প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! তাঁর নবী রাসূলগণের জীবনাদর্শ অনুসরণ করুন। নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালামকে তাজিম ও নিখাদ ভালোবাসা নিবেদন করা পরকালীন নাজাতের ওসীলা মনে করুন। জেনে রাখুন, হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর এক মহান নবী ও পৃথিবীর বিশাল ভূখন্ডের বাদশাহ, তাঁর বাদশাহীর পরিধি ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত।
হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম’র পরিচয়: তাঁর নাম সুলায়মান, তাঁর পিতার নাম হযরত দাউদ (আ.)। তিনি খ্রিস্ট পূর্ব ৯৭০ মতান্তরে ৯৯২ খ্রিস্টাব্দে জেরুসালেমে জন্ম গ্রহণ করেন। সিরিয়া, ইরাক, পশ্চিমে মিশর থেকে নিয়ে দক্ষিণে ইয়ামেন উত্তরে ভূ–মধ্যসাগরীয় অঞ্চল পূর্বে খোরাসান পারস্য পর্যন্ত তাঁর বাদশাহীর প্রভাব বলয় বিস্তৃত ছিল। পবিত্র কুরআনে ষোল বার তাঁর নাম উল্লেখ হয়েছে। তিনি মানব জাতি, জিন জাতি, এবং পক্ষীকুলের ভাষা বুঝতেন। তাদের সাথে কথা বলতেন, প্রাণীকুল তাঁর বশীভূত ছিল, বাতাস তাঁর অনুগত ছিল, তিনি ১৩ বছর বয়সে পৃথিবীর বিশাল ভূখন্ডের বাদশাহ হিসেবে বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্বের সূচনা করেন। ৫৩ বছর বয়সে ওফাত প্রাপ্ত হন। সুদীর্ঘ ৪০ বৎসর পৃথিবীর বাদশাহী করেন। হযরত মুসা আলাইহিমুস সালাম এর ওফাতের ৫৭৫ বছর পর হযরত সুলায়মান (আ)’র ওফাত হয়। দক্ষিণ আরবে সাবার রানি বিলকিস অনেক পরীক্ষার পর তিনি হযরত সুলায়মান (আ.)’র উপর ঈমান এনেছিলেন। তাঁর ওফাতের একমাস পর বিলকিসের ওফাত হয়। (রুহুল বয়ান, তাফসীরে নুরুল ইরফান, খন্ড: ১ম, পৃ: ১০০৮)
তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৯৭৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ইন্তিকাল করেন। তিনি বায়তুল মুকাদাস পুন:নির্মাণ করেন। জ্বিনদের মাধ্যমে নির্মিত বায়তুল মুকাদ্দাসের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত না হওয়াতে ওফাতের পরেও তিনি দীর্ঘ ১ বছর লাটিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নির্মাণরত জ্বিনজাতি যেন বুঝতে না পারে এবং নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন।
পবিত্র কুরআনের আলোকে হযরত সুলায়মান (আ.) কে আল্লাহর প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যসূমহ: আল্লাহ তা’আলা হযরত সুলায়মান (আ.) কে অসংখ্য মু’জিযা দান করেছিলেন, আল্লাহর সৃষ্টি বাতাস তাঁর অনুগত ছিল। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, এবং সুলায়মানের জন্য তীব্র বায়ুকে বশীভূত করে দিয়েছি, যা তাঁর নির্দেশে প্রবাহিত হতো, ওই ভূমির প্রতি যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি এবং প্রত্যেকটা বিষয় আমার জানা আছে। (সূরা: আম্বিয়া, আয়াত, ৮১)
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত তাফসীরকার হাকীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নাঈমী (র.) প্রণীত “তাফসীরে নূরুল ইরফানে” উল্লেখ হয়েছে যে, সুলায়মান (আ.) সালাতানাৎ ব্যাপক ছিল, তিনি মানব জাতি জিন জাতি এবং বাতাসেরও শাসক ছিলেন। আয়াত থেকে প্রতীয়মান হলো যে, এ কথা বলা শির্ক নয় যে, অমুকের নির্দেশে এ কাজ হয় দেখুন! মহান আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, হযরত সুলায়মানের নির্দেশে বাতাস প্রবাহিত হতো সুতরাং হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে চন্দ্র দ্বি খন্ডিত হওয়া, অস্তমিত সূর্য পুনরায় উদিত হওয়া হুযুরের নির্দেশে মুষলধারে বৃষ্টিপাত হওয়া ইত্যাদি। এ নির্দেশ আল্লাহ পাকের দান। (তাফসীরে নূরুল ইরফান, পৃ: ৮৭২)
হযরত সুলায়মান (আ) পক্ষীকুলের ভাষা জানতেন: হযরত সুলায়মান (আ) তাঁর পিতা দাউদ (আ)’র নবুওয়ত ও রাজত্বের উত্তরাধিকার হন। সুলায়মান (আ)’র ১৯ জন পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে জ্ঞান প্রজ্ঞা ও নবুওয়তের মহান মর্যাদায় সমৃদ্ধ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, এবং সুলায়মান দাউদের স্থলাভিষিক্ত হলো, আর বললো হে লোকেরা! আমাকে পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং আমাকে সকল কিছু দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা সুষ্পষ্ট অনুগ্রহ। (সূরা: নামল, আয়াত: ১৬)
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায়, “তাফসীরে নূরুল ইরফানে” উল্লেখ হয়েছে নবীগণ “মীরাস” (সম্পত্তি) বন্টন হয় না। আয়াতে সম্পদের উত্তরাধিকার স্বত্বের কথা বলা হয়নি, কেননা হযরত সুলায়মান (আ) ব্যতীত দাউদ (আ)’র আরও অনেক পুত্র ছিলেন কিন্তু শুধু সুলায়মান (আ)’র ই তাঁর ইলম ও নবুওয়তের উত্তরাধিকার হন, এখানে সম্পদের উত্তরাধিকারিত্ব নয়, নবুওয়ত ও ইলমের উত্তরাধিকারিত্বই বুঝায়। (তাফসীরে নূরুল ইরফান, পৃ: ১০০০)
নবীগণ (আ) সম্পদের উত্তরাধিকার রেখে যান না। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমরা (নবীগণ) উত্তরাধিকারী রেখে যাইনা। আমরা যা কিছু রেখে যাই তা সাদকা, কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, নবীদের রেখে যাওয়া সম্পদের কেউ উত্তরাধিকারী হয় না। যেমন অন্যদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কেউ এর দাবীদার থাকে না বরং তা সাদকা। কেননা দুনিয়ার সহায় সম্পদ যেমন আল্লাহর কাছে তুচ্ছ ও নগণ্য তেমনি তাঁর মনোনীত নবী রাসূলগণের নিকট তা মূল্যহীন ও গুরুত্বহীন।
সুলায়মান (আ) কে সকল বিষয়ের জ্ঞান দান করা হয়েছে এর মর্মাথ: আয়াতে বর্ণিত “ওয়া উ–তী–না–মিন কুল্লি শাই” এর মমার্থ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ.) হাদীস শরীফের উদ্ধৃতির আলোকে ইবনে আসাকির বায়হাকীর বর্ণনা পেশ করেছেন যে, হযরত সুলায়মান (আ.) সকল জীব–জন্তু, প্রাণীর ভাষা বুঝতেন। আলকুরআনে বণির্ত আয়াত এর সুষ্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। আমাকে সকল জিনিসের জ্ঞান দান করা হয়েছে। সকল দ্রব্য সামগ্রী অস্ত্র, আসবাবপত্র, সৈন্য সামন্ত, জিন, ইনসান, বন্যজন্তু, বিচরণকারী শয়তান, জ্ঞান–বিজ্ঞান, বাক–নির্বাক, জীবের অন্তরের খবর জানা ইত্যাদি সব কিছুই হযরত সুলায়মান (আ) কে দান করা হয়েছে, এ সবই সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা ও আসমান ও জমীনের সৃষ্টিকর্তা মালিকের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও দান। (ক্বাসাসুল আম্বিয়া কৃত আল্লামা ইবনে কাসীর, (রহ.)
হযরত সুলায়মান (আ.) কর্তৃক সাবার রানি বিলকিসের প্রতি ইসলামের দাওয়াত: হযরত সুলায়মান (আ.)’র দরবারে মানুষ ছাড়াও বহুজীব জন্তু, পক্ষীকুল উপস্থিত থাকত, একদা হুদহুদ পাাখি, বিলম্বে উপস্থিতির কারণ জিজ্ঞেস করলে হুদহুদ পাখি বলল, আমি একটি বিশ্বাস যোগ্য সংবাদ নিয়ে এসেছি, তা–হল ইয়ামেন অঞ্চলে মুলকে সাবায় এক রানি বাস করে তার নাম বিলকিস, তিনি সাবা এলাকার রাজা। তাঁর রাজ সিংহাসন বড়ই জাঁকজমকপূর্ণ। রানি ও তার প্রজাবৃন্দ সকলেই সূর্য পুজক। তারা আল্লাহর ইবাদত করেনা, এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, আমি আপনার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি আমি একজন স্ত্রী লোককে তাদের উপর রাজত্ব করতে দেখেছি এবং তাকে সবকিছু দেয়া হয়েছে, আর তার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাকে ও তার কওমকে দেখেছি তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলিকে তাদের জন্য শোভন করে রেখেছে ফলে তাদেরকে সৎপথ থেকে বিরত রেখেছে তাই তারা সৎ পথ পায়না। (সূরা: নামল, আয়াত: ২২–২৬)
বর্ণিত আয়াত সমূহের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত তাফসীরকার আল্লামা ইবনে কাছীর আদ–দিমাশকী (রহ.) প্রণীত “কাসাসুল আম্বিয়া” কিতাবে রানি বিলকিসের রাজ প্রাসাদ ও সিংহাসনের বর্ণনা প্রসঙ্গে উল্লেখ হয়েছে যে, রানির রাজ প্রাসাদ ছিল উঁচু ও অতি মজবুত। যার পূর্ব দিকে তিন শত এবং পশ্চিম দিকে তিনশত ষাটটি জানালা ছিল। রাজ প্রাসাদের সদস্য সংখ্যা ছিল তিনশত বারো জন এবং তাদের প্রত্যেকের অধীনে আবার দশহাজার লোক ছিল, বিলকিসের সিংহাসন টি স্বর্ণের যার দৈর্ঘ্য ৮০ গজ আর প্রস্থ ৪০ গজ। সম্মুখ ভাগ স্বর্ণের পশ্চাৎ ভাগ রূপা ও যবরজদ পাথর মণি মুক্তা খচিত এর চারটি পায়া লাল বর্ণের ইয়াকুত পাথর দ্বারা নির্মিত। (রুহুল বয়ান, তাফসীরে নুরুল ইরফান, পৃ: ১০০২, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ: ২৫৯)
হুদহুদ পাখির মাধ্যমে সুলায়মান (আ) কর্তৃক রাণী বিলকিসের নিকট পত্র প্রেরণ: হযরত সুলায়মান (আ) রানি বিলকিসের রাজত্বের সংবাদ পেয়ে হুদহুদ পাখির মাধ্যমে রানি বিলকিসের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, তুমি আমার এ পত্র নিয়ে যাও এবং তা তাদের কাছে নিক্ষেপ কর অত:পর তাদের থেকে একটু দূরে সরে থেক এবং লক্ষ্য কর তারা পরস্পর কী বলে। (সূরা: নামল, আয়াত: ২৮)
সুলায়মান (আ.) আল্লাহর নামে এ পত্র লিখে বিলকিসের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। আল কুরআনে এরশাদ হয়েছে, সে পত্র সুলায়মানের পক্ষ থেকে এবং তাতে রয়েছে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম” তোমরা আমার মোকাবিলায় অহংকার করনা এবং আনুগত্য স্বীকার করে আমার কাছে চলে এস। (সূরা: নামল, আয়াত: ৩০–৩১)
পরিশেষে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় রাণী বিলকিস হযরত সুলায়মান (আ.) এর দ্বীনি দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে এরশাদ হয়েছে, সে বলল! হে আমার প্রতিপালক আমি তো আমার নিজের প্রতি অন্যায় করেছি আমি সুলায়মানের সাথে রাব্বুল আলামীনের কাছে সমর্পণ করলাম।
হে আল্লাহ! আমাদেরকে নবী রাসূল আলাইহিমুস সালামদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।
মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিন
ফয়েজলেক, খুলশী, চট্টগ্রাম
প্রশ্ন: মুসাফিরের নামাযের বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে জানালে উপকৃত হত।
উত্তর: মুসাফিরের জন্য নামাযে কসর পড়া ওয়াজিব। অর্থাৎ চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ দু’রাকাত পড়বে। মুসাফিরের জন্য দু’ রাকাতই পূর্ণ নামায। ইচ্ছাকৃত চার রাকাত পড়লে ফরজ আদায় হবে, শেষের দু’রাকাত নফল হয়ে যাবে। তবে গুণাহগার ও আযাবের যোগ্য হবে। যোহর আসর, এশার চার রাকাত ফরজের স্থলে দু’রাকাত পড়বে।
ফজর, মাগরীব ও বিতরের নামাযের কোন কসর নেই। সুন্নাত নামাযে কসর নেই, নিরাপদ অবস্থায় সুন্নাত পড়তে হবে। (হেদায়া, আলমগীরি, দুরুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, ৪র্থ খন্ড, পৃ: ১০৪)











