ট্রাইব্যুনালে জিয়াউলের সাবেক রানারের জবানবন্দিতে ইলিয়াস আলী ‘গুমের’ বর্ণনা

| সোমবার , ২২ জুন, ২০২৬ at ৫:২২ পূর্বাহ্ণ

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে কীভাবে ‘গুম’ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে সেই বর্ণনা দিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের মামলার একজন সাক্ষী। সহযোগী সাক্ষী হিসেবে দেওয়া ইমরুল কায়েসের জবানবন্দিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউলের নির্দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে ‘হত্যা ও লাশ গুম’ করার বিবরণ উঠে এসেছে।

গতকাল রোববার জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে জবানবন্দি দেওয়া এই সাক্ষী নিজেকে তার সাবেক ‘রানার’ হিসেবে পরিচয় দেন। খবর বিডিনিউজের।

বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল১ এই সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে গত ৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। সেখানে তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগে শতাধিক গুমখুনের বিবরণ তুলে ধরা হয়।

প্রথম অভিযোগে ২০১১ সালে গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ তিন হত্যা; দ্বিতীয়টিতে বরগুনার চরদুয়ানী খাল মোহনায় ৫০ জনকে হত্যা এবং তৃতীয়টিতে সুন্দরবন অঞ্চলে কথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে আরও ৫০ জনকে হত্যার কথা বলা হয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর এই তিনটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল১। দীর্ঘ জবানবন্দিতে এই সেনা সদস্য তার যোগদান এবং জিয়াউল আহসানের ‘রানার’ হিসেবে কাজ করার সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তার ধারাবাহিক বর্ণনার এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ও গুম করার বিষয়টি আসেন।

ইমরুল বলেন, ‘২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র‌্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার এবং মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই। কাকে গাড়িতে তুলবে, তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। ‘টার্গেট’ কখন আসবে তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে, ‘টার্গেট’ আসবে না।’

পরে সেখান থেকে জিয়াকে বাসায় নামিয়ে দেন এবং পরের দিন সকালে ইমরুল নয় দিনের ছুটিতে যান বলে দাবি করেন তিনি। ‘ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, ইলিয়াস আলী নামক একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভার ব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। নয় দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি আমার কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করি।’ প্রমাণ নষ্ট করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি যে, অস্ত্রের ‘ইনআউট রেজিস্টার’ এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন। সাধারণত ‘ফল ইন’ (লাইনে দাঁড়ানোর পর নাম ডেকে উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া) সকাল ৯টায় হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিল থেকে সকাল ৭টায় ‘ফল ইন’ হতো এবং জিয়া স্যার পরপর বেশ কয়েক দিন ‘ফল ইনের’ সময় এসেছিলেন।’

সহযোগী এই সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেন, জিয়া এক দিন ফোনে কোনো একজনের সাথে কথা বলছিলেন। ‘ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল আসলে স্যার বলেনতুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন। জিয়া স্যার তারেক স্যারের সাথে কথা বলা শুরু করেন। অপর প্রান্তে কি বলেছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেনস্যার আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে ‘গলফ’ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে, এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো।’

প্রথম লাশ গুমের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, রানার হিসেবে যোগদান করার ২০/২৫ দিন পরে রাত আনুমানিক ১২টা বা সাড়ে ১২টার দিকে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেনকই তুই? আমি বলিআমি লাইনে আছি। স্যার তখন আমাকে র‌্যাব১ এর (দপ্তর) সামনে যেতে বলেন। ওখানে যাওয়ার পর দেখি দুটি কালো রংয়ের হায়েস মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। স্যার আমাকে একটি মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। আমি সেই গাড়িটিতে উঠি। ওই গাড়িতে জিয়া স্যার বসে ছিলেন। গাড়িতে ওঠার পর স্যার আমাকে বলেন, পিছনে একটি বস্তা আছে, বস্তাটি ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে র‌্যাব১ এর সিও রাশেদ স্যার এবং ক্যাপ্টেন কাউসার স্যার ছিলেন। আরও দুইজন ছিলেন আমি তাদেরকে চিনি না।

রাত আনুমানিক পৌনে ১টার দিকে সেখান থেকে বের হয়ে জসীম উদ্দিন রোড (উত্তরা) হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে ডান দিকে কিছুদূরে একটি রেলক্রসিংয়ে যাওয়ার কথা বলেন ইমরুল। রাস্তার দুই পাশে গাছগাছালি থাকার বর্ণনা দিয়ে সেখানে তাদের গাড়িগুলো থামে এবং সেখানে লাশ ফেলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

সেই বিবরণ দিয়ে এই সাক্ষী বলেন, তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ইমরুল ডিকিটা খোল, বস্তাটা বের কর। আমি ডিকি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশে হাত দিলে দেখি সেটি বস্তা না, বরং একটা ‘ডেড বডি’ ছিল এবং ঠাণ্ডা ছিল। লাশটি রেললাইনের পাশে নিয়ে জিয়াউল যেখানে দাঁড়ানো ছিলেন, সেখানে রেখে গাড়িতে ফিরে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তখন দেখি যে, জিয়া স্যারসহ সেখানে থাকা অন্যরা বডিটা রেল লাইনের উপরে রাখেন এবং তারা গাড়িতে ফিরে আসেন। তার কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়। তারপর আমরা ওখান থেকে চলে আসি। জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে কান্না করতে থাকেন ইমরুল কায়েস। এই পর্যায়ে তিনি বলেন, আমি রানার হিসাবে তার সাথে দেখেছি তিনি ওই সময়কালে ১৫০/২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা একাধিকবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে আমি ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত আছি। আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, এখন আমি নিরাপত্তা চাই। এই আমার জবানবন্দি।

সাক্ষীর জবানবন্দির পর ব্রিফিংয়ে ইলিয়াস আলীকে গুম করার ঘটনায় ব্যবহৃত ‘গলফ’ শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এই গলফটা শব্দটা প্রতীকী অর্থে তারা ব্যবহার করেছে। গলফ অর্থ হল কাউকে একটা গর্তে ফেলে দেওয়া।’

ইলিয়াস আলীকে অপহরণের পর প্রমাণ নষ্ট করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের যে ভিডিও ফুটেজএই সবকিছু জিয়াউল আহসান ধ্বংস করে দিয়েছেন, নষ্ট করে ফেলেছেন। এই সাক্ষ্যটা যাতে না থাকে। এভিডেন্সটাকে নষ্ট করবার জন্যে ‘ইনস অ্যান্ড আউট রেজিস্টার’ এবং সকল ফুটেজ জিয়াউল আহসান গায়েব করে দিয়েছেন। বোঝা গেল যে বাংলাদেশ এবং ভারত জুড়েই তার এই কিলিং মিশনটার নেটওয়ার্কটা ছিল।

আদালতে জিয়াউল আহসানের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, এই জিয়াউল আহসান আজকে কোর্টে উনি উপস্থিত থেকে এই সমস্ত সাক্ষ্যটা শুনেছেন। আর যতক্ষণ তিনি শুনেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি হাসছিলেন, ‘দাঁত খিলিয়ে খিলিয়ে’ তিনি হাসছিলেন। তিনি বেশ উপভোগ করছিলেন যে তার এই কুকর্মের যখন বর্ণনা সাক্ষী দিচ্ছিলেন, তার কাছে কোনো অনুতপ্ত মনে হয় নাই। সাক্ষী ইমরুল কায়েস সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও কেন তাকে আসামি করা হয়নি এমন প্রশ্নে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, সবগুলোর মধ্যেই তার ভূমিকা হল, তিনি জিয়াউল আহসানের নির্দেশে, তিনি ওই ভুক্তভোগীগুলোর লাশ ‘ডিসপোজাল’ করেছেন। তো সেই কারণে এই সাক্ষীকে আমরা ‘অ্যাকমপ্লিস উইটনেস’ হিসেবে আমরা ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছি। তাকে যদি আজকে আমরা যদি এই সাক্ষীকে না পেতাম, তাহলে আজকের এই ঘটনার বর্ণনা কে দিত?

১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল আহসান ২০০৯ সালে র‌্যাবে যোগ দেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক এবং সবশেষ ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ৬ অগাস্ট তাকে চাকরিচ্যুত এবং ১৬ অগাস্ট গ্রেপ্তার করা হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহান্নান মাসউদের বক্তব্য ঘিরে সংসদে হট্টগোল
পরবর্তী নিবন্ধচুরির অভিযোগে যুবককে ‘পিটিয়ে ও বৈদ্যুতিক শকে’ হত্যা