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে এই ধারার গতিরোধ করতে পারা অসম্ভব হয়ে আজ অতি আবশ্যিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে ফেসবুক এবং এর সংশ্লিষ্ট নানা অনুষঙ্গসমূহ। ফেসবুক পূর্ববর্তী বাংলাদেশের কথা ভাবলে অবাক হতে হয় আমাদের জীবনযাপন পদ্ধতির রোমন্থনে। শুধু মুঠোফোনের সহজলভ্যতা শুরু হতে যাচ্ছে, এমন একটা সময়ে তখন বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বেসরকারি কিছু টিভি চ্যানেল বিটিভিকে ছাপিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। মুঠোফোন আর কয়েকটা বেসরকারি টিভি চ্যানেল নিয়ে তখন বাংলাদেশের বিনোদন জগত।
এছাড়া, গান শোনার জন্য বা সিনেমা দেখার জন্য ক্যাসেট প্লেয়ারের বদলে সিডির ব্যবহার শুরু হচ্ছিল। এসবের পাশাপাশি বাদবাকি বিনোদন হিসেবে তখনও মানুষের হাতে নান্দনিক অনুষঙ্গ হিসেবে বইয়ের অবস্থান ছিলো বেশ ভালো রকমের। তখনও ঘটা করে বই পড়ার বা একে অন্যের বই নিয়ে পড়ার বেশ বাড়তি আনন্দ ছিলো।
বই পড়ার সৌন্দর্যটুকু আলোর মতো ছুঁয়ে যেতো একে একে সবাইকে। বইমেলা এলেই সারি সারি বই নিমেষে উধাও হয়ে যেতো। তখনও সেলফি বা ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার জন্য বই কেনার ধারা প্রচলিত হয়নি। বইয়ের মলাটের গন্ধ তখনও বাঙালির মনে অজানা এক শান্তির উদ্রেক করতো। একটা আবহ তৈরী হতো বইটি পড়ার জন্য। একসাথে টিভি দেখার নির্মল আনন্দ ছিলো। পরিবেশটা অন্য রকম হয়ে যেতো নিমেষেই। একটা অনুষ্ঠান বা নাটক বা সিনেমা দেখার জন্য মানুষের কী এক উন্মাদনা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সবাই উপস্থিত হতো টিভির সামনে। কিছু কিছু শ্রুতি নাটক বা সিনেমার ক্যাসেট পাওয়া যেতো, যেগুলো ক্যাসেট প্লেয়ারে শোনা হতো। কোনো দৃশ্যকে চোখের সামনে না দেখে শুধু কানে শুনে পুরো কাহিনিকে চোখের সামনে কল্পনা করতে পারার মতো ক্ষমতা মানুষের মধ্যে ছিলো।
অতি আবশ্যিক ভাবেই লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রত্যেক ঘরে ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেওয়া হতো শখের হারমোনিয়াম, তবলা। সঙ্গীতের বীজ বপন করা হতো এভাবেই। শিল্প সংস্কৃতির বীজ এভাবেই ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়ে আজকের ডিজিটাল যুগে এসে মহীরূহে পরিণত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধারায় এসে গেছে বড় পরিবর্তন। নব্বইয়ের দশকে বা একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়াতে বই পড়ার যে অভ্যাস ছিলো এখনও তা যে নেই তা বলা যায় না। তবে বই পড়ার ধরণটা বদলে গেছে। এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সবকটা অধ্যায় পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বই আর কাগজের মলাটে আবদ্ধ নেই। মুঠোফোনের সহজলভ্যতা আর ইন্টারনেটের ব্যাপক উন্নয়ন বিশ্বকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। যার ফলে কোনোকিছুই আর দুর্লভ নেই এই পৃথিবীতে। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বই পড়ার কাজ সেরে নেয় মুঠোফোনের মাধ্যমেই। তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ বই বিমুখ, আর বাকি যারা এখনো বইয়ের জন্য তাদের আগ্রহ ধরে রেখেছে তাদের বড় একটি অংশ ইন্টারনেটে বই পড়ে, আর বাদ বাকি অল্প কয়েকজন বই পড়ার আগ্রহ পোষণ করে এখনও।
আশার কথা এইটুকুই যে তারা বই পড়ছে, মাধ্যমটা যাই হোক না কেনো। শুধু এই প্রজন্মের সন্তানদের ওপর দোষারোপ করলে ব্যাপারটা ভুল হবে। নব্বইয়ের দশক বা বিংশ শতাব্দীতে ও যারা বইপ্রেমী ছিলেন তাদেরও বড় একটি অংশ এখন ইন্টারনেট নির্ভর। প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে চাইছে না কেউই। আর স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি মানুষ এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ ব্যস্ততায় সময় কাটায়। তাই যতটুকু সময় পাওয়া যায়, তাকে কাজে লাগানোর সুযোগটুকু কেউ ছাড়ে না।
ইন্টারনেট বা মুঠোফোনের আসক্তি নতুন প্রজন্মেরই বেশি, একথাটা ততটা আর যুক্তিসঙ্গত নয়। মধ্যবয়স্কদের একটা বিশাল অংশ প্রতিনিয়ত তাদের অবসরের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে মুঠোফোনকে। ইন্টারনেট বিহীন জীবন তাদের জন্যও অকল্পনীয়, যেমনটা এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের জন্য আমরা মনে করে থাকি। নাচ, গান, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন যাই বলি না কেনো, শিল্প সংস্কৃতির যে ধারাতেই আপনি নিজেকে বিকাশমান করতে চান, আপনি ইন্টারনেট নির্ভর হবেন, এটাই স্বাভাবিক।
দেশ তথা পৃথিবীর বদলের নিভৃত সাক্ষী হয়ে রইলো এই ইন্টারনেট প্রযুক্তি। কবে কখন পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে বা ঘটেছিল সেসব এখন আর বইয়ের পাতায় কেউ খোঁজে না। এই ব্যস্ত সময়ে এসবের জন্য ও মুঠোফোন বা ইন্টারনেট। কোনো অচেনা জায়গার ঠিকানা জানার কাজটুকু পর্যন্ত এখন ইন্টারনেটের হাতে। পৃথিবী এখন আর থমকে নেই। পৃথিবীর এই বিকাশমান যাত্রায় সবচেয়ে বড় অভিভাবক বলা যায় ইন্টারনেটকে বা তথ্য প্রযুক্তিকে। এই প্রযুক্তির সুবিধাকে ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারলে পৃথিবী সুন্দর। কিন্তু এর অসুবিধাসমূহ যদি একবার জীবনে গেঁথে যায়, তবে তা ভয়ানক।
তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে গতি লাভ করেছে। চোখের পলকে আমাদের জীবনের গতি পাল্টে গেলো, আমাদের জীবনের অত্যাবশকীয় উপাদান হিসেবে উন্নত তথ্য প্রযুক্তি জায়গা করে নিলো। প্রতিটি মানুষের হাতে মুঠোফোনের একাধিপত্য এই বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
যুগের আধুনিকায়নের সাথে সাথে সবকিছুর পরিবর্তন অতি আবশ্যিক। এই আবশ্যিক বিষয়কে বরণ করে নিয়ে আমরা তাল মিলিয়ে পাড়ি দিচ্ছি সামনের পথ। আমরা পুরোনোকে ভিত হিসেবে নিয়ে নতুনের আবাহন করে চলেছি প্রতিনিয়ত। পরিবর্তনের এই ক্রমবর্ধমান ধারাকে কোনোভাবেই আমরা খারাপ বলতে পারি না।
তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, মানুষের জীবনকে অনেক সহজ, দ্রুত ও গতিশীল করে দিয়েছে। তথ্য খোঁজা, লেখালেখি, গবেষণা, যোগাযোগ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজেই এআই এখন গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি। তবে এর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের নিজস্ব চিন্তা, কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সৃষ্টিশীলতাকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমরা যদি প্রতিটি কাজের জন্য এআইয়ের ওপর নির্ভর করি, তাহলে নিজের মতো করে ভাবা ও নতুন কিছু সৃষ্টি করার অভ্যাস কমে যেতে পারে। তাই এআইকে মানুষের সৃষ্টিশীলতার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সৃষ্টিশীলতাকে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করার একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারই পারে মানুষকে এগিয়ে নিতে, আবার ভুল ব্যবহারই সৃষ্টিশীলতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এই অগ্রগতি সময়ের দাবী। তবে পরিবর্তনের এই ধারার প্রবাহ যেনো সঠিক ও সুন্দরের পথে থাকে তার দিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে বৈকি!
লেখক: প্রাবন্ধিক।











