টেকনাফে পানির সংকটে ২৫ হাজার রোহিঙ্গা

দিনে মাত্র ২০ লিটার পানি পায় প্রতি পরিবার

কক্সবাজার প্রতিনিধি | শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তীব্র পানি সংকটের মুখে পড়েছে। বর্ষামৌসুম শেষ না হতেই পানির এই সংকট বিরাট অশনি সংকেত তৈরি করেছে। শুষ্ক মৌসুম নাগাদ মারাত্মক সংকট তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের পরিস্থিতি অতীতের রেকর্ড ছাড়াতে পারে।

২২ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা আবদুল আমিন জানান, জরুরি মানবিক সহায়তায় কোনোমতে সংসার চলে গেলেও পানির সংকটে প্রায় স্তব্ধ তাদের দৈনন্দিন জীবন। আরেক রোহিঙ্গা বাসিন্দা হামিদ হোসেন জানান, এখনো বর্ষা মৌসুম চলছে। কবে বৃষ্টির পরিমাণ কমে আসায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। উন্নয়ন সংস্থা থেকে পানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে তাদের একটি পরিবারে ২০ লিটারের বেশি পানি প্রয়োজন। কিন্তু শুকনো মৌসুমে ওই পরিমাণ পানিও তারা পান না। সরবরাহ নেমে আসে ৫ থেকে ১৫ লিটারে। তখন রান্না হলে গোসল হয় না, গোসল হলে রান্না হয় না। তাই হামিদ হোসেনের মতো অন্যান্য রোহিঙ্গা পরিবারে শুরু হয়েছে পানির জন্য হাহাকার।

তথ্য মতে, টেকনাফের ২২ নম্বর ক্যাম্পে থাকা প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গার জন্য মেপে মেপে সরবরাহ করা ওই পানির পুরোটাই আসে পার্শ্ববর্তী একটা খাল থেকে। শুকনো মৌসুমে সেই খালেও পানি আনতে হয় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি ছড়া থেকে।

রোহিঙ্গারা জানান, একটিমাত্র সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে রোহিঙ্গাদের ঘরে পানি সরবরাহ করা হয়, যা দিয়ে কেবল অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন মেটাতে পারেন তারা। প্রতিদিন সকালদুপুর দুইবার পানি দেয়া হয়। পাম্প চালুর পর ভাদ্রের কড়া রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বোতলে পানি সংগ্রহ করতে হয়। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, ভূমির পাথুরে গঠনের কারণে গভীর নলকূপ বসানোর জটিলতা রয়েছে পুরো টেকনাফজুড়ে। এতে সব এলাকাতেই পানির সংকট রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোর তথ্য বলছে, নব্বইয়ের দশক থেকেই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বসতি আছে টেকনাফে। অগভীর নলকূপ আর খালের পানি দিয়ে কোনোমতে প্রয়োজন মিটিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। এমন সংকটের মধ্যে ২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আসে। তারা সেখানে বসবাস শুরু করার পর হাজার হাজার টিউবওয়েল বসানো হয়েছে। ফলে ভুগর্ভস্থ পানির পরিমাণ একেবারে কমে গেছে। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি অগভীর নলকূপ আর খালের পানির ওপর তখন বড় রকমের চাপ পড়ে।

সেই সংকট কাটাতে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনিসেফের অনুদানে ২২ নম্বর ক্যাম্পে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরি করে দেয় অক্সফ্যাম। সহযোগী হিসাবে ওই প্ল্যান্ট নির্মাণ ও পরিচালনা করছে দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)। কিন্তু তাতে সংকট পুরো কাটেনি বলে জানালেন, শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, পুরো উখিয়া ও টেকনাফে পানির সংকট রয়েছে। কিন্তু টেকনাফে সেই সংকট খুবই প্রকট। তবে টেকনাফে যেহেতু গ্রাউন্ড ওয়াটার সাফিশিয়েন্ট নেই, এটা রকি গ্রাউন্ড, ফলে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট করেই কিন্তু সরবরাহ করতে হচ্ছে। শীতকালে এই সমস্যা এত প্রকট হয় যে আমাদেরকে পানি রেশনিং করতে হয়।

প্ল্যান্টের পরিসর ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে পানি তোলার প্রাইমারি সেডিমেন্টশন ট্যাংক রয়েছে ছয়টি। প্রতিটির ৯৫ হাজার লিটার করে ক্যাপাসিটি। চার পাহাড়ে ৯৫ লিটারের চারটা বিতরণ ট্যাংক রয়েছে। প্ল্যান্ট থেকে সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পানি যায়।

মিজানুর রহমান বলেন, পানির চাহিদা মেটানোর জন্য টেকনাফে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) থেকে বড় সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরি উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি বলেন, ডিপিএইচই পাইপলাইনের মাধ্যমে টেকনাফে পানি সরবরাহের প্রকল্প নিয়েছে। হয়ত আরো দুইতিন বছর লাগবে এটা চালু হতে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখাগড়াছড়িতে জুমে ধানের নতুন জাত, ফলন দ্বিগুণ
পরবর্তী নিবন্ধসার্ক পুনরুজ্জীবিত করতে ভুটানের সহযোগিতা চাইলেন দুই মন্ত্রী